ছিমছাম প্রাঙ্গণে স্বস্তি পাঠক-প্রকাশকের

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলার বিন্যাস এবং ব্যবস্থাপনা অন্যবারের চেয়ে আলাদা, অন্যরকম। বাংলা একাডেমির চিরচেনা প্রাঙ্গণ পেরিয়ে বাঙালির প্রাণের এই মেলা ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বর্ধিত হয়েছিল বড় পরিসরের প্রয়োজনে। কিন্তু উদ্যান প্রাঙ্গণের মেলাজুড়ে এলোমেলো-অগোছালো ছাপ ছিল প্রতিবার। তাই বড় জায়গায় স্থানান্তর করেও পাঠক ও প্রকাশকদের খুব বেশি স্বস্তি দিতে পারেনি আয়োজকরা। সেই অপূর্ণতা ঘোচানোর লক্ষ্য নিয়েই স্থপতি এনামুল করিম নির্ঝরকে যুক্ত করা হয় এবারের গ্রন্থমেলা আয়োজক কমিটিতে। বাংলা একাডেমির এই সিদ্ধান্তের সুবাদেই এবার অত্যন্ত গোছালো এবং পরিপাটি মেলা প্রাঙ্গণে স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছেন পাঠক। তাতে হাসি ফুটেছে প্রকাশকের ঠোঁটেও।

বনেদি প্রকাশনা সংস্থা মাওলা ব্রাদার্সের প্রকাশক আহমেদ মাহমুদুল হক এ প্রসঙ্গে সমকালকে বললেন, এককথায় এবারের মেলার বিন্যাস হয়েছে চমৎকার। মেলার স্থপতি এনামুল করিম নির্ঝরকে ধন্যবাদ জানাই। তিনি প্রকাশকদের মনের কথা বুঝেছেন। পাঠকবান্ধব করে সাজিয়েছেন মেলার এই প্রাঙ্গণ।

সংশ্নিষ্টরা জানান, মেলা বিন্যাস পরিবর্তনের লক্ষ্য থেকেই এবারের পরিচালনা কমিটিতে স্থপতি নির্ঝরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তিনি সোহরাওয়ার্দী অংশে মেলা সাজানোর সার্বিক পরিকল্পনা করেছেন। তার নেতৃত্বে শিল্পী সব্যসাচী হাজরা, লিটন কর, মেহেদী হক, এ এ মারুফ এবং সিস্টেম আর্কিটেক্টস নামক প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছেন। নির্ঝর জানালেন, বাণিজ্যিক চিন্তা থেকে নয়, মেলা কমিটির সদস্য হয়ে একজন স্থপতি হিসেবে পেশাগত দায়িত্ববোধ থেকে তিনি এই কাজটি করেছেন।

এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার বলেন, এবার মেলাটা গোছানো মনে হচ্ছে। বিন্যাসটা সুন্দর হওয়ায় পাঠকরা স্বাচ্ছন্দ্যে মেলায় ঘুরেফিরে বই কিনতে পারবেন। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় মেলা প্রাঙ্গণে কথোপকথনের সময় রামেন্দু মজুমদার জানান, এবারের মেলায় কথাপ্রকাশ থেকে তার প্রবন্ধের বই 'বুদ্ধিজীবীর দায় ও অন্যান্য' প্রকাশিত হবে।

এর আগে গতকাল ছুটির দিন হিসেবে সকাল ১১টায় মেলা শুরু হয়। গতকাল ছিল এবারের মেলার প্রথম শিশুপ্রহর। দুপুর ১টা পর্যন্ত অভিভাবকদের সঙ্গে খুদে পাঠক ঘুরে বেড়ায় মেলাজুড়ে। এবার মেলার শিশু চত্বরটিও সাজানো হয়েছে ভিন্ন আঙ্গিকে। এই অংশের নকশা করেছেন শিল্পী সব্যসাচী হাজরা ও কার্টুনিস্ট মেহেদী হক। শিশু চত্বরের বটতলায় বানানো হয়েছে সিসিমপুর মঞ্চ। গতকাল সকালে সেই মঞ্চে নেচে-গেয়ে শিক্ষামূলক প্রচারে ব্যস্ত ছিল শিশুপ্রিয় চরিত্র হালুম, টুকটুকি, ইকরি আর সিকু। তাদের পরিবেশনা মন জিতেছে ছোট্ট দর্শনার্থীদেরও। তবে মেলার প্রথম শিশুপ্রহর আশানুরূপভাবে জমজমাট হয়নি বলে দাবি শিশুতোষ বইয়ের প্রকাশনা সংস্থা প্রগতি পাবলিশার্সের প্রকাশক আসরার মাসুদের। তিনি বলেন, শিশুপ্রহরে আমাদের বেচাবিক্রি সব সময়ই ভালো হয়। তবে এবারে মেলার দ্বিতীয় দিন হওয়ায় সেভাবে জমেনি। তবে দ্বিতীয় দিনের বিবেচনা করলে বিক্রি খারাপ নয়। এবারের প্রগতি পাবলিশার্স থেকে পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের দুটি পপ আপ বই 'নিশি কবরেজ' ও 'কোগ্রামের মধুপন্ডিত' এসেছে। পপ বইয়ের পাশাপাশি শিশুদের জন্য গ্রাফিক নভেল ও হাইপার কমিকসও রয়েছে এই প্রকাশনার স্টলে।

শিশু চত্বরে না পড়লেও শিশুতোষ বইয়ের ভালো সংগ্রহ রয়েছে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্সের প্যাভিলিয়নে। সেখানকার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ইফতেখার আহমেদ জানান, আশানুরূপ না হলেও বিক্রি খারাপ হয়নি। ভালো চলেছে মুনতাসীর মামুনের 'রাজকণ্যের জন্য' ও 'বেসিক আলী ১১'।

এদিকে, কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের ৮০তম জন্মদিন উপলক্ষে তার আত্মজীবনী গ্রন্থ 'স্মৃতিকহন' বেরিয়েছে ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ থেকে। ৮০০ টাকা মূল্যের এই বইটিতে তার আগে লেখা চারটি আত্মজীবনী 'ফিরে যাই ফিরে আসি', 'উঁকি দিকে দিগন্ত', 'এই পুরাতন আখরগুলি' ও 'দুয়ার হতে দূর'-এর সংকলিত হয়েছে।

নতুন বই :গতকাল মেলায় এসেছে ৮১টি নতুন বই। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হাসান আজিজুল হকের 'স্মৃতিকহন' (ইত্যাদি), সেলিনা হোসেনের 'সময়ের ফুলে বিষপিঁপড়া' (কথাপ্রকাশ), সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের 'কয়লাতলা ও অন্যান্য গল্প (অন্যপকাশ), মুহম্মদ জাফর ইকবালের 'যখন টুনটুনি তখন ছোটাচ্চু' (অনুপম), হরিশংকর জলদাসের 'প্রস্থানের আগে' (অন্যপ্রকাশ), কাজী রোজীর 'মধ্যিখানে সিঁথি কাটা পুরুষ গো' (মাওলা ব্রাদার্স), শাকুর মজিদের 'বুয়েটকাল' (কথাপ্রকাশ), শহীদুজ্জামানের 'ডিসকোর্স বিশ্নেষণ ও প্রায়োগিক ভাষাবিজ্ঞান' (সাহস), মঈনুস সুলতানের 'নিকারাগুয়ার পুরাতাত্ত্বিক নগরী ও নির্জন দ্বীপ' ও মোস্তাফা সেলিমের 'খবর নিশান' (উৎস), আনিসুল হকের 'দুষ্টু মেয়ের দল' ও সুমন্ত আসলামের 'অযান্ত্রিক' (সময়), মিতালী পারকিন্সের 'রিকশা কণ্যা' (ময়ূরপঙ্খী), সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম সম্পাদিত মাহবুবুল হক শাকিল স্মারকগ্রন্থ (আগামী), জাকির তালুকদারের 'মুষ্টিবদ্ধ সেই হাত' (পুঁথিনিলয়)।

মেলামঞ্চের আয়োজন :'ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রাবন্ধিক-গবেষক আবুল মোমেন। ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিকের সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন লেখক-সাংবাদিক হারুন হাবীব, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এমরান কবির চৌধুরী এবং গবেষক মোফাকখারুল ইকবাল। আহমদ রফিক বলেন, ভাষা আন্দোলন চেতনার যে প্রদীপ প্রজ্বালন করেছিল, তারই বিচ্ছুরিত শিখায় আমরা আমাদের জাতিসত্তার স্বরূপ আবিস্কার করেছি এবং আঁধার রাতের পরিধি ভেঙে সম্ভব করেছি স্বাধীনতার সুবর্ণ সকাল।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন কবি আসাদ মান্নান ও হালিম আজাদ। আবৃত্তি করেন ইস্তেকবাল হোসেন এবং লায়লা তারান্নুম চৌধুরী কাকলী। সঙ্গীত পরিবেশন করেন তিমির নন্দী, শিবু রায়, রুমানা ইসলাম, আলম আরা মিনু ও শ্যামা সরকার।

আজকের আয়োজন :আজ রোববার গ্রন্থমেলার তৃতীয় দিন। মেলা চলবে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেলে গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে 'ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সুবর্ণজয়ন্তী' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ, আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।