যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাবাস

রিভিউ শুনানি শেষ, রায় যে কোনো দিন

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

'যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাবাস' অর্থাৎ স্বাভাবিক মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে জেলে থাকতে হবে- একটি হত্যা মামলায় এমন পর্যবেক্ষণ দিয়ে আপিল বিভাগের দেওয়া রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে এক আসামির করা আবেদনের শুনানি শেষ হয়েছে। যে কোনো দিন এ বিষয়ে রায় ঘোষণা করা হবে। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ গতকাল বৃহস্পতিবার শুনানি শেষে বিষয়টি যে কোনো দিন রায় ঘোষণার (সিএভি) জন্য রাখেন।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিৎ দেবনাথ। আসামির রিভিউ আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন ও ব্যারিস্টার শিশির মনির।

যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাবাস- একটি হত্যা মামলায় এমন পর্যবেক্ষণ দিয়ে ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি রায় দেন আপিল বিভাগ। পরে ওই বছরের ৫ নভেম্বর রায় রিভিউ চেয়ে আসামি পক্ষে আবেদন করা হয়। এরপর আলোচিত এই মামলায় আইনগত ব্যাখ্যা দিতে গত ১১ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের চারজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি (মতামত প্রদানকারী আদালতের বন্ধু) হিসেবে নিয়োগ দেন আপিল বিভাগ। তারা হলেন- ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ, এএফ হাসান আরিফ, আবদুর রেজাক খান ও মুনসুরুল হক চৌধুরী।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা ভারত, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যাবজ্জীবন সংক্রান্ত আইনগত বিধান তুলে ধরেন। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন আদালতে বলেন, দেশের কারাগারগুলোতে পাঁচ হাজার ৫৩৭ জন যাবজ্জীবন কারাদ প্রাপ্ত আসামি রয়েছেন। যারা যাবজ্জীবন মানে কত বছর- এ-সংক্রান্ত রায় রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। কারণ ওই আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়ায় তারা ও তাদের পরিবার বুঝতে পারছেন না, কত দিন তাদের কারাগারে কাটাতে হবে। এ জন্য রিভিউ আবেদনটি দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।

মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০০১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ব্যবসায়ী জামান ইয়াসিনকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ওই হত্যার ঘটনায় জামানের বাবা মো. সিরাজুল ইসলাম সাভার থানায় পরদিন একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, চারবাগ মাদ্রাসার সামনে জামানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আসামি আনোয়ার, আতাউর মৃধা ও কামরুল তাদের হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে পূর্বপরিকল্পনামাফিক এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে। এ মামলায় ২০০৩ সালের ১৫ অক্টোবর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪-এর বিচারক মো. জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা তিন আসামিকে মৃত্যুদ দিয়ে রায় দেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে আসামি আতাউর ও আনোয়ার। পলাতক থাকায় আপিল করার সুযোগ পায়নি কামরুল। ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শেষে ২০০৭ সালের ৩০ অক্টোবর আপিল খারিজ করে দিয়ে তিন আসামির মৃত্যুদ বহাল রাখেন হাইকোর্ট। পরে হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে আতাউর ও আনোয়ার। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ দুই আসামির মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় দেন। পরে ওই বছরের ২৪ এপ্রিল পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়। রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, একজন অপরাধীকে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়াটা একটি বিধান (রুল) এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া একটা ব্যতিক্রম। বিশেষ ক্ষেত্রে আদালত মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন দণ্ড দিতে পারেন। দণ্ডবিধির ৫৩ ধারার সঙ্গে ৪৫ ধারা মিলিয়ে পড়লে দেখা যায়, যাবজ্জীবন অর্থ আমৃত্যু কারাবাস। আপিল বিভাগ বা হাইকোর্ট বিভাগ যদি কোনো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন এবং বন্দিকে তার স্বাভাবিক মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে থাকার আদেশ দেন, তবে এ ধরনের মামলা রেয়াত সুবিধার আবেদনের বাইরে থাকবে।