অর্থমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি

সরকারি ব্যাংকের পর্ষদ খেলার জায়গা নয়

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০১৯

সমকাল প্রতিবেদক

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, যে যা-ই বলুক; দেশের সবচেয়ে দুর্বলতম জায়গা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ব্যাংকের প্রতি মানুষের যে আস্থা ছিল, এখন তা নেই। এখন থেকে ব্যাংকিং বিষয়ে যারা বোঝেন না, তাদেরকে আর সরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে বসতে দেওয়া হবে না। কেননা, ব্যাংকের পর্ষদ কোনো খেলার জায়গা নয়। যে কাউকে আর পরিচালক বানানো হবে না।

গতকাল রাষ্ট্রীয় মালিকানার জনতা ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এ সম্মেলনে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম।

ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর  পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৭ হাজার ২২৫ কোটি টাকা। এক সময়ে এ ব্যাংকে মূলধন উদ্বৃত্ত ছিল। এখন ঘাটতি ৫ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। গত বছর বিপুল অঙ্কের লোকসানসহ অধিকাংশ সূচকের অবনতি হয়েছে। এ দুরবস্থার জন্য ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও এননটেক্সের ঋণ দায়ী বলে জানান ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডি। তবে এ দুই প্রতিষ্ঠানের ঋণ আগের পরিচালনা পর্ষদের সময়ে সৃষ্টি বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকিং বিষয়ে যারা বোঝেন না, তাদেরকে আর সরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে বসতে দেওয়া হবে না। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীকে যতবার বলা দরকার, তিনি বলবেন। কেননা, এটা কোনো খেলার জায়গা নয়। না জেনে-বুঝে কেউ ব্যাংক চালাতে পারে না।

তিনি জানান, অর্থমন্ত্রী হওয়ার পর পরিচালক হওয়ার জন্য তার কাছে অনেকেই তদবির করেছেন। তবে ইতিমধ্যে যা হয়ে গেছে, আর হবে না। যে কাউকে আর পরিচালক বানানো হবে না। একজন একজন করে সাক্ষাৎকার নিয়ে, দেখে দেখে ব্যাংকের পর্ষদে পাঠানো হবে। গভর্নরও তার মতো ব্যবস্থা নেবেন বলে তিনি জানান।

অর্থমন্ত্রী বলেন, পরিচালনা পর্ষদে বা কর্মকর্তা পর্যায়ে অসাধু কাউকে রেখে এগোনো যাবে না। দু'চারটা ছাড়া অধিকাংশ ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে আর ফেরত দিতে পারছে না। অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে টেলিফোন করে কাউকে পাওয়া যায় না। এ পরিস্থিতি উন্নয়নের লক্ষ্যে দেশের সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পর্যায়ক্রমে বিশেষ নিরীক্ষা করে প্রকৃত অবস্থা দেখা হবে।

তিনি বলেন, একটি ব্যাংকের সবাই খারাপ না। দু'একজনের কারণে সবাইকে দায় নিতে হয়। অসাধু ব্যবসায়ীরা অসৎ উপায়ে টাকা বের করে নেওয়ার চেষ্টা করবে। ব্যাংকারের দায়িত্ব তা প্রতিহত করা। প্রতিহত না করে এদের যারা প্রশ্রয় দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেননা, একজন অসাধু অফিসার সব অর্জন ম্লান করে দিতে পারেন। ১০টি ভালো কাজ করলেও একটা খারাপ কাজের কাছে সব ঢেকে যায়। যিনি অন্যায় করেন, আর যিনি সাহায্য করেন, সবাই সমান অপরাধী। ফলে এদের চিহ্নিত করতে হবে। ব্যাংকারদের দুর্নীতি নিয়ে সম্প্রতি দুদকের একজন কমিশনার তার সঙ্গে দেখা করলে তিনি তাকে আশ্বস্ত করেছেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতায় সব প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স থাকবে।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, কর্মকর্তা বা ব্যবসায়ীদের জেলে ঢুকাতে বিশেষ অডিট করানো হবে; বিষয়টি তেমন নয়। মূলত আমানতকারীদের সুরক্ষার জন্য এটা করা হবে। ব্যাংকের টাকা ফেরত না দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে যারা খেলাপি হচ্ছেন, তাদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য নিরীক্ষা চালানো হবে। তবে কেউ অপরাধ করে গোপনে এসে ক্ষমা চাইলে তাকে সুরক্ষা দেওয়া হবে। এ জন্য তিনি যে টাকা নিয়ে গেছেন, তা ফেরত দিতে হবে।

তিনি বলেন, সব ব্যবসায়ী খারাপ না। পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে ব্যবসা করতে গিয়ে সমস্যায় পড়া প্রতিষ্ঠানের জন্য সাধ্য অনুযায়ী সরকার সহায়তা করবে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার জন্য তিনি এখানে আসেননি। কেননা, একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা অনেক কঠিন। ব্যাংকিং সেবার পরিধি বৃদ্ধির জন্য অটোমেশনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

গভর্নর ফজলে কবির বলেন, সব ধরনের নিয়ম মেনে ঋণ বিতরণ করতে হবে। জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ অনেক বেড়েছে। মূলধনে ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতির উন্নয়নে কাজ করতে হবে। বড় ঋণ বিতরণের চেয়ে এখন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণ বিতরণের ওপর জোর দিতে হবে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম বলেন, মানুষের আস্থার জায়গা এখনও ব্যাংক। চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে হবে। আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষায় পরিচালনা পর্ষদের সদস্যসহ সবাইকে কাজ করতে হবে।

ব্যাংকের চেয়ারম্যান লুনা সামসুদ্দোহা বলেন, ক্রিসেন্ট ও এননটেক্সের কারণে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ অনেক বেশি বেড়েছে। এই প্রতিষ্ঠান দুটির ঋণ দেওয়া হয়েছে অনেক আগে। খেলাপি ঋণ আদায় বাড়াতে কর্মকর্তাদের কাজ করার পরামর্শ দেন তিনি।

ব্যাংকের এমডি আব্দুছ ছালাম আজাদ বলেন, ক্রিসেন্ট ও এননটেক্স গ্রুপের কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে জনতা ব্যাংক। এ দুই গ্রুপ থেকে টাকা আদায়ে ব্যাংক চেষ্টা করে যাচ্ছে। এরই মধ্যে ক্রিসেন্টের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে মামলা করা হয়েছে।