বিশ্বকাপ ক্রিকেট

স্বপ্নভঙ্গের বাড়ি ফেরা

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০১৯

সৈয়দ আনাস পাশা, লন্ডন

স্বপ্ন দেখতেও সাহস লাগে। এবারের বিশ্বকাপ খেলায় শুরু থেকেই সমর্থকদের এই স্বপ্ন দেখার সাহস জুগিয়েছেন টাইগাররা। এই স্বপ্ন মাঝে মাঝে ঝাপসা হয়েছে, কিন্তু পুরোপুরি ভেঙে যায়নি মঙ্গলবারের ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ খেলার আগ পর্যন্ত। বরং আফগানিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজসহ কোনো কোনো খেলায় এই স্বপ্নের রঙ আরও দ্যুতি ছড়িয়েছে। কিন্তু সর্বশেষ ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ খেলায় টাইগার সমর্থকদের স্বপ্ন শুধু হোঁচট নয়, ভেঙে খান খান হয়ে গেছে।

সর্বশেষ দুটো খেলা বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া এবং বাংলাদেশ-পাকিস্তান নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন লাল-সবুজের টাইগার সমর্থকরা। এ দুটো খেলায় জিততে পারলে সেমিফাইনালের হাতছানি ছিল বাংলাদেশের সামনে। শেষ পর্যন্ত এটি হয়নি, স্বপ্নভঙ্গের কষ্ট নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন তারা।

বার্মিংহামের এজবাস্টন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে হারলেও বাংলাদেশের বিশ্বকাপ মিশন শেষ হয়নি এখনও। পাকিস্তানের বিপক্ষে আরও একটি ম্যাচ বাকি। তবে সেমিফাইনালে খেলার যে হাতছানি সামনে ছিল, ছিল স্বপ্ন, চুরমার হয়ে গেছে ভেঙে। তামিমের ক্যাচ মিসের চড়া মূল্য দিতে হয়েছে বাংলাদেশকে।

বিশ্বকাপে এবার টাইগার সমর্থকদের নিখাদ দেশপ্রেম প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ববাসী। মাশরাফি বাহিনী ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের যে ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ম্যাচ খেলেছে, সেখানেই সমস্ত আবেগ, উচ্ছ্বাস নিয়ে উপচে পড়েছে ব্রিটেন প্রবাসী বাঙালিরা। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, এমনকি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া থেকেও প্রবাসী বাঙালিরা ছুটে এসেছেন তাদের প্রিয় বাংলাদেশ দলকে সমর্থন দিতে। আর বাংলাদেশের টাইগারভক্তরা তো আছেনই। লাখ টাকা খরচ করে ব্রিটেনে ছুটে এসেছেন প্রিয় দলকে সমর্থন দেওয়ার জন্য।

পরশু বার্মিংহামের ম্যাচেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। সাড়ে ২৪ হাজার আসনবিশিষ্ট এজবাস্টন ক্রিকেট গ্যালারিতে শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন তারা। গ্যালারি ভারতীয়দের দখলে থাকলেও সংখ্যালঘিষ্ট সমর্থক গ্রুপ সেখানেও গলা ফাটিয়ে উৎসাহ দিয়েছে টাইগারদের।

বাংলাদেশকে নিয়ে ভারত যে কম আতঙ্কে ছিল না, এজবাস্টনে ভারত সমর্থকদের প্রস্তুতিপূর্ণ উপস্থিতিই প্রমাণ দেয় তার। তাদের পরিকল্পিত উচ্ছ্বাস, হৈ-হুলেল্গাড়ের কাছে টাইগার সমর্থকদের কণ্ঠ ছিল ম্লান। এরপরও মুস্তাফিজ যখন একে একে ভারতের পাঁচ উইকেট কেড়ে নিলেন, তখন ভারতীয়দের গলা কিছুক্ষণের জন্য হলেও স্তিমিত হয়ে যায়, টাইগার সমর্থকদের উচ্চকণ্ঠ প্রতিধ্বনি তোলে এজবাস্টনের আকাশে। কিন্তু এর পরও শেষ রক্ষা হয়নি। বাংলাদেশের টপঅর্ডার ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায় এই প্রতিধ্বনি কিছুক্ষণের মধ্যেই মিলিয়ে যায়।

বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে ব্রিটেনের বিভিন্ন শহর থেকে লাল-সবুজ সমর্থকরা উপস্থিত হয়েছিলেন এজবাস্টনে। কেউ কেউ নিজ উদ্যোগে কোচভর্তি সমর্থক নিয়ে মিছিল সহকারে উচ্ছ্বসিত মন নিয়ে ঢুকেছিলেন এজবাস্টন ক্রিকেট গ্যালারিতে, কিন্তু বেরিয়ে গেছেন ভাঙা মন নিয়ে।

বিশ্বকাপ শুরুর এক বছর আগেই নিজের স্ত্রী ও তার জন্য বাংলাদেশের ৯টি খেলার টিকিট কিনে রেখেছিলেন সত্যবাণীর উপদেষ্টা সম্পাদক, মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক, ক্রিকেটবোদ্ধা আবু মুসা হাসান। জয়-পরাজয় নির্বিশেষে বিগত প্রতিটি খেলার পরই তিনি চেহারায় আনন্দের দ্যুতি নিয়ে বের হয়েছেন স্টেডিয়াম থেকে। ব্রিটেনের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে খ্যাতিমান ক্রিকেট বিশ্লেষক হিসেবে পরিচিত জনাব হাসান প্রতিটি খেলার পরই প্রশংসা করেছেন টাইগারদের, আশাবাদের কথা শুনিয়ে বলেছেন. 'ইন্ডিয়া ও পাকিস্তানের সঙ্গে জিতলেই আমাদের বিশ্বকাপ পাওয়া হয়ে যাবে। আমি আশাবাদী, আমাদের ছেলেরা তা পারবে।'

মঙ্গলবার এজবাস্টন থেকে এই আবু মুসা হাসানও বেরিয়ে গেছেন বিধ্বস্ত মন নিয়ে। জিজ্ঞেস করলাম, 'এবারও কি আশাবাদের কথা শোনাবেন?' বললেন, 'সব আশায় গুড়েবালি ঢেলে দিয়েছে আমাদের টপঅর্ডার ব্যাটসম্যানরা। তামিম, সৌম্য, মুশফিক, লিটনের কাছে এমন খেলা আশা করিনি আমরা।' তিনি আরো বলেন, ক্রিকেটে একটি কথা আছে- ক্যাচ ইজ ম্যাচ। সেই ক্যাচটাই যখন মিস করল তামিমের মতো পেল্গয়ার, তখনই বুঝে গেছি কপালে আজ দুঃখ আছে।' আবু মুসা হাসান বলেন, 'সেমির সুযোগ হাতছাড়া হলেও সমর্থকদের ভাঙা মন জোড়া লাগাতে ৫ জুলাইয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে টাইগারদের বিজয়ের কোনো বিকল্প নেই। সেই বিজয় দেখার অপেক্ষায়ই আছি এখন।'

৩০ জুন লন্ডনে ছিল বৈশাখী মেলা। দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে বাঙালির সর্ববৃহৎ এই মিলনমেলায় হাজারো দর্শকের মন মাতিয়েছেন ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া এই প্রজন্মের হার্টথ্রব আরবান রাইজিং স্টারখ্যাত শিল্পী নিশ। মঞ্চে উঠেছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের সাকিবের ৭৫ নম্বর জার্সি পরে। গানের ফঁাঁকে মঞ্চ থেকে উন্মাতাল দর্শককে তিনিও শুনিয়েছিলেন টাইগারদের ক্রিকেট সেমিফাইনালে যাওয়ার স্বপ্নের কথা। ভক্তদের বলেছিলেন, 'আমাদের ক্রিকেটসূর্য সাকিব বাংলাদেশ টিমকে নিয়ে হাঁটছেন সেমির পথে, তাদের সফলতার জন্য প্রার্থনা করুন।' ভারতের সঙ্গে হারার পর সেই নিশেরও মনে ভেঙেছে। তিনি বললেন, 'ক্রিকেট হলো বহির্বিশ্বে জন্ম ও বেড়ে ওঠা আমাদের প্রজন্মের অবলম্বন। সব নেতিবাচক খবর চাপা দিয়ে বাংলাদেশকে উজ্জ্বলভাবে আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরে এই ক্রিকেট।'

টাইগারদের আগামী গন্তব্য যেখানে হওয়ার কথা ছিল ম্যানচেস্টার বা বার্মিংহাম, ভারতের সঙ্গে হারার পর গন্তব্য এখন হিথরো বিমানবন্দর। তারপরও টাইগার সমর্থকরা আশায় বুক বাঁধছেন, স্বপ্ন দেখছেন- এবার হলো না; তবে অন্য একদিন, অন্য কোনো আসরে।