হাওরে সড়কের সর্বনাশ

যোগাযোগ দুর্ভোগে অর্ধকোটি মানুষ

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০১৯

সমকাল ডেস্ক

টানা বৃষ্টি ও বানের পানি সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন হাওরের গ্রামীণ সড়কের সর্বনাশ ডেকে এনেছে। এতে যোগাযোগ দুর্ভোগে পড়েছেন হাওর অধ্যুষিত পাঁচ জেলার মানুষ। অনেক স্থানেই সড়কের ওপর দিয়ে চলছে নৌকা। কোথাও কোথাও সড়কে 'না নৌকা, না তর', অর্থাৎ নৌকাও চলছে না, হেঁটেও চলাচল করা যাচ্ছে না। এদিকে অব্যাহত মুষলধারে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদনদী- সুরমা, কুশিয়ারা, মনু, ধলাই, সুতাং ও মগড়া। গতকাল সোমবার সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার বিভিন্ন উপজেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কয়েকটি স্থানে দেখা দিয়েছে ভাঙন। মৌলভীবাজারে কুশিয়ারা নদীর তীররক্ষা বাঁধের একটি অংশ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। এতে হুমকিতে রয়েছে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের একটি অংশ। পাহাড়ি ঢলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া স্থলবন্দরের রাস্তা তলিয়ে গিয়ে বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

সমকালের ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

সুনামগঞ্জ :বানের তোড়ে জেলার বিভিন্ন উপজেলার গ্রামীণ সড়কের ৫১ স্থান ভেসে গেছে। যেখানে পানি ওঠেনি, টানা বৃষ্টিতে সেসব অংশেও মারাত্মক খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় যোগাযোগ দুর্ভোগে পড়েছেন ১১ উপজেলার প্রায় ২৫ লাখ মানুষ। দোয়ারা-ছাতক সড়কের একটি অংশ সুরমা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম জানান, ভারি বর্ষণ এবং সড়কের ওপরে পানি ওঠায় ১৫০ কিলোমিটার সড়কে খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। পানির নিচে ডুবে আছে ৩০ কিলোমিটার সড়ক।

ছাতক প্রতিনিধি জানান, উপজেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। সুরমা, চেলা ও পিয়াইন নদীতে পানি এখনও বিপদসীমার ২৫ থেকে ৪৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে উপজেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। পানিবন্দি মানুষ বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে পড়েছেন। এখন পর্যন্ত বন্যাকবলিত মানুষের জন্য কোনো আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়নি। তবে দুর্গত কিছু এলাকায় সরকারিভাবে চাল বিতরণের খবর পাওয়া গেছে।

সিলেট :দক্ষিণ সুরমা উপজেলার বেশ কিছু এলাকায় নতুন করে পানি ঢুকেছে। উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের রাস্তাঘাট, হাটবাজার, বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও পানি ঢুকে পড়েছে। এতে  পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন লাখো মানুষ। গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, গোলাপগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, জকিগঞ্জের নিম্নাঞ্চলের লোকজন কয়েক দিন ধরেই দুর্ভোগে আছেন। এসব এলাকায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। তবে গ্রামীণ রাস্তাঘাট নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন বানভাসি মানুষ।

ওসমানীনগর প্রতিনিধি জানান, কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় উপজেলার আট ইউনিয়নের কয়েক হাজার পরিবারের বসতবাড়ি তলিয়ে গেছে। পানিতে তলিয়ে গেছে অসংখ্য রাস্তাঘাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এরই মধ্যে ২৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে। কুশিয়ারা ডাইকের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় বাঁধটি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা করেছেন এলাকাবাসী।

মৌলভীবাজার :সদর উপজেলার হামরকোনায় কুশিয়ারা নদীর তীর রক্ষা বাঁধের একটি অংশ ভেঙে প্রবল বেগে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। এতে এই এলাকার চারটি গ্রামের পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। জেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রণেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী বলেন, হামরকোনা অংশের বাঁধ পাউবোর না হলেও এটি মেরামতে তারা যথাসাথ্য চেষ্টা করছেন।

এদিকে, পানিতে ঘরবাড়ি নিমজ্জিত হওয়া হামরকোনা, ব্রাহ্মণগ্রাম, দাউদপুরের মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যাচ্ছেন না। অনেকে বসবাস করছেন সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের পাশে।

হামরকোনা গ্রামের মহসিন মিয়া বলেন, তিন দিন ধরে পানিতে ভাসছে ঘরবাড়ি। দু'দিনে চারশ' প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে বলে শুনেছি। এ ছাড়া ত্রাণ বিতরণের কোনো খবর পাইনি।

কমলগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, রোববার বিকেলে উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের হকতিয়ারখোলা ও রহিমপুর ইউনিয়নের বিষ্ণুপুর গ্রামে ধলাই নদী প্রতিরক্ষা বাঁধে নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙন দিয়ে পানি প্রবেশ করে পৌরসভা, রহিমপুর, আদমপুর, পতনঊষার, মুন্সীবাজার, শমশেরনগর ও সদর ইউনিয়নের ১১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া পাহাড়ি ঢলে আরও অন্তত ৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। গ্রামীণ সড়ক ভেঙে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বন্যার্তদের এরই মধ্যে শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউএনও আশেকুল হক।

নেত্রকোনা :জেলার ১০ উপজেলার মধ্যে সাতটি বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত বিভিন্ন নদীর পানি বেড়েছে। নতুন করে জেলা সদরের কে. গাতী, ঠাকুরাকোনা, আটপাড়া উপজেলার শুনই, লুনেশ্বর ও সুখারী ইউনিয়নের রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা কলমাকান্দা, দুর্গাপুর ও বারহাট্টা উপজেলায়। এর মধ্যে কলমাকান্দার সঙ্গে জেলা সদরের সড়ক যোগাযোগ এখনও বিচ্ছিন্ন রয়েছে। পানিবন্দি মানুষ গরু-ছাগলসহ গৃহপালিত প্রাণী নিয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ওবায়দুল্লাহ জানান, জেলায় ২৭৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

মদন প্রতিনিধি জানান, মগড়া নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় মদন উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে শতাধিক পরিবার পানিন্দি রয়েছে। গতকাল সরেজমিনে বালালী, বাঘমারা, হাসনপুর, বিয়াশি, দেওসহিলা, মাঘান গোবিন্দশ্রীরসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, রাস্তা তলিয়ে যাওয়ায় পানিবন্দি মানুষ অমানবিক জীবনযাপন করছেন।

চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ) :সুতাং নদীর পানি বেড়ে পাইকপাড়া ইউনিয়নের হলদিউড়া ইবতেদায়ি মাদ্রাসা থেকে আবদুল্লাহপুর প্রাইমারি স্কুলের রাস্তায় বাঁশগাজী কবরস্থানের অনেক অংশ নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এতে আশপাশের কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আরও ভাঙার আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন স্থানীয়রা।

উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল কাদির লস্কর জানান, এ সমস্যা থেকে রেহাই পেতে হলে সুতাং নদীর ঝুঁকিপূর্ণ স্থান ও পয়েন্টগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে গাইডওয়াল নির্মাণ এবং মাটি ভরাট করতে হবে। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।