তখন মাত্র একুশ বছরের তরুণ হাসান হাফিজুর রহমান। রক্তাক্ত একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম বছর পূর্তিতে তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় একুশের প্রথম সংকলন 'একুশে ফেব্রুয়ারী'। ভাষাসংগ্রামী মোহাম্মদ সুলতানের প্রকাশনা সংস্থা পুঁথিপত্র থেকে প্রকাশিত হয়েছিল সেটি। সেদিন যারা ওখানে লিখেছিলেন, তারা সবাই পরবর্তী সময়ে দেশের স্বনামধন্য লেখক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। ১৮৩ পৃষ্ঠার ওই সংকলনের পাতায় পাতায় ছিল তারুণ্যের বিদ্রোহের সুর। প্রতিধ্বনিত হয়েছিল বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার কঠিন প্রত্যয়। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের অনন্য এই সংকলন পাওয়া যায় না এখন। মাঝে প্রকাশনা সংস্থা সময় প্রকাশন বইটি প্রকাশ করলেও নতুন করে পুনর্মুদ্রিত হয়নি আর।

১৯৫৩ সালের মার্চে প্রকাশিত হয় 'একুশে ফেব্রুয়ারী'। ভাষাসংগ্রামী মোহাম্মদ সুলতানের প্রকাশনা সংস্থা পুঁথিপত্র ছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের উল্টো দিকে ২৭/৬ বকশীবাজারে। এর সহ-প্রকাশক ছিলেন এম আর আখতার মুকুল। সংকলনটির তাৎপর্যময় প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন শিল্পী আমিনুল ইসলাম। প্রতিটি রচনার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক রেখা অঙ্কন করেছিলেন শিল্পী মুর্তজা বশীর ও বিজন চৌধুরী। সংকলনটির প্রচ্ছদের পরের পৃষ্ঠার 'একুশে ফেব্রুয়ারী' লেখাটিও ছিল মুর্তজা বশীরের। পাইওনিয়ার প্রেসের পক্ষে এম এ মুকিত ছেপেছিলেন এবং ব্লক তৈরি করেছিল ঢাকার বাদামতলীর এইচম্যান কোম্পানি। প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ক্রাউন সাইজে। দাম ছিল দুই টাকা আট আনা বা আড়াই টাকা। সম্পাদক হাসান হাফিজুর রহমানের সঙ্গে বইটির প্রুফ দেখেছিলেন আনিসুজ্জামান।

হাসান হাফিজুর রহমানের অনুরোধে নিজ হাতে উৎসর্গপত্রটি লিখে দেন জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। চায়নিজ ইঙ্ক ও সরু কলম দিয়ে ট্রেসিং পেপারে বাঁকা লাইনে লেখেন তিনি। সেভাবেই ছাপা হয়েছিল তা। যাতে বলা হয়েছে, 'যে অমর দেশবাসীর মধ্যে থেকে জন্ম নিয়েছেন একুশের শহিদেরা, যে অমর দেশবাসীর মধ্যে অটুট হয়ে রয়েছে একুশের প্রতিজ্ঞা, তাদের উদ্দেশ্যে।'

সংকলনটির শুরুতেই 'একুশে ফেব্রুয়ারী' শিরোনামে সম্পাদকীয়, যা লিখেছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান। এর পর 'সকল ভাষার সমান মর্যাদা' শিরোনামে প্রবন্ধ লিখেছিলেন আলী আশরাফ। এতে ১১টি একুশের কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল। সেগুলো লিখেছিলেন শামসুর রাহমান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আবদুল গণি হাজারি, ফজলে লোহানী, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আনিস চৌধুরী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, জামালউদ্দিন, আতাউর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক ও হাসান হাফিজুর রহমান। ছিল পাঁচটি একুশের গল্প। 'মৌন নয়' শিরোনামে শওকত ওসমান, 'হাসি' শিরোনামে সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, 'দৃষ্টি' শিরোনামে আনিসুজ্জামান, 'পরিমাটি' শিরোনামে সিরাজুল ইসলাম এবং 'অগ্নিবাক' শিরোনামে আতোয়া রহমান। একুশের নকশা অধ্যায়ে 'একটি বেওয়ারিশ ডায়েরির কয়েকটি পাতা' শিরোনামে মুর্তজা বশীর এবং 'অমর একুশে ফেব্রুয়ারীর রক্তাক্ত স্বাক্ষর' শিরোনামে সালেহ আহমদ দুটি লেখা লেখেন। একুশের গান ছিল আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী ও তোফাজ্জল হোসেনের। সবশেষে 'একুশের ইতিহাস' শিরোনামে একুশের ঘটনাপঞ্জি লেখেন কবিরউদ্দিন আহমদ।

সংকলনটির সম্পাদকীয়তে হাসান হাফিজুর রহমান লিখেন, 'একটি মহৎ দিন হঠাৎ কখনও জাতির জীবনে আসে যুগান্তের সম্ভাবনা নিয়ে। পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাসে একুশে ফেব্রুয়ারী এমনি এক যুগান্তকারী দিন।'

সংকলনটির গুরুত্ব প্রসঙ্গে এক লেখায় সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক বলেন, 'শুধু ঐতিহাসিক তাৎপর্যের কারণেই নয়, লেখার বৈচিত্র্য ও মানের বিচারেও একুশের প্রথম সংকলনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও উৎকৃষ্ট প্রকাশনা। এখন আমরা বাংলাদেশের প্রধান লেখক হিসেবে যাদের গণ্য করি, তাদের লেখাই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে সংকলনে।'

একুশের প্রথম সংকলনের উদ্যোক্তা ও সম্পাদক হাসান হাফিজুর রহমান এবং প্রকাশক মোহাম্মদ সুলতান আজ প্রয়াত। সেইসঙ্গে এই সংকলনটিও এখন আর নেই। হাসান হাফিজুর রহমানের মেয়ের বিশেষ অনুরোধে ২০০১ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় বইটি ক্রাইন সাইজে প্রকাশ করে সময় প্রকাশন। ২০০৬ সালের জানুয়ারি মাসে বইটির বিশেষ মুদ্রণ প্রকাশিত হয়। এ প্রসঙ্গে সময় প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহমেদ বলেন, 'হাসান হাফিজুর রহমানের মেয়ে ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত বইয়ের আদলে সংকলনটি প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ২০০১ সালে প্রথম প্রকাশ ও ২০০৬ সালে বিশেষ মুদ্রণ প্রকাশিত হয়। কিন্তু পরে আর কোনো মুদ্রণ প্রকাশিত হয়নি।'

সংকলনটির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেন, 'এ সংকলন ভাষা আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। এটি বারবার পুনর্মুদ্রিত হওয়া উচিত। বাংলা একাডেমিও চাইলে এ দায়িত্ব নিতে পারত।'

সংকলনটির রেখাচিত্র অঙ্কনকারী শিল্পী মুর্তজা বশীর বলেন, 'সে সময় খুবই কাঁচা হাতে রেখাচিত্রগুলো অঙ্কন করা হয়েছিল। তবে এর ঐতিহাসিক মূল্য অনেক। এ ধরনের সংকলনগুলো পুনর্মুদ্রণ করা জরুরি।'

মন্তব্য করুন