নতুন মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আইনে একটির পরিবর্তে একাধিক হার বা রেট হবে- এমন বার্তা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তবে কয়টি হার হবে, সে বিষয়ে পরিস্কার কিছু বলেননি তিনি। এ আইনটি আরও বিশদ আলোচনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলেও তিনি মনে করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ অনুযায়ী, ব্যবসায়ীসহ সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করেই এটি চূড়ান্ত করা হবে বলে জানান মন্ত্রী। গতকাল রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে এনবিআরের অধীন ভ্যাট ও কাস্টমস বিভাগের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। কাউকে কষ্ট দেওয়া যাবে না- এ কথা উল্লেখ করে তিনি আরও জানান, সরকারের ভিশন-মিশন একটাই। তা হলো রাজস্ব আয়ের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা। এ জন্য যা কিছু করা দরকার, তা-ই করা হবে। নিজের অর্জন তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, তিনি জীবনে কোনো দিন ব্যর্থ হননি। এবারও হবেন না। এনবিআর এযাবৎ যে অর্জন করেছে, তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে আরও অর্জন করতে হবে। কারণ, দেশের অর্থনীতির যে আকার, সে অনুযায়ী রাজস্ব আয় প্রত্যাশিত নয়। কাঙ্ক্ষিত আয় বাড়াতে হলে অনেকদূর এগিয়ে যেতে হবে। বৈঠক শেষে কর্মকর্তাদের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী মৌসুমী ভৌমিকের স্বপ্ন-জাগানিয়া গান শুনিয়ে মন্ত্রী বলেন, স্বপ্ন থাকতে হবে। স্বপ্ন না থাকলে অনেকদূর যাওয়া  যাবে না।

কাস্টমস কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কোনো অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা বরদাশত করা হবে না। যেভাবেই হোক, পণ্য আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণা বন্ধ করতেই হবে। এ জন্য আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে শতভাগ পণ্য চালানের পরীক্ষার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, সবার মধ্যে এই বার্তা পৌঁছে দিন। এ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে মিথ্যা ঘোষণার প্রবণতা অনেক কমবে এবং শুল্ক্ক ফাঁকি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। উল্লেখ্য, বর্তমানে দ্বৈবচয়নের মাধ্যমে ১৫ শতাংশ পণ্য চালান পরীক্ষা করে কাস্টম।

আমদানি পণ্যের মূল্য নির্ধারণে একসময় চালু হওয়া প্রাক-জাহাজীকরণ ব্যবস্থা বা পিএসআই ফের চালু করা যায় কি-না, সে বিষয়টি এনবিআর কর্মকর্তাদের ভেবে দেখার কথা বলেন তিনি। আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, এমন কিছু করা হবে না, যাতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। এ লক্ষ্যে আইনকানুন আরও সহজের তাগিদ দেন তিনি। যেখানে প্রয়োজন, সেখানে সংস্কার করতে হবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।

দায়িত্ব গ্রহণের পর এনবিআরের সঙ্গে গতকাল রোববার ছিল অর্থমন্ত্রীর দ্বিতীয় বৈঠক। এর আগে কর বিভাগের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেন তিনি। গতকালের বৈঠকে এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া, অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালুকদার, রাজস্ব বোর্ডের ভ্যাট ও কাস্টমস বিভাগের সংশ্নিষ্ট সদস্যসহ মাঠ পর্যায়ের সব কাস্টমস ও ভ্যাট কমিশনার উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে নতুন ভ্যাট আইনের সর্বশেষ অবস্থান তুলে ধরেন কমিশনার (চলতি দায়িত্ব) ও ভ্যাট অনলাইনের প্রকল্প পরিচালক সৈয়দ মুসফিকুর রহমান এবং নতুন শুল্ক্ক আইনের খসড়া উপস্থাপন করেন এনবিআরের সদস্য (কাস্টমস নীতি) ফিরোজ শাহ আলম। ভ্যাট ও কাস্টমস কমিশনাররা তাদের সমস্যা নিয়ে বক্তব্য দেন।

নতুন ভ্যাট আইনে পণ্য ও সেবার সর্বক্ষেত্রে একটি বা অভিন্ন (১৫%) রেট নির্ধারণ করা হয়, যা এ বছরের জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। অভিন্ন রেটের বিষয়ে ব্যবসায়ীদের তীব্র বিরোধিতা রয়েছে। ফলে আগের অবস্থান থেকে সরে এসে একাধিক রেট করার চিন্তাভাবনা করছে সরকার। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পেতে বৈঠকটি ডাকা হয়। সূত্র বলেছে, নতুন ভ্যাট আইনটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় সবার, বিশেষ করে এফবিসিসিআইসহ শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেই চূড়ান্ত করতে চায় সরকার।

খসড়া শুল্ক্ক আইনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন এনবিআর সদস্য ফিরোজ শাহ আলম। কাস্টমস বিভাগকে আধুনিকায়নে নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এই বিভাগে কাগুজে কোনো কাজ হবে না। সহজ ও দ্রুততার সঙ্গে যাতে পণ্য খালাস হয়, সে জন্য এসই আই কুডা সফটওয়্যারের উন্নত সংস্করণের কাজ শুরু হয়েছে। তিনি আরও জানান, কিছু বড় ব্যবসায়ী গ্রুপ আছে, যারা যে পরিমাণ ভ্যাট দেন, তার চেয়ে বেশি ফেরত নেন। এসব বিষয় বিশ্নেষণ করে দেখা হচ্ছে, রেয়াতি সুবিধা যৌক্তিকভাবে দেওয়া হচ্ছে কি-না। এ সময় অর্থমন্ত্রী বলেন, এমন কিছু করা যাবে না, যাতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন।

এনবিআর সদস্য খন্দকার আমিনুর রহমান বলেন, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ও বিশ্ব কাস্টমস সংস্থা বলেছে, পিএসআই ভালো পদ্ধতি নয়। ফলে এটি পুনরায় চালু করা ঠিক হবে না।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার কাজী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কারা মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি করছেন, তাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে।

ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনার ড. আবদুল মান্নান মিথ্যা ঘোষণা বন্ধে প্রতিটি কাস্টম হাউসে স্ক্যানার মেশিন বসানোর প্রস্তাব করেন। এ সময় অর্থ সচিব জানান, এই মেশিন ক্রয়ে অর্থ চাইলে দেওয়া হবে। অপচয় ও অপব্যবহার বন্ধে অটোমেশনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন বন্ড কমিশনার হুমায়ন কবীর। ভ্যাট ফাঁকি বন্ধে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তৎপর রয়েছেন বলে জানান অডিট ইন্টেলিজেন্স ও তদন্ত দপ্তরের মহাপরিচালক এ এফ এম আবদুল্লা। বৈঠকে ঢাকা উত্তরের ভ্যাট কমিশনার জাকিয়া সুলতানা, বেনাপোলের কমিশনার বেলাল হোসেনসহ অন্য কর্মকর্তারা বক্তব্য দেন।







মন্তব্য করুন