নদীকৃত্য দিবস আজ

নদী রক্ষায় নারীর ভূমিকা উপেক্ষিত

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০১৯

বিশেষ প্রতিনিধি

নদী রক্ষায় নারীর ভূমিকা উপেক্ষিত

শিল্প প্রতিষ্ঠানের দূষিত বর্জ্য যাচ্ছে নদীতে -সমকাল

আজ বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে 'নদী সুরক্ষা ও ব্যবস্থাপনায় নারীর ভূমিকা'। বাংলাদেশে পরিবেশ আন্দোলন ও নারী আন্দোলনের কর্মীরা বলছেন, এর ফলে নদী রক্ষায় নারীর ভূমিকা নিয়ে নতুন আলোকপাত হবে। তবে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকার সার্বিক স্বীকৃতি যেখানে এখনও সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি, সেখানে নদী সুরক্ষায় নারীর ভূমিকার স্বীকৃতি আদায়ে হাঁটতে হবে আরও অনেকটা পথ।

দিবসটির প্রতিপাদ্য সম্পর্কে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সদস্য শারমীন মুরশিদ সমকালকে বলেন, নদী কমিশন আইন অনুযায়ী সদস্যদের মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তারা নীতিগত দিক থেকে সব পর্যায়ে ও কার্যক্রমে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, বেসরকারি পর্যায়েও নদী নিয়ে যখন কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়, তখন নারী ভূমিকা খুব কমই মনে রাখা হয়। নদী কমিশন আগামী দিনগুলোতে নদীনির্ভর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে। তখন নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে সজাগ থাকবে। তার মতে, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নদীবিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর ভূমিকা আরও বাড়াতে হবে।

এবার নদীকৃত্য দিবসের প্রতিপাদ্য স্বাগত জানিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও নারী আন্দোলনের নেত্রী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল সমকালকে বলেছেন, নারীর জীবনযাত্রার সঙ্গেই পানি ও প্রকৃতির সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি। পরিবারে সুপেয় ও গৃহস্থালি পানির জোগান ও ব্যবহার নারীকেই করতে হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের আদিবাসী নারীরা নদী ও পানির উৎস সুরক্ষিত রাখতে কঠোর পরিশ্রম করে যান। কিন্তু উৎপাদন কাঠামোর পরিচালনা যখন পুরুষের হাতে চলে গেছে, তখন থেকে নদীসহ পানির উৎসগুলো বিনষ্ট হতে শুরু হয়েছে। পানিসম্পদ সুরক্ষায় নারীকে তার মৌলিক ও অগ্রণী ভূমিকা ফিরিয়ে দিতে হবে। নদী রক্ষায় পুরুষের পাশাপাশি নারীকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, পারিবারিক পর্যায়ে নদীবিষয়ক সচেতনতা তৈরিতে নারী সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

নারী নেত্রী খুশী কবির সমকালের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, বাংলাদেশে নদী ও পানিসম্পদ সুরক্ষা ও ব্যবস্থাপনায় নারীর ভূমিকার স্বীকৃতি নেই বললেই চলে। কিন্তু নারীর জীবনের জন্য নদী ও পানি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নদীর জীবনের জন্যও নারীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, 'আমি গ্রামাঞ্চলে দেখেছি, নদী মরে যাওয়ায় সবচেয়ে দুর্ভোগ বেড়েছে নারীর। পরিবারের পানি ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে নদী ও পুকুরের সঙ্গে নারীর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। কিন্তু এখন একদিকে নদীগুলো মরে যাচ্ছে, অন্যদিকে পুকুরগুলো মাছ চাষের কারণে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।' তার মতে, ভূগর্ভস্থ পানি তোলা বাড়াতে যে আর্সেনিক দেখা দিচ্ছে, সেখানেও নারীই আগে ও সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়।

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা অক্সফাম ইন বাংলাদেশের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক ড. খালিদ হোসেন সমকালের কাছে স্বীকার করেন, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো নারী অধিকার নিয়ে অনেক দিন ধরে অনেক কাজ করলেও নদী সংরক্ষণে নারীর ভূমিকা নিয়ে আলাদা আলোকপাত খুব বেশি করেনি। এ-সংক্রান্ত গবেষণাও তার চোখ পড়েনি। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার চারটি দেশে চলমান 'ট্রোসা' প্রকল্পে তারা নদী ও মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে নারীর ভূমিকার ওপর জোর দিচ্ছেন বলে জানান তিনি। বিশেষত, ইলিশ সংরক্ষণের সময় পুরুষ জেলেদের আটক করার ফলে তার পরিবারের নারীর ওপর যে চাপ তৈরি হয়, সেটাকে তিনি মানবাধিকার ইস্যু বলেও মনে করেন। তিনি বলেন, নদীনির্ভর জনগোষ্ঠীর মধ্যে নারী নেতৃত্ব তৈরিতে এ প্রকল্পে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে।

নদীবিষয়ক নাগরিক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক নূসরাত খান বলেন, নদী আন্দোলনে আগে নারীর অংশগ্রহণ ছিল হাতে গোনা। তরুণ প্রজন্মের নদী কর্মীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা আশাব্যঞ্জকভাবে বাড়ছে। তারা সামনে এগিয়ে আসছে, নদীর অধিকার নিয়ে কথা বলছে। কিন্তু সেটা এখনও শহরকেন্দ্রিক। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে যেসব নদী আন্দোলন গড়ে উঠছে, সেখানে নারীর অংশগ্রহণ এখনও বিরল। তার মতে, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে নারীর ক্ষমতায়ন চিত্রের সঙ্গে বিষয়টি যুক্ত।

প্রসঙ্গত, নদীবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল রিভারসের উদ্যোগে ১৯৯৭ সালে বিশ্বের ২০টি দেশের নদীকর্মীরা এক সম্মেলনে মিলিত হন। বিভিন্ন দেশের নদীতে নির্মিত ড্যামের কারণে সৃষ্ট বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার জনগোষ্ঠীর ওই সম্মেলন থেকে ১৪ মার্চকে 'ইন্টারন্যাশনাল ডে অব অ্যাকশন ফর রিভারস' হিসেবে ঘোষণা আসে। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে দিবসটি পালন শুরু হয়েছিল। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), অঙ্গীকার বাংলাদেশ, রিভারাইন পিপলসহ কয়েকটি বেসরকারি সংগঠন ও সংস্থা এ দিবস পালন করে আসছে। রিভারাইন পিপল এই দিবসের বাংলা নাম দেয় 'আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস'।