একুশের স্মৃতি-২১

অন্তত একটি ফলক থাকুক

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯     আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

দীপন নন্দী

'স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু, আমরা এখনো/চার কোটি পরিবার/খাড়া রয়েছি তো! যে-ভিত কখনো কোনো রাজন্য/পারেনি ভাঙতে...'

-আলাউদ্দিন আল আজাদ

ঢাকায় নির্মিত প্রথম শহীদ মিনার ভেঙে ফেলার প্রতিবাদে কবি এভাবেই সাহস জুগিয়েছিলেন ভাষাসংগ্রামীদের। পাকিস্তানি জান্তা সরকার মুছে ফেলতে চেয়েছিল ভাষা আন্দোলনের প্রধানতম স্মারকটি। পরবর্তী সময়ে নির্মিত বর্তমান শহীদ মিনার এখনও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু পাকিস্তান সরকার যা করতে পারেনি, গত ৬৭ বছরে তিলে তিলে এ দেশের মানুষ তা করেছে চেতন-অবচেতনে। ঢাকা শহর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা একুশের অমর স্মৃতিচিহ্নগুলো হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির আড়ালে। উন্নয়নের বাহানায়,

অযত্ন-অবহেলায় হারিয়ে গেছে একুশের স্মৃতি। ভাষাসংগ্রামীরা বলছেন, নতুন প্রজন্মের কাছে একুশের স্মৃতি স্মারক ও স্থানগুলো শুধুই বইয়ের পাতায় আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাদের দাবি, ধ্বংস হয়ে যাওয়া স্মৃতিচিহ্নগুলোর সামনে অন্তত একটি ফলক স্থাপনের। যাতে নতুন প্রজন্মের কাছে একুশের ইতিহাস তুলে ধরা যায়।

বিগত বিশ দিন ধরে সমকালের পাতায় উঠে এসেছে একুশের স্মৃতি স্মারকগুলোর ইতিহাস ও এর হারিয়ে যাওয়ার বর্ণনা। যাতে দেখা গেছে, একুশের বেশিরভাগ স্মৃতিচিহ্নই উন্নয়নের

'অজুহাতে' নষ্ট করা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ উন্নয়নের বার্তা নিয়ে এসে নষ্ট করেছে আমতলা, বেলতলা, ১৪৪ ধারা ভঙ্গের গেটের মতো ঐতিহাসিক স্থাপনা। যে নীলক্ষেত ব্যারাকে সরকারি কর্মচারীরা প্রতিবাদ করেছিলেন, সেখানে আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন। কিন্তু সেখানকার ইতিহাস জানে না খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও সংরক্ষিত হয়নি আওয়ামী লীগের ৯৪ নবাবপুর ও ১৫০ মোগলটুলীর কার্যালয়টি। জরাজীর্ণভাবে টিকে আছে নবাবপুরের ভবনটি। কিন্তু মোগলটুলীর ভবনটিতে এখন বহুতল মার্কেট। সবচেয়ে সহজ সংরক্ষণের উপায় থাকা সত্ত্বেও একুশের প্রথম বই ও প্রথম সংকলন বাজারে নেই। মেডিকেল ব্যারাক, নীলক্ষেত ব্যারাক, ১৯ নং আজিমপুরসহ অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা আজ বিলুপ্ত।

এ প্রসঙ্গে ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক বলেন, 'জাতি হিসেবে আমরা ঐতিহ্যকে মর্যাদা বা সম্মান দিতে পারি না। যার কারণেই একুশের স্মৃতিস্থানগুলো আমরা সংরক্ষণ করতে পারিনি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকায় একুশের সবচেয়ে উজ্জ্বলতম স্মৃতিস্থানগুলো ছিল। কিন্তু তাদের ব্যর্থতার কারণে সেগুলো সংরক্ষিত হয়নি। সময়ের প্রয়োজনে মেডিকেল কলেজের নতুন ভবনের প্রয়োজনীতা অনিবার্য ছিল। কিন্তু ছোট করে হলেও আমতলার আমগাছটি সংরক্ষণ করা যেতে পারত। পরে প্রতীকী একটি আমগাছের চারা লাগানো হলেও সেটিও সংরক্ষিত হয়নি। কিন্তু সেখানে যদি একটি ফলক স্থাপন করা যেত, তাহলেও মেনে নেওয়া যেত। কারণ, ওই ফলকে ছোট্ট করে হলেও ইতিহাসের বর্ণনা থাকত। যার ফলে নতুন প্রজন্ম একুশের সঠিক ইতিহাস জানতে পারত।'

জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় কমিউনিস্ট পার্টির যুব সংগঠন যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক ছিলেন। ভাষা আন্দোলনকে কাছ থেকে দেখা তিনি বলেন, 'আমাদের দেশে ঐতিহাসিক ভবনগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষিত হয় না। লন্ডনসহ বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে দেখেছি, ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ভবন, কবি-সাহিত্যিকদের মতো বিশিষ্টজনদের বাসভবনের সামনে ফলক স্থাপন করা থাকে। যাতে সেই বাড়িটি বা ব্যক্তি সম্পর্কে ছোট্ট একটি ইতিহাস লেখা থাকে। আমাদের এখানে চাইলে এখনও এ ফলক স্থাপন করা সম্ভব। তাহলে নতুন প্রজন্ম ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারত।'

বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীরের দাবি, শহীদ মিনারের সামনের সড়কটির নামকরণ করা হোক 'একুশে স্মরণী'। এ বিষয়ে তিনি বলেন, 'একুশের যে চেতনার কথা আমরা বলি, আমার সন্দেহ আছে আদৌ কি সেই চেতনা আমরা প্রতিষ্ঠা করতে চাই কি-না? শহীদ মিনারের সামনে একটি বিলবোর্ড স্থাপন করা যেতে পারে। যেখানে সংক্ষেপে ভাষা আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস বর্ণিত থাকবে। যাতে শিশু-কিশোররা তো বটেই, বড়রাও ইতিহাস সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করবে। সেই সঙ্গে শহীদ মিনারের সামনের যে পথ, তার নামকরণ করা হোক 'একুশের স্মরণী'। এর ফলে সবাই ইতিহাস সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হবে। এবং সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে।'

ভাষা আন্দোলন গবেষক এবং ভাষা আন্দোলন স্মৃতি রক্ষা পরিষদের সভাপতি এম আর মাহবুব বলেন, 'ঐতিহাসিক স্থাপনা ও নিদর্শন একটি জাতির গৌরবদীপ্ত ইতিহাসের শিকড় এবং কালের সাক্ষী হিসেবে পরিচিত। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত অধিকাংশ স্থান, স্থাপনা ও স্মারকগুলো আজ বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে গেছে। ভাষা আন্দোলনের ঐতিহ্যবাহী স্মারকগুলো সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ না থাকায় বিভিন্ন সময় ইতিহাস অচেতন ও স্বার্থান্ধ মানুষ ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে এবং আজও চালাচ্ছে।'

একুশের স্মৃতিচিহ্ন ও স্মারকগুলো হারিয়ে গেছে তিলে তিলে। এসব স্থাপনা ধ্বংস করে গড়ে তোলা হয়েছে নতুন ভবন। যা কিছু এখনও বর্তমান আছে, তাও অপব্যবহার ও সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংসের মুখে। এখনই এর সংরক্ষণ করার দাবি ভাষাসংগ্রামী ও এর সঙ্গে সংশ্নিষ্টদের। তাদের সঙ্গে কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে আমরাও বলতে চাই- 'অন্তত একটি ফলক থাকুক'।