প্রাপ্তি বলতে শুধু সাব্বিরের সেঞ্চুরি

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯     আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

ক্রীড়া প্রতিবেদক

ধরে ধরে বাছতে গেলে কম্বলটাই না জানি মশারি হয়ে যায়! টপ অর্ডারের ব্যর্থতায় ২ রানে ৩ উইকেট পড়ে যাওয়া, প্রথম পাঁচ ওভারে ব্যাট থেকে মাত্র এক রান আসা! মুশফিক-মাহমুদুল্লাহর অভিজ্ঞ মিডল অর্ডার ভাঙন সামলাতে না পারা, বোলিংয়ে মুস্তাফিজের ৯৩ রান দিয়ে খরুচে বোলারের রেকর্ড গড়া- ডানেডিনে কাল সবকিছুই ছিল হতাশা আর অসহায়ত্বে ভরা টাইগারদের এক আত্মসমর্পণের ম্যাচ। যেখানে ৩-০-তে হোয়াইটওয়াশের ব্যথার মধ্যেও প্রাপ্তি বলতে সাব্বিরের ওই প্রথম পাওয়া সেঞ্চুরিটি। দলে আসা নিয়ে অনেক অপমান সহ্য করে, অনেক অভিমান চাপা রেখে এদিন ওয়ানডেতে সাব্বির তার প্রথম সেঞ্চুরিটি অর্জন করেছেন। তার ব্যাট থেকে আসা ১০২ রানের কারণেই শেষ পর্যন্ত দলের স্কোর ২৪২ রানে পৌঁছতে পেরেছে। নিউজিল্যান্ডের তোলা ৩৩০ রান তাড়া করতে নেমে ৮৮ রানের হার- ভবিষ্যতে স্কোরকার্ডটি হয়তো এই হারকে 'সম্মানজনক' বলবে! কিন্তু যেটা বলবে না, তা হলো এদিন ব্যাটিংয়ের এক পর্যায়ে কী ভয়ঙ্কর গা হিম করা পরিস্থিতিই না সৃষ্টি হয়েছিল। ৬১ রানে ৫ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর সাব্বিরও ০ রানে জীবন পেয়েছিল। যেটা তিনি পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছেন সাইফুদ্দিন আর মিরাজকে সঙ্গে নিয়ে। সাইফুদ্দিনের সঙ্গে ষষ্ঠ উইকেটে ১০১ আর মিরাজের সঙ্গে অষ্টম উইকেটে ৫৭ রানের জুটিই শেষ পর্যন্ত ইনিংসটি ৪৭.২ ওভার পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়।

তা না হলে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে করা ২০০৭ সালে কুইন্সটাউনের সেই ভয়াল স্মৃতিই হয়তো ফিরে আসত ডানেডিনে। সেবার ৯৩ রানে কিউদের কাছে অলআউট হওয়ার পর ম্যাককুলাম রান তাড়া করতে নেমে ৬ ওভারের মধ্যেই ম্যাচ শেষ করে দিয়েছিলেন! মাঝের এই বারো বছরে আরও বহুবার নিউজিল্যান্ড সফর করেছেন দলের সিনিয়র ক্রিকেটাররা। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তাদের মাটিতে সব ফরম্যটে খেলা ২৪ ম্যাচের সবগুলোতেই হারতে হয়েছে টাইগারদের। মাশরাফির জন্য এটাই হয়তো নিউজিল্যান্ডে শেষ সফর, তাই তার একটা ইচ্ছা অপূর্ণই থেকে গেল। 'আমাদের ব্যাটসমম্যানরা ভীষণ হতাশ। এতটা বাজে ব্যাটিং কেউ চিন্তাই করেনি। তারপরও সাব্বিরের সেঞ্চুরিটা আমাদের জন্য ইতিবাচক।' ম্যাচের পর মাশরাফির সরল স্বীকারোক্তি। আসলে বিশ্বকাপের আগে তিনি দলের সাত নম্বর ব্যাটিংয়ের জন্য যাকে খুঁজছিলেন তাকেই হয়তো এদিন পেয়ে গেছেন। কিন্তু গোটা সিরিজে তিনি যা পেয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে চিন্তা বাড়াবে অধিনায়কের।

দু'দিন আগেও তামিম বলেছিলেন- 'এই সিরিজের আমাদের মূল সমস্যাই হচ্ছে প্রথম দশ ওভার। ওই সময়টাতে আমরা বেশ কিছু উইকেট হারিয়ে ফেলছি। তাই শুরুতেই উইকেট না হারানোর প্রতি আমাদের মনোযোগ থাকবে।' এ কথা বলেই কি-না তিনি কাল ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই সাউদিকে ডাউন দ্য উইকেটে এসে তুলে মারতে গেলেন! ৫, ৫-এর পর ০- গোটা সিরিজে অভিজ্ঞ ওপেনার এই হলো তামিমের স্কোর। আর লিটন? ১, ১ এবং ১- পরিসংখ্যান বলছে কোনো দ্বিপক্ষীয় সিরিজে বাংলাদেশি কোনো ব্যাটসম্যানের এটাই সর্বনিম্ন স্কোর। তিনিও এদিন সাউদির শিকার। ম্যাট হেনরিকে ঘরোয়া লীগ খেলতে পাঠিয়ে ছয় ম্যাচ বাদে সাউদিকে ওয়ানডেতে নামিয়েছিল নিউজিল্যান্ড। ঘণ্টায় ১৪৩ থেকে ১৪৯ কিলোমিটার গতির সঙ্গে সাউদির সুইং, অন্যদিক থেকে বোল্ট তো আছেনই। ফুটমুভমেন্টে গণ্ডগোল থাকায় সৌম্যও এদিন বোল্ড হয়ে বোকা বনে যান। ওই সময় মুশফিক এসে বোল্টকে পয়েন্ট দিয়ে বাউন্ডারি হাঁকিয়ে ভুতুড়ে ওই পরিবেশ থেকে কিছুটা বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন। ওই ওভারেই তিন তিনটি বাউন্ডারি পান মুশফিক। সাউদিকে পুল করে ছক্কা হাঁকিয়ে রিয়াদও মেজাজে ফিরে আসার ইঙ্গিত দেন। এরই মধ্যে বোল্টের একটি বলে আঙুলে চোট পান- সেখানেই তালটি কেটে যায় দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যানটির। এরপর বোল্টকে ফ্লিক করতে গিয়ে থার্ডম্যানে ক্যাচ তুলে ১৭ রান করে বিদায় নেন মুশফিক। রিয়াদও গ্র্যান্ডহোমকে স্লগ করতে গিয়ে ১৬ রান করে আউট হয়ে যান।

দলের ওই পরিস্থিতিতে ড্রেসিংরুমের একটি দৃশ্য বারবার ক্যামেরাবন্দি করতে থাকে স্কাইস্পোর্টস। কোনো কিছু নিয়ে প্রচণ্ড বিরক্ত মুশফিক উত্তপ্ত বাক্যবিনিয়ম করতে থাকেন তামিমের সঙ্গে। আসলে গোটা সিরিজে সিনিয়দের কেউই প্রত্যাশার ধারেকাছেও খেলতে পারেননি। যা পেরেছেন তা কেবল মিঠুন, সাইফুদ্দিন আর সাব্বিরের মতো দলের অনিমিয়তরা। এদিন সাব্বির শুরু করেন লকি ফার্গুসনকে গালি দিয়ে বাউন্ডারির রাস্তা বের করে। নিশামের শর্টবল পুর করে, সান্টনারকে কাট করে- হাঁটু গেড়ে সুইপ করে বাউন্ডারি হাঁকাতে থাকেন। তার প্রতিটি বাউন্ডারির সঙ্গে মিশে ছিল প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস। মাত্র ৫৯ বলেই ৫০ রানের দেখা পান সাব্বির। তার সঙ্গে দারুণ সঙ্গ দিয়ে যান সাইফুদ্দিন। সিঙ্গেলস, ডাবলসের সঙ্গে স্ট্রাইকরোটেড করে মাঝে মাঝে বাউন্ডারি। একসময় বাংলাদেশ দেড়শ' রানে পৌঁছে যায় কোনোরকম আতঙ্ক না ছড়িয়েই। কিন্তু বোল্ট তার দ্বিতীয় স্পেলে ফিরেই সাইফুদ্দিনকে প্রথম বলেই আউট করে দেন। ৪৪ রান করা সাইফুদ্দিন পুল করতে গিয়ে ক্যাচ তুলে বসেন। মাঝে মাশরাফি এসে ২ রান করার পর হাল ধরেন মিরাজ। সাউদিকে দারুণ এক কাভার ড্রাইভে বাউন্ডারি হাঁকিয়ে সাব্বিরকে বার্তা দেন যে, তিনি প্রস্তুত লম্বা ইনিংসের জন্য। গুনে গুনে সাতটি চার মারেন মিরাজ, ৩৪ বলে ৩৭ রান করে মিরাজ সাউদির বলে ক্যাচ দেওয়ার আগে সাব্বিরের সঙ্গে তার সেঞ্চুরিটি উদযাপন করে যান। মিরাজ ফিরে যাওয়ার পর পরের আট বলের মধ্যে বাকি দুই ব্যাটসম্যানের বিদায়। সাউদিকে পুল করতে গিয়ে সাব্বির আউট হয়ে যান। বরোটি চার আর দুটি ছক্কায় সাজানো থাকে তার সাহসী এই ইনিংসটি।

২০০৭ সালে বাংলাদেশ যেবার প্রথম নিউজিল্যান্ড সফর করে, সেবার তিনটি ওয়ানডেতে যথাক্রমে রান তুলেছিল- ২০১, ১৮১ আর ৯৩। আর এবার ২৩২, ২২৬, ২৪২। সেবার বোলাররা তিন ম্যাচে শিকার করেছিল ৯ উইকেট। আর এবার ১০ উইকেট! এদিন টস জিতে মাশরাফি যখন প্রথমে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নেন তখনও আগের দুই ম্যাচের থেকে অন্তত ভালো অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। ওপেনার মুনরোকে ২১ রানের মধ্যেই ফিরিয়ে দেন মাশরাফি, আগের দুই ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান গাপটিলও সাইফুদ্দিনের বলে তামিমের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান। প্রথম পঁচিশ ওভারে নিউজিল্যান্ডের রান ছিল ১২০, আর পরের পঁচিশে আসে ২১০ রান! ওয়ানডে ক্যারিয়ারে যে কি-না আগে ৬৩ রানের বেশি দেননি সেই মুস্তাফিজই দিয়ে বসেন এদিন ৯৩ রান। মুস্তাফিজ-রুবেলদের এমন বোলিংয়ের সামনেই এদিন দারুণ একটি রেকর্ড গড়েন রস টেলর। নিউজিল্যান্ডের হয়ে ওয়ানডেতে সবচেয়ে বেশি ৮০২৬ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। তবে টেলর নয়, ম্যাচসেরা হয়েছেন এদিন টিম সাউদি, ৬৫ রানে ৬ উইকেট নিয়ে এদিন তিনিই যে টাইগারদের সব আশা তছনছ করে দিয়েছিলেন।