বিদ্যুতে উন্নয়ন বরাদ্দ বাড়ছে কমছে জ্বালানি খাতে

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০১৯      

হাসনাইন ইমতিয়াজ

আগামী অর্থবছরের (২০১৯-২০) জাতীয় বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মোট বরাদ্দ বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিভাগের এডিপি বরাদ্দ চলতি অর্থবছরের চেয়ে বাড়ছে। কমছে জ্বালানি খাতে। আগামী ১৩ জুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জাতীয় সংসদে এ বাজেট পেশ করবেন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। সূত্র জানিয়েছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরের এডিপিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির জন্য ২৯ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা রাখা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের (২০১৮-১৯) সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি) এর পরিমাণ হলো ২৯ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা।

আগামী বাজেটের এডিপিতে বিদ্যুৎ খাতের জন্য দুই হাজার ১৮০ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ বেশি রাখা হচ্ছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিদ্যুতের জন্য উন্নয়ন বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ২৬ হাজার ১৭ কোটি ১৩ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের আরএডিপিতে বরাদ্দ রয়েছে ২৩ হাজার ৮৩৮ কোটি ৪২ লাখ টাকা। জ্বালানিতে আগামী বছরের জন্য এডিপি বরাদ্দ রাখা হচ্ছে তিন হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে যার পরিমাণ পাঁচ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ জ্বালানিতে উন্নয়ন বরাদ্দ কমছে।

চলতি বছর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদ্যুৎ বিভাগ খানিকটা এগিয়ে রয়েছে। গত এপ্রিল পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভাগ ৬৯ দশমিক ২৪ শতাংশ এডিপি বরাদ্দ ব্যয় করেছে। জ্বালানি বিভাগের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৫০.৫২ শতাংশ। বাজেট বাস্তবায়নে পিছিয়ে থাকার কারণ জানতে চাইলে এক কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনের বছর হওয়ায় বাজেট বাস্তবায়নের হার কম।

বিদ্যুতে উন্নয়ন বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন :বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে এডিপিতে বিদ্যুৎ বিভাগের সরকারি সহায়তা (জিওবি) খাতে চাহিদা ছিল ২১ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। এর বিপরীতে পাওয়া গেছে ১৪ হাজার ৯৩৭ কোটি টাকা। চাহিদার তুলনায় ৬ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা কম। যদিও আগামী বাজেটে বিদ্যুতে উন্নয়ন বরাদ্দ যা দেওয়া হচ্ছে তা চলতি বছরের তুলনায় দুই হাজার ১৮০ কোটি টাকা বেশি।

চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ বিভাগের ১৭ প্রকল্পে আরএডিপিতে মোট বরাদ্দ ২৩ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা। গত এপ্রিল পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১৬ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। আরএডিপিতে জিওবি খাতে বরাদ্দ রয়েছে ১৩ হাজার ৮২২ কোটি টাকা। এপ্রিল পর্যন্ত খরচ হয়েছে ৯ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা (৬৯.৭৩ শতাংশ)। বিদেশি ঋণ সহায়তা খাতে বরাদ্দ রয়েছে ১০ হাজার ১৪ কোটি টাকা। প্রথম ১০ মাসে ব্যয় হয়েছে ছয় হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা (৬৮.৫৫ শতাংশ)। আরএডিপির তালিকায় থাকা বিদ্যুৎ বিভাগের ১৭টি প্রকল্প চলতি অর্থবছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তিনটি প্রকল্প সমাপ্ত হবে না বলে জানা গেছে। এগুলো হলো- ৪০০ মেগাওয়াটের বিবিয়ানা-৩ বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) চট্টগ্রাম-সিলেট বিভাগের সম্প্রসারণ কার্যক্রম-২ ও ঢাকা বিভাগের সম্প্রসারণ কার্যক্রম-২। এর মধ্যে বিবিয়ানা-৩ প্রকল্পটি কয়েক বছর ধরে ঝুলে আছে। এই তিন প্রকল্পের জন্য আগামী অর্থবছরে ২১০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ চাওয়া হলেও পরিকল্পনা কমিশন সরকারি সহায়তা খাতে এক লাখ টাকা করে তিন লাখ টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করেছে। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, এই তিনটি প্রকল্প শেষ করতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ প্রয়োজন। আরইবির প্রকল্প দুটির মেয়াদ বৃদ্ধিসহ সংশোধন প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বিবিয়ানা-৩ প্রকল্পের সংশোধন প্রস্তাব শিগগির পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে।

আগামী বাজেটের অনুমোদিত প্রকল্প বিশ্নেষণ করে দেখা যায়, উৎপাদনের চেয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বেশি বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। এর আগের বাজেটগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছিল।

জ্বালানির উন্নয়ন বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন হার :সূত্র জানায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে জ্বালানি বিভাগের এডিপিতে জিওবি এবং বৈদেশিক ঋণের আটটি প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের (জিএসবি) একটি করে এবং পেট্রোবাংলার ছয়টি প্রকল্পের বিপরীতে এক হাজার ৬৩৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। এর মধ্যে সরকারি সহায়তা ৮৭৪ কোটি টাকা এবং বিদেশি ঋণ ৭৬২ কোটি টাকা। এ ছাড়া ২০১৯-২০ অর্থবছরে এডিপিতে এ বিভাগের আওতায় ছয়টি নতুন অননুমোদিত প্রকল্পে ২৭৯.১৩ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। সব মিলিয়ে আগামী অর্থবছরে জিওবি ও বিদেশি ঋণ খাতে মোট এক হাজার ৯১৫.৮৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। নতুন ছয় প্রকল্পের মধ্যে পেট্রোবাংলার তিনটি, বিপিসির দুটি এবং বিস্ম্ফোরক অধিদপ্তরের একটি প্রকল্প রয়েছে।

২০১৯-২০ অর্থবছরে জ্বালানি বিভাগের সংস্থাগুলো নিজস্ব অর্থায়নে ১৩টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। এর জন্য এক হাজার ৪০২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। এর মধ্যে পেট্র্র্রোবাংলার সাতটি এবং বিপিসির ছয়টি প্রকল্প রয়েছে। এ ছাড়া গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের (জিডিএফ) আট প্রকল্পে ৩৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।

জ্বালানি বিভাগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪৩ প্রকল্পে আরএডিপিতে মোট বরাদ্দ পাঁচ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা। গত এপ্রিল পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে দুই হাজার ৮৯৮ কোটি টাকা (৫০.৫২ শতাংশ)। বাস্তবায়ন হারের মধ্যে জিওবি ও বিদেশি ঋণের প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন হার বেশ ভালো, ৭৬.০৩ শতাংশ। অগ্রগতি কম হয়েছে নিজস্ব অর্থায়নের এবং গ্যাস উন্নয়ন তহবিলভুক্ত প্রকল্পগুলোতে। এগুলো বরাদ্দের মাত্র এক-তৃতীয়াংশের মতো খরচ করেছে।

চলতি অর্থবছরে জিওবি ও বিদেশি ঋণের ১১ প্রকল্পের জন্য আরএডিপিতে বরাদ্দ রয়েছে দুই হাজার ২০৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে জিওবি খাতে ৮৯১ কোটি টাকা এবং বিদেশি ঋণ এক হাজার ৩১৭ কোটি টাকা। জিওবি ও বিদেশি ঋণের প্রকল্পগুলো গত এপ্রিল পর্যন্ত খরচ করেছে এক হাজার ৬৭৯.৫৪ কোটি টাকা (৭৬.০৩ শতাংশ)।

জ্বালানি বিভাগের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ২২ প্রকল্পে বরাদ্দ রয়েছে তিন হাজার ৫৯ কোটি টাকা। এপ্রিল পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় এক হাজার ৭১ কোটি টাকা, যা বরাদ্দের মাত্র ৩৫ শতাংশ। গ্যাস উন্নয়ন তহবিল থেকে ১০ প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ রাখা হয় ৪৬৯.১৭ কোটি টাকা। অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে খরচ হয়েছে ১৪৮ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের মাত্র ৩১.৫৮ শতাংশ।