ট্যুর ডায়রি

জার্নি বাই ট্রেন

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০১৯      

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, কার্ডিফ থেকে

ছয়টা পঞ্চান্ন ট্রেন, হাঁফিয়ে হাঁফিয়ে পঞ্চান্নতেই পা। দরজা বন্ধ হতে পাঁচ সেকেন্ডও দেরি হলো না। চলছি কার্ডিফে, ব্রিস্টল থেকে। ইংল্যান্ড থেকে নতুন দেশ ওয়েলসে। দু'দিন হলো এভাবেই সকাল-বিকেল দুটি দেশ যাতায়াত করতে হচ্ছে। কার্ডিফে শেষ মুহূর্তে হোটেল বুকিং না হওয়ায় ব্রিস্টলেই ঘাঁটি গেড়েছি ঢাকা থেকে আসা আমরা ক'জন সাংবাদিক। এক ঘণ্টা রেলে চড়ে প্রতিদিন যাতায়াত করা- শুরুতে কেমন কেমন লাগলেও এখন মনে হচ্ছে সিদ্ধান্তটা মন্দ হয়নি। জানালার পাশে বসে ইংল্যান্ডের গ্রাম দেখতে দেখতে যাওয়া। আলু আর গমের ক্ষেত, গরু-ঘোড়ার খামার, সবুজ টিলা- এসব  তো আর শহুরে লন্ডনে দেখা মিলত না। লেখাটা এখন লিখছি সেই ট্রেনের জানালার পাশে ল্যাপটপ খুলে।

'এ জার্নি বাই ট্রেন' :এখন আসে কি-না জানি না, তবে একটা সময় ম্যাট্রিক পরীক্ষায় রচনাটি খুব আসত। যে বছর 'জার্নি বাই বোট' আসত তার পরেরবার 'জার্নি বাই ট্রেন' কমন পড়ার এক রকম গ্যারান্টিই দিতেন স্যাররা। দক্ষিণের ছেলে, নৌকাটা যত কাছের ছিল, ট্রেন ততটা নয়। পথের পাঁচালীর অপু-দুর্গার মতোই রেললাইন আর ট্রেন ছিল অবাক বিস্ময়ের কিছু। কিছু না বুঝেই তখন গাইডে লেখা রচনা মুখস্থ করতাম। পার্বতীপুর থেকে বাবা-মায়ের সঙ্গে ট্রেনযাত্রা, রেলের জানালার পাশে বসে গ্রামীণ জীবনের দৃশ্য, ফেরিওয়ালার হাঁক- মুখস্থবিদ্যায় কল্পনার ছাপ খুব গভীর ছিল না। কোনোমতে সেনটেন্স ঠিক থাকলেই পাস মার্কস থার্টি থ্রি!

আজ আর থার্টি থ্রির জন্য নয়, লেখার ইচ্ছা থেকে লেখা। ইংল্যান্ডে আসার পর একদিনে একটা জিনিস বেশ টের পেয়েছি। ইংরেজ বিদ্যাটা পেটে কম থাকলেও চলে; কিন্তু ঘটে রেল বিদ্যাটা না থাকলেই নয়। পাতাল দিয়ে লন্ডনকে জালের মতো ছেয়ে থাকা মেট্রো রেলের জ্যামিতিক ম্যাপটি আপনাকে জানতেই হবে। বুঝতে হবে পাতালের নিচে কোন তলা দিয়ে কোন ট্রেনটি দৌড়াদৌড়ি করছে, কখন কোন স্টেশনে নেমে কোন ট্রেনের পেটে যেতে হবে। আশপাশে কাউকে বলে-কয়ে আমার ট্রেনটি ধরে নেব- এমন ভাবলে ভুল হবে। টিউব রেলের এই জাল ছাড়ানোর জন্য হাঁটতে হাঁটতে দাড়িয়ে যাওয়া লোক এখানে মিলবে না। তাই নিজের গন্তব্য নিজেকেই জেনে নিয়ে আসল সময়ে সঠিক ট্রেন ধরতে হবে। প্রচণ্ড ব্যস্ত এই টিউব রেলগুলো- 'মাইন্ড দ্য গ্যাপ বিটুয়িন ট্রেন অ্যান্ড প্লাটফর্ম' এটুকু উপদেশ দেওয়া ছাড়া বাড়তি খাতির সে করে না। ইস্ট লন্ডনের বেকনট্রিতে সাত দিন থাকার কারণে টিউববিদ্যাটা খানিকটা শেখা হয়েছে।

কিন্তু ন্যাশনাল রেলের (আমাদের দেশের আন্তঃজেলার) মতো ট্রেনে উঠে ব্রিস্টল টু কার্ডিফ করতে করতে ঠিক মেলাতে পারছি না টিউবের সংস্কৃতিটা। এই ট্রেনে বাদুরঝোলা যাত্রী নেই, হোমলেস পিপলের ভিক্ষের জন্য হাতপাতা নেই- এই জার্নি বাই ট্রেন সত্যিকার অর্থেই জার্নি বাই ট্রেনের মতো। প্রতিদিন দুটো দেশে যাতায়াত করছি, অথচ সঙ্গে পাসপোর্ট রাখতে হচ্ছে না। ইমিগ্রেশনের বালাই নেই, চেকিং নেই। প্রায় এক ঘণ্টার যাত্রায় লন্ডনের কান্ট্রি সাইড দেখতে দেখতেই পার হয়ে যায়। তিন বগির এই ছোট্ট ট্রেনে অবশ্য ফ্রি কোনো খাবার দেওয়া হয় না, তেষ্টা পেলে সাড়ে তিন পাউন্ড দিয়ে একটা পানির বোতল নিয়ে নিতে হবে। তবে ওয়াইফাইয়ের পাসওয়ার্ডও একদম ফ্রি। এক দল বাংলাদেশি যাত্রীর কাছে এর চেয়ে লোভনীয় আর কিই বা হতে পারে। জার্নি বাই ট্রেন- তো আর এখন আর শুধুই সানগ্লাস চোখে জানালার ধারে বসে দৃশ্য দেখা নয়, জার্নি মানেই এখন ফেসবুক লাইভ আর ইউটিউব...। এসে গেছে কার্ডিফ সেন্ট্রাল স্টেশন, নামতে হবে এখন...। বাংলাদেশের ম্যাচ আজ ইংল্যান্ডের সঙ্গে।