সুদ পরিশোধে চাপ বাড়ছে

৬০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০১৯      

আবু কাওসার

বাজেটের বড় একটি অংশ ব্যয় হয় ঋণের সুদ পরিশোধে। এই ব্যয় ব্যাপকভাবে বাড়ছে। একক খাত হিসেবে বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দ থাকছে এই ঋণের সুদ পরিশোধে। মোট বাজেটের প্রায় ১৯ শতাংশ সুদ বাবদ ব্যয় করতে হচ্ছে। বাজেট ঘাটতি পূরণে প্রতি বছর সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বাড়ছে। দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেয় সরকার। পুঞ্জিভূত ঋণের বোঝায় চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে সরকারকে। এই ঋণের সুদ পরিশোধের কারণে চাপ বাড়ছে বাজেটে। সূত্র জানায়, আসন্ন ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে সুদ পরিশোধে মোট বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৫১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৪৯ হাজার কোটি টাকা। শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, ঋণের বোঝা ক্রমান্বয়ে বাড়ায় বিপুল অঙ্কের সুদ গুনতে হচ্ছে সরকারকে। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণে দুর্বলতার কারণে বাজেট ঘাটতি পূরণে বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে সরকারকে। স্থিতিশীল অর্থনীতির জন্য ঋণ সহনীয় মাত্রায় রাখার পরামর্শ দেন তারা।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, চলতি অর্থবছরের শেষদিকে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে হঠাৎ ঋণ গ্রহণ বেড়েছে। এর কারণ হচ্ছে রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতি এবং শেষ সময়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি ত্বরান্বিত হওয়া। ব্যাংক ব্যবস্থার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ঋণের আরেকটি উৎস সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকেও ঋণ নেওয়া বেড়ে গেছে। বাড়তি ঋণের ফলে সুদ পরিশোধে ব্যয় বাড়ছে। জানা যায়, চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ২৬ হাজার কোটি টাকা। অথচ মার্চ মাসের মধ্যেই নেওয়া হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে তা ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পর পর গত তিন অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ গ্রহণ ব্যাপক

বেড়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়ে মূল বাজেটে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, বছর শেষে তার তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি নেওয়া হয়। ফলে মূল বাজেটে সুদ বাবদ যে পরিমাণ বরাদ্দ রাখা হয়, সংশোধিত বাজেটে তা বেড়ে যায়। অন্যদিকে, বর্তমানে বিদেশি ঋণের পরিমাণও বাড়ছে। বিদেশি সহায়তা বৃদ্ধি পাওয়া দেশের জন্য মঙ্গল হলেও বেশি ঋণের কারণে সুদও গুনতে হয় বেশি। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, বিদেশি ঋণের সুদহার অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদহারের চেয়ে অনেক কম। তাছাড়া বিদেশি ঋণের বড় অংশ দেশের অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ হয়। এসব কারণে বিদেশি ঋণ-সহায়তা সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির জন্য ভালো।

ইআরডি সূত্রে জানা যায়, আগে বছরে ২ বিলিয়ন বা ২০০ কোটি ডলার বিদেশি ঋণ পাওয়া যেত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা অনেক বেড়েছে। গত অর্থবছরে ৩৫৬ কোটি ডলার ঋণ পাওয়া গেছে। চলতি অর্থবছরে আরও বেশি ঋণ পাওয়া যাবে বলে আশা করছে সরকার। মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি বাড়ায় বিদেশি সহায়তার ছাড় হচ্ছে দ্রুত। জানা যায়, আসন্ন ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটের সম্ভাব্য আকার হতে পারে ৫ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয় ৫ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ এবং বিদেশি উৎস থেকে এ ঘাটতি মেটানো হবে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ তথা ব্যাংক এবং সঞ্চয়পত্র উৎস থেকে ৩ শতাংশ, বাকি ২ শতাংশ বিদেশি ঋণ থেকে পূরণ করা হবে। জানা যায়, আগামী বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে সঞ্চয়পত্র থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা।

দেশে ১৯৭৪ সালে মাথাপিছু ঋণের বোঝা ছিল প্রায় ৭ ডলার। গত বছরের হিসাবে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬৬ ডলার। আলোচ্য সময়ে মাথাপিছু ঋণ বেড়েছে ৩০ গুণের বেশি। যদিও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও বেড়েছে বাংলাদেশের। কিন্তু ঋণের পরিমাণ এত বেশি বেড়েছে যে, এর বিপরীতে সুদ পরিশোধে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, উচ্চ প্রবৃদ্ধির জন্য দরকার প্রচুর বিনিয়োগ। এর জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে যে পরিমাণ অর্থ জোগান দেওয়ার প্রয়োজন, তার জোগান নিশ্চিত করতে পারছে না সরকার। সে জন্যই ঋণ নিতে বাধ্য হয়। তিনি মনে করেন, অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদহার বিদেশি ঋণের চেয়ে প্রায় ৩ গুণ বেশি। ফলে অভ্যন্তরীণ ঋণ ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে সরকারকে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের সাবেক গবেষণা পরিচালক, বর্তমানে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত মনে করেন, আমাদের নিজস্ব সম্পদ আহরণের সুযোগ কম। দাতাদের কাছ থেকে নমনীয় শর্তে ঋণ নিলে অর্থনীতির জন্য ভালো হবে। তবে বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত নীতিনির্ধারক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশের ঋণ প্রহণের সক্ষমতা রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী জিডিপির সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত সরকারের ঋণ গ্রহণের সুযোগ আছে। বর্তমানে আমরা নিচ্ছি জিডিপির ২০ শতাংশ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিদেশি ঋণের বিপরীতে প্রতি বছর গড়ে সুদ-আসলে ১৫০ কাটি ডলার থেকে ১৬০ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়। বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত ইআরডির উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, বিদেশি ঋণ তুলনামূলক সস্তা। বেশির ভাগ ঋণের সুদহার ১ শতাংশের নিচে এবং পরিশোধের সময় দীর্ঘ। তাই যত বেশি বিদেশি ঋণ পাওয়া যাবে, দেশের জন্য তত মঙ্গল হবে।