ত্রিকালদর্শী বরেণ্য সাহিত্যিক সুস্মিতা ইসলাম আর নেই। শনিবার রাত সাড়ে ৯টায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।

সুস্মিতা ইসলামের জন্ম কলকাতায় ১৯২৬ সালের ১২ ডিসেম্বর। বাবা ত্রিদিব নাথ রায় ছিলেন খ্যাতিমান আইনজীবী, সংস্কৃত সাহিত্যে পণ্ডিত ও মধ্যযুগবিষয়ক গবেষক। পিতামহ নিখিল নাথ রায় খ্যাতিমান ইতিহাসবিদ। মা কল্যাণী রায় কবি হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেন। পারিবারিকভাবে শৈশবকাল থেকেই তিনি শিল্প-সাহিত্যের আবহে বড় হয়ে ওঠেন।

১৯৪৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান কবি গোলাম মোস্তফার ছেলে বৈমানিক মুস্তাফা আনোয়ারের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। মুস্তাফা আনোয়ার উপমহাদেশের প্রথম মুসলিম তথা প্রথম বাঙালি মুসলিম বৈমানিক ক্যাপ্টেন। মাত্র ৪২ বছর বয়সে তিনি বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান। সুস্মিতা ইসলাম ও মুস্তাফা আনোয়ার দম্পতির দুই সন্তান। ছেলে মরহুম প্রদীপ আনোয়ার ছিলেন জাহাজের ক্যাপ্টেন ও মেয়ে মনীষা আনোয়ার হক বাবলী বর্তমানে ঢাকায় বসবাসরত ব্যবসায়ী।

বিবাহসূত্রে ঢাকা হয়ে ওঠে সুস্মিতা ইসলামের স্থায়ী নিবাস। ১৯৬১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএড পাস করে রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইইআর-এ শিক্ষক হিসেবেও কাজ

করেন। সুস্মিতা ইসলাম ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭১-৭৩ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা সহকারীর কাজ করেন। আশির দশকে ঢাকায় ফিরে ইউনেস্কোর উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরিণত বয়সে জীবনের অভিজ্ঞতা আর টানাপড়েনগুলো অসামান্য দক্ষতায় তিনি লিখতে শুরু করেন, যা পাঠকের হৃদয়ের গভীরে নাড়া দেয়।

'আমার দিনগুলো' সুস্মিতা ইসলামের অন্যতম প্রধান গ্রন্থ। আত্মজীবনীমূলক এই গ্রন্থে তিনি লিখেছেন জীবনের ভাঙা-গড়া আর চড়াই-উতরাইয়ের ঘটনাপরিক্রমা। সুখ-দুঃখের ভেলায় চেপে লেখিকা যে সময়টা অতিক্রম করেছেন তার বিশ্বস্ত রূপায়ণ করেছেন এই গ্রন্থে। ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের প্রেক্ষাপট, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গামুখর কলকাতা, একাত্তরে জগন্নাথ হলের মর্মান্তিক সেই গণহত্যা আর ট্রাকবোঝাই করে বধ্যভূমিতে লোকজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া তারই ভাষ্য উঠে এসেছে এই বইয়ে। বনেদি হিন্দু পরিবারের মেয়ে হয়ে একজন মুসলমান ছেলের সঙ্গে বিয়ে হওয়ায় তাকে সইতে হয়েছে পরিবার ও সমাজের অবজ্ঞা। তবুও তিনি এগিয়ে গেছেন। 'আমার দিনগুলো' সুস্মিতা ইসলামের স্মৃতিকথাই নয়, বরং অনুপ্রেরণার একখণ্ড দলিল। একই সঙ্গে উনিশ শতকে বাঙালির অনবদ্য এক সমাজ দলিল। এর জন্য তিনি ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ২০১৪ অর্জন করেন।

'ফিরে ফিরে চাই' সুস্মিতা ইসলামের আরেকটি অনবদ্য গ্রন্থ। ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে কলকাতায় পারিবারিকভাবে তিনি অনেক গুণীজনের সংস্পর্শ লাভ করেন। নানাবিধ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে শরিক হওয়ার সুযোগ হয় তার। বিয়ের কারণে তিনি যুক্ত হয়েছিলেন ঢাকার বিস্মৃত জীবনধারার সঙ্গে। পাশাপাশি রয়েছে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানোর বিচিত্র অভিজ্ঞতা। বিস্মৃত সেসব দিনের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের পরিচয় সুস্মিতা ইসলাম তুলে ধরেছেন 'ফিরে ফিরে চাই' গ্রন্থে। একই সঙ্গে বাংলা শিল্প ও সাহিত্যের খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে তার পরিচিতি ও স্মৃতির বিবরণী দিয়েছেন, যাদের মধ্যে আছেন আবু সয়ীদ আইয়ুব, সৈয়দ মুজতবা আলী, কমলকুমার মজুমদার, সি এইচ আঁতমা, গোলাম মোস্তফা, নীরেন্দ্রনাথ রায় ও শামসুর রাহমান।

সুস্মিতা ইসলামের মরদেহ পরিবারের সদস্যদের শেষবার দেখার জন্য অ্যাপোলো হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। তার পরিবারের সদস্যরা অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন থেকে আজ সকালে দেশে পৌঁছবেন। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সুস্মিতা ইসলামকে তার গুলশানের বাসায় রাখা হবে। বাদ জোহর গুলশান আজাদ মসজিদে জানাজার পর আজিমপুর গোরস্তানে স্বামী মুস্তাফা আনোয়ারের কবরের পাশে তাকে শায়িত করা হবে।



মন্তব্য করুন