পাইলটের কাণ্ড

শতকোটি টাকা খরচ করে প্রশিক্ষণের এই ফল!

ইমিগ্রেশন পুলিশের এসআই সাসপেন্ড

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০১৯      

আলতাব হোসেন

নিরাপত্তায় অবহেলা নিয়মিতই ধরা পড়ছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। এ থেকে বাদ যাচ্ছে না প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফ্লাইটও। প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে এর আগেও একাধিকবার সমস্যা পাওয়া গেছে। এটা কি অবহেলা নাকি ষড়যন্ত্র- উঠছে সেই প্রশ্ন। বিষয়টি তদন্তে নেমেছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা।

পাসপোর্ট ছাড়াই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাইলট ফজল মাহমুদ চৌধুরীর শাহজালাল বিমানবন্দর ত্যাগ করে কাতার পৌঁছানোর ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বেড়েছে তদন্তের গতি।

২০১৬ সালে নিরাপত্তায় অবহেলার অভিযোগে ঢাকা থেকে সরাসরি ফ্লাইট বন্ধ করে দিয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

তখন শাহজালাল বিমানবন্দরের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়াতে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ জন্য নিয়োগ দেওয়া হয় ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান রেডলাইনকে। তবে সেই প্রশিক্ষণ কোনো কাজে আসেনি। নিরাপত্তাকর্মীদের দক্ষতা বাড়েনি। এ নিয়ে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলছেন, বিমানের প্রভাবশালী পাইলট ও কেবিন ক্রুরা বিমানবন্দরের নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করেন না। এমনকি তারা শাহজালালকে স্বর্ণ পাচারের নিরাপদ রুট বানিয়েছেন।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিমানবন্দরে নিয়োজিত নিরাপত্তাকর্মী, ফ্লাইট সিডিউল অফিসার, পাইলট ফজল মাহমুদের ব্যক্তিগত প্রোফাইল ও সিভিল এভিয়েশনের একাধিক কর্মকর্তার বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছে। পাইলট ফজলের ঘটনায় ওইদিন বিমানবন্দরে দায়িত্বপ্রাপ্ত ইমিগ্রেশন পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর কামরুজ্জামানকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার একজন সদস্য জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ওই দিনের ভিডিও ফুটেজ জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় বিমানের এক পরিচালকের (ফ্লাইট অপারেশন) বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, তিনি প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটের পাইলট ও কেবিন ক্রুদের বিমানে ওঠার আগে সব ধরনের ক্লিয়ারেন্স নেননি।

ইমিগ্রেশন পুলিশের বিশেষ শাখার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, পাইলট ফজল মাহমুদের ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তদন্ত চলছে। খুব শিগগির তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে।

পাসপোর্ট ছাড়াই ক্যাপ্টেন ফজল মাহমুদের বিদেশ যাওয়ার ঘটনায় শাহজালাল বিমানবন্দরের নিরাপত্তা তল্লাশির মান নিয়েও ফের প্রশ্ন উঠেছে। দেশের প্রধান বিমানবন্দরে ঢিলেঢালা নিরাপত্তা নিয়ে এভিয়েশন বিশ্বে চলছে তোলপাড়। নিরাপত্তায় অবহেলার কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আবারও শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ফ্লাইট ও কার্গো চলাচল বন্ধ ঘোষণা করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, পাইলট ফজল মাহমুদের ঘটনায় বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এ ঘটনা প্রমাণ করে- বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ফের ঢেলে সাজানোর সময় এসেছে। অন্যথায় বড় অঘটন ঘটতে পারে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এনামুল হক চৌধুরী বলেন, 'শাহজালালে নিরাপত্তা দুর্বলতার কারণে স্বর্ণ চোরাচালানের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তাকর্মীদের কাজে মন নেই, তারা দুর্নীতিতে ব্যস্ত। স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনায় প্রায়ই বিমান ও সিভিল এভিয়েশনের কর্মীরা ধরা পড়ছে। নিরাপত্তাকর্মী ও ইমিগ্রেশন পুলিশের সদস্যরা প্রবাসী শ্রমিকদের নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করলেও পাচারকারীরা সম্মানের সঙ্গে অবৈধ মালপত্র নিয়ে বিমানবন্দর ত্যাগ করছেন। অবহেলার কারণে বিমানে মশা ও পাখি উঠে যাচ্ছে। পাখির ধাক্কায় বিমান জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হচ্ছে। বিমানবন্দরের সর্বত্র চলছে অবহেলা।' তিনি বলেন, নিরাপত্তা সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের এভিয়েশন সেক্টরের দুর্বলতা প্রকাশ পাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ইইউসহ কিছু দেশ আবারও বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ফ্লাইট চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে।

পাইলট ফজল মাহমুদের ঘটনা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, 'বিমানবন্দরে দুই-তিন জায়গায় তল্লাশি হয়। ইমিগ্রেশন পুলিশের উচিত ছিল পাসপোর্টটি দেখা। ইমিগ্রেশনে তিনি ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও জেনারেল ডিক্লারেশন (জিডি) দিয়েছেন। আমি বলব এটা প্রধানমন্ত্রীর বিমানের ফ্লাইট, তাই এই ভুলটা করা পাইলটের উচিত হয়নি। আমরা তদন্ত করছি।'

এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মহিবুল হক সমকালকে বলেন, ভিআইপি ফ্লাইটেও নিরাপত্তা অবহেলার অভিযোগ প্রায়ই পাওয়া যায়। প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটের পাইলটের ঘটনাটি ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার গাফিলতি, না এর পেছনে অন্যকিছু ছিল তা বের করতেই তদন্ত চলছে।

পাইলট ফজল মাহমুদকে কাতারের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ আটক করার পর তিনি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ক্যাপ্টেন ফারহাত হাসান জামিলকে অবহিত করেন। এমডি বিষয়টি গোপন রেখে সৌদি আরবের দাম্মাম সফরে যান। অভিযোগ আছে, এমডির কয়েকজন ঘনিষ্ঠ পাইলট বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা মেনে চলেন না। তারা ক্ষমতার দাপট দেখান। এতে বিমানের ফ্লাইট পরিচালনা বিভাগে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে।

বিমান ভ্রমণে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা, শাহজালাল বিমানবন্দরের নিরাপত্তা তল্লাশি ও ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের দক্ষতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন উঠছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও বিমানের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার পরও নিরাপত্তায় অবহেলার জন্য দায়ী কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে নিরাপত্তায় অবহেলার ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এর আগেও পাসপোর্ট ছাড়া লন্ডন যান বিমানের এক পাইলট। ওই ঘটনায় পাইলটের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপত্তার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনায় বিশ্ব একটি খারাপ বার্তা পেল। দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। এখানে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিও বাড়াতে হবে। বিমানের অব্যবস্থাপনায় এমন ঘটনা ঘটছে। পাসপোর্ট না নিয়ে বিদেশ যাওয়া একটি অপরাধ। একজন সিনিয়র পাইলট বিষয়টি জানেন না, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। ঘটনার আড়ালে কী রয়েছে, তা তদন্ত করে প্রকাশ করা উচিত।