এটিএম বুথে জালিয়াতি

নেপথ্যে উত্তর কোরীয় 'হিডেনকোবরা'

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরিতেও জড়িত

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০১৯      

সাহাদাত হোসেন পরশ

নেপথ্যে উত্তর কোরীয় 'হিডেনকোবরা'

ঢাকায় গ্রেফতার বিদেশি ছয় নাগরিক - সংগৃহীত

এটিএম বুথে জালিয়াতিতে বিদেশি যে চক্র এবার জড়িত ছিল, তাদের নেপথ্যে ছিল উত্তর কোরিয়ার একটি হ্যাকার গ্রুপ; যারা বিশ্বব্যাপী 'হিডেনকোবরা' নামে পরিচিত। জালিয়াত চক্রের এ সদস্যরা প্রথমে টার্গেট করে ব্যাংকের বুথে ম্যালওয়ারের প্রবেশ ঘটায়। এতে ব্যাংকের কেন্দ্রীয় সার্ভার থেকে ভেরিফিকেশন বন্ধ হয়ে যায়। কোনো রেকর্ড ছাড়াই বিশেষায়িত কার্ড ব্যবহার করে টাকা তুলে নিতে সক্ষম হয় তখন তারা। যে প্রক্রিয়ায় তারা অর্থ তুলেছে, তাকে বলা হয় 'ফাস্টক্যাশ ক্যাম্পেইন'। এ ছাড়া যে গ্রুপ হ্যাকিং করে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছিল, একই চক্র এবার এটিএম বুথের জালিয়াতিতে জড়িত বলে তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির দায়িত্বশীল সূত্র থেকে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই সম্প্রতি জালিয়াত চক্রের ব্যাপারে আগাম সতর্ক করেছিল বাংলাদেশকে। ওই সতর্কবার্তা পাওয়ার পর সংশ্নিষ্ট ব্যাংককে অবহিত করা হয়। জালিয়াতি রোধে করণীয় নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বিস্তারিতভাবে বলা হয় তাদের। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে। তবে শেষ পর্যন্ত সিস্টেম হ্যাক করে এটিএম বুথ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা রোধ করা যায়নি।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, এবার যারা এটিএম বুথে জালিয়াতি করেছিল, তাদের কৌশল ছিল অভিনব। চক্রের সব সদস্যকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। সবাই ইউক্রেনের নাগরিক। ৩০ মে চক্রের সদস্যরা বাংলাদেশে আসে। এই চক্রের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার একটি হ্যাকার গ্রুপের সংশ্নিষ্টতা পাওয়া গেছে।

ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার সগীর আহমেদ বলেন, জালিয়াত চক্রের সদস্যরা কেন্দ্রীয় সিস্টেম থেকে বুথকে আলাদা করতে সক্ষম হয়। বুথের মেশিনকে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। তাই ওই বুথ থেকে টাকা উত্তোলনের তথ্য কেন্দ্রীয় সিস্টেমে পৌঁছাত না। দুটি বুথ থেকে তারা তিন লাখ টাকা নিতে পেরেছে। এটিএম বুথের মেশিন পরিচালনার দায়িত্বে যারা রয়েছে, তাদের সঙ্গে সোমবার বৈঠক হয়। এটিএম মেশিন আরও নিরাপদ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

সিআইডির দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে এটিএম বুথের সিস্টেম হ্যাক করে বাংলাদেশের অর্থ বিদেশি নাগরিকরা হাতিয়ে নিতে পারে- এমন গোয়েন্দা তথ্য ছিল এফবিআইর। এটা তারা জানানোর পর সিআইডির পক্ষ থেকে ২৯ মে ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংককে প্রাথমিকভাবে সতর্ক করা হয়। পরদিন সিআইডি ও ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সিস্টেম হ্যাক রোধে করণীয় নিয়ে বৈঠক করে। সেই বৈঠক থেকে বুথের সিস্টেম হ্যাক নিরাপত্তার ব্যাপারে তাদের অবহিত করা হয়। ১ জুন দুপুরে ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সিআইডিকে জানায়, ৩১ মে রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার সময় ব্যাংকটির এটিএম বুথ থেকে সংঘবদ্ধ জালিয়াত চক্রের দুই সদস্য অর্থ উত্তোলন করে নিয়ে গেছে। এ ব্যাপারে সিআইডির পরামর্শ চায় তারা। পরে সিআইডির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের সব বুথে পুনরায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়। নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্যে টুপি, মাস্ক পরিহিত বিদেশিদের ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে বলা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় সতর্কতা জারি করা হয় দেশের সব বুথে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১ জুন রাত পৌনে ৮টার দিকে খিলগাঁও থানাধীন তালতলা মার্কেটের বিপরীতে ডাচ্‌-বাংলা বুথে জালিয়াত চক্রের দুই সদস্য নিজেদের চেহারা আড়াল করতে মুখোশ ও টুপি পরিহিত অবস্থায় বুথে ঢোকে। সিকিউরিটি গার্ড জালাল তাদের গতিবিধি সন্দেহজনক বলে মনে করে। সন্দেহভাজন দু'জনকে ধরার চেষ্টা করলে তারাও পালাতে চায়। এরপর স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় দেনিস ভেতোমস্কি নামে এক বিদেশিকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়। খবর পেয়ে খিলগাঁও থানা পুলিশের একটি দল সেখানে যায়। তখন জানা যায়, দেনিস ইউক্রেনের নাগরিক। পরে থানা পুলিশ, ডিবি ও সিআইডির একটি যৌথ দল দেনিসকে নিয়ে পান্থপথের ওলিও ড্রিম হোটেলে অভিযান চালায়। সেখান থেকে গ্রেফতার করা হয় আরও পাঁচজনকে। তারা হলেন ভালোদিমির ত্রিশেনসকি, নাজারি ভজনোক, সের্গেই উকরাইনেতসআলেগ শেভচুক, আলেগ শেভচুক ও ভাটালি কিলিমচুক। তারাও ইউক্রেনের নাগরিক। তাদের কাছ থেকে ম্যাগনেটিক কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স, মোবাইল, ট্যাবসহ অন্যান্য আলামত উদ্ধার করা হয়।

গতকাল সোমবার গ্রেফতার ছয় বিদেশিকে আদালতে হাজির করে আট দিনের রিমান্ড আবেদন করে ডিবি। আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

তদন্তে জানা যায়, এই ছয় আসামি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক জালিয়াত চক্রের সদস্য। তারা অভিনব কৌশল অবলম্বন করে ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথের সিস্টেম হ্যাক করেন। ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা তোলার জন্য এই আসামিরা বাংলাদেশে এসেছেন। গত শনিবার সকালে বাড্ডার এটিএম বুথ থেকে তিন লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রের সদস্যরা।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, টাকা উত্তোলনের সময় মুখে মাস্ক পরিহিত অবস্থায় ছিল জালিয়াত চক্রের সদস্যরা। চোখে ছিল সানগ্লাস ও মাথায় টুপি। এদিকে অভিনব কৌশলে এটিএম বুথে জালিয়াতির ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ব্যাংকারদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এর আগে এটিএম থেকে যত অর্থ চুরি হয়েছে, প্রতিবার গ্রাহকের কার্ডের তথ্য চুরি করে ক্লোন কার্ড তৈরি করে জালিয়াত চক্র। এতে গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এবারের ঘটনায় পুরো এটিএম বুথের নিয়ন্ত্রণ নেয় জড়িত বিদেশিরা। এতে দেশের এটিএম সেবার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন বাস্তবতায় যে কোনো বিদেশি নাগরিক এটিএম বুথে ঢুকলে তার ওপর নজর রাখার পাশাপাশি সর্বোচ্চ সতর্ক (রেড অ্যালার্ট) থাকার জন্য এটিএম বুথের নিরাপত্তাকর্মীদের বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে ব্যাংকগুলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে সতর্কতা জারির পর ব্যাংকগুলো এ সিদ্ধান্ত নেয়। ছুটির দিনসহ ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রম সম্পন্নের পর রাতে কর্মকর্তাদের শাখা পরিদর্শন করার ব্যবস্থা করতে হবে। ছুটির দিনগুলোতে ব্যাংকের আইটি সিস্টেম, বিভিন্ন স্থাপনা, ভল্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে তদারকির ব্যবস্থা নিতে হবে।

জালিয়াতির মাধ্যমে এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলার অভিযোগে ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের ডেলিভারি চ্যানেলের হেড অব অলটারনেট মশিউর রহমান বাদী হয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে খিলগাঁও থানায় গত রোববার মামলা করেন। এজাহারে মশিউর বলেন, 'সংঘবদ্ধ জালিয়াত চক্রটি খিলগাঁও তালতলা মার্কেটের সামনের ডাচ্‌?-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথসহ আমাদের অন্যান্য বুথ থেকে ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে এটিএম বুথের টাকা উত্তোলন করছে।'