লন্ডনে একখণ্ড বাংলাদেশ

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০১৯      

সৈয়দ আনাস পাশা, লন্ডন

লন্ডনে একখণ্ড বাংলাদেশ

রোববার ওভাল স্টেডিয়ামে উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন বাংলাদেশি হাজারো দর্শক -সমকাল

'টু ডে অ্যাট দ্য ওভাল, ইটস দ্য ল্যান্ড অব দ্য টাইগার'- কথাটি বাংলাদেশি কোনো ক্রিকেটপ্রেমীর নয়, খোদ আইসিসির। আইসিসির ডিজিটাল ইনসাইডার নায়ল ও'ব্রায়ান ওভালের দর্শক গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে নিজের টাইগার মুখোশটি খুলেই মাইক্রোফোনে যে কথাটি উচ্চারণ করলেন তা হলো- 'টু ডে অ্যাট দ্য ওভাল, ইটস দ্য ল্যান্ড অব দ্য টাইগার'।

কথাটি কিন্তু মোটেই অতিরঞ্জিত নয়। রোববার ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপের সাউথ আফ্রিকা বনাম বাংলাদেশের সূচনা খেলাকে কেন্দ্র করে শুধু ওভাল নয়, লন্ডনের বিভিন্ন এলাকায়ও ছিল লাল-সবুজের ছড়াছড়ি। আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে শুরু করে দৃষ্টিসীমার মধ্যে সব জায়গায়ই জটলা ছিল টাইগারদের লাল-সবুজের জার্সি পরা বাংলাদেশি সমর্থকদের।

খেলা শুরুর আগে থেকেই ওভাল অভিমুখে শুরু হয় এই লাল-সবুজের মিছিল। রোববার ছুটির দিন হওয়ায় এই মিছিলে টাইগার সমর্থকদের সংখ্যাও ছিল বেশি। ছোট্ট শিশু থেকে শুরু করে কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী প্রৌঢ়, বৃদ্ধ সবার উপস্থিতি ছিল এসব মিছিলে।

যারা সরাসরি স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখতে পারেননি, তারা খেলার পুরো সময়টিই ছিলেন বাসায় টিভির সামনে। লন্ডনের যেসব এলাকায় রয়েছে বাংলাদেশিদের বসবাস, সেসব এলাকার বাসাবাড়িতে অবস্থানরত লোকজনও ক্ষণে ক্ষণে শুনেছেন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ রব। ওভালে যাওয়া হয়নি বলে কী হয়েছে- টিভি সেটের সামনে লাল-সবুজের জার্সি পরে মা, বাবা, ভাইবোন সবাই মিলেই তৈরি করেছিলেন একেকটি ওভাল। একেকটি বাংলাদেশ।

অনেকে দলবেঁধে বন্ধু-স্বজনের বাসায় বসে রমজানে উপভোগ করেছেন বাংলাদেশের খেলা। বাঙালিপাড়া হিসেবে খ্যাত লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস বারায়, বিশেষ করে পূর্ব লন্ডনে, অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বসে টিভিস্ট্ক্রিনে লাইভ খেলা উপভোগ করেছেন কাস্টমার ও ব্যবসায়ীরা।

ব্যস্ততম শহর লন্ডনে মুঠোফোনেই অনলাইনে অনেকে খেলা দেখেছেন। কাজের বাধ্যবাধকতা এবং সময় দুটোর মাঝখানে মুঠোফোনের স্ট্ক্রিনে প্রবাসীদের চোখ ও মন ছিল আটকে। ট্রেনে, বাসে, হেঁটে হেঁটে অথবা কাজের ফাঁকে রোববারের পুরো দিনটি ছিল ক্রিকেটময়। দর্শক গ্যালারি থেকে যখন আওয়াজ উঠছিল 'বাংলাদেশ বাংলাদেশ', তখন অবাঙালি দর্শকও এই আওয়াজে নিজেদের কণ্ঠ মিলিয়েছেন; বলেছেন, ওভাল তো অবশ্যই আজ বাংলাদেশের হোম গ্রাউন্ড।

টাইগারভক্তরা নিজ দেশের ব্যানার-ফেস্টুন, মুখে আলপনা আর বাংলাদেশের জার্সি গায়ে হাজির হন ওভালে। আর ওভাল স্টেডিয়ামের সামনে দেখা যায় এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। ইংল্যান্ডের মাটিতে বাংলাদেশের পতাকা বিক্রি করছেন অনেক ব্রিটিশ নাগরিক। শুধু পতাকা নয়, তাদের হাতে ছিল লাল-সবুজের মিশ্রণে বাংলাদেশের নামাঙ্কিত মাফলার। আর মাথায় ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ক্যাপ।

টাইগারদের হুঙ্কারে সাউথ আফ্রিকা যে ওভাল ছাড়ছে, খেলার শেষ দিকে প্রায় সব দর্শকই এটি নিশ্চিত হয়ে উঠেছিলেন। এরপরও টাইগারদের করা ৩৩০ রানের জবাবে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ৩০৯ রান করে হেরে যাওয়ার পর প্রায় ১৬ হাজার বাংলাদেশি দর্শকসহ পুরো দর্শক গ্যালারিই বিজয়ে উল্লসিত হয়ে ওঠে।

আসলে প্রবাসে থাকলে দেশকে যে কতটুকু অনুভব করা যায়, রোববার লন্ডনে তা দেখা গেছে। ওভাল ক্রিকেট গ্রাউন্ড যেন হয়ে উঠেছিল একখণ্ড বাংলাদেশ।

রোববারের খেলাকে কেন্দ্র করে আসলে ঈদের আগেই ঈদ আনন্দ উপভোগ করেছেন ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশিরা। বিশ্বকাপের শুরুতেই যে আনন্দের জোয়ারে ভাসছেন শিকড়-বিচ্ছিন্ন প্রবাসী এই মানুষগুলো, এটিই এবার তাদের ঈদ আনন্দ।