শ্রীপুরে কারখানায় আগুনে নিহত ৬

'আমি এহন কারে লইয়া থাকুম'

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০১৯

ইজাজ আহমেদ মিলন, গাজীপুর

'আমি এহন কারে লইয়া থাকুম'

গাজীপুরের শ্রীপুরে স্পিনিং কারখানায় আগুনে নিহত সুজন সরদারের শিশুকন্যাকে কোলে নিয়ে স্ত্রী হালিমার আহাজারি- সমকাল

'আমি এহন কারে লাইয়া থাকুম! তোমরা আমার সুজনরে আইন্যা দেও। ওর মুখটা একবার দেখাও। সুজন, আমারে তোমার সঙ্গে লইয়া যাও, আমি তোমার লগে যামু।' গাজীপুরের শ্রীপুরের অটো স্পিনিং কারখানায় মঙ্গলবারের ভয়াবহ আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া সুজন সরদারের স্ত্রী হালিমা খাতুন ৯ মাসের শিশুকন্যাকে কোলে নিয়ে এভাবেই বিলাপ করছিলেন। তার কান্নায় ছলছল করছিল আশপাশের মানুষের চোখও। শুধু সুজনই নন, এ আগুনে পুড়ে প্রাণ হারান আরও ৫ জন। পোড়া কারখানার ধ্বংসস্তূপ থেকে গতকাল বুধবার সকালে সুজন সরদার ছাড়াও সেলিম কবীর, আবির রায়হান, শাহ জালাল, আনোয়ার হুসাইনের বীভৎস মরদেহ বের করে আনেন ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। আরেক নিহত কারখানার নিরাপত্তাকর্মী রাসেল আহমেদের লাশ মঙ্গলবারই উদ্ধার করা হয়।

গাজীপুর জেলা প্রশাসক এস এম তরিকুল ইসলাম জানান, এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহীনুর ইসলামকে প্রধান করে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। অন্য সদস্যরা হলেন- পরিচালক, শিল্প পুলিশ গাজীপুরের প্রতিনিধি, জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, গাজীপুরের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক এবং গাজীপুর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক। আগামী ৭ কর্ম দিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে নগদ ২৫ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়েছে। কারখানার জিএম হারুন অর রশীদ বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই কারখানার মালিক আবদুল ওয়াদুদ সিদ্দিকী ঘটনাস্থলে পৌঁছেন। মিলের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে ১০ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার দুপুরে কারখানার দক্ষিণ দিকের একটি তুলার গুদামে আগুন লাগে। দুপুর আড়াইটার দিকে সেই আগুন পুরো কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিট বিরতিহীনভাবে কাজ করে রাত আড়াইটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। ততক্ষণে কারখানার প্রায় পুরো অংশই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। গতকাল সন্ধ্যায়ও কারখানার ধ্বংসস্তূপ থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়।

সারিবদ্ধভাবে রাখা মৃতদেহগুলোকে ঘিরেই চলছিল স্বজনদের গগনবিদারী আর্তনাদ। তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষাও হারিয়ে ফেলেছেন উপস্থিত মানুষেরা।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে অটো স্পিনিং কারখানায় মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটার দিকে তুলার গোডাউনে আগুন লাগে।

কালিয়াকৈরের ভান্নারা এলাকার সখিনা আক্তার হারিয়েছেন তার স্বামী সেলিম কবীরকে। কারখানায় উৎপাদন সহকারী হিসেবে তিনি কর্মরত ছিলেন। তার সাবিদ হাসান ও সাজিদ হাসান নামে দুই ছেলে আছে। সখিনা আক্তার বলেন, 'আমি এখন এই দুই শিশুপুত্রকে নিয়ে কোথায় যাব? দুই ছেলেকে নিয়ে সেলিম কবীরের অনেক বড় স্বপ্ন ছিল। প্রতিদিন ৯ বছরের সাবিদকে নিয়ে ও স্কুলে যেত।'

পাবনার নান্দিয়ারা গ্রামের কেরামত সরদারের ছেলে সুজন সরদার এসি প্লান্টে কর্মরত ছিলেন। স্ত্রী ও ৯ মাসের শিশুকন্যা সিনহা আক্তারকে নিয়ে নয়নপুর এলাকাতেই থাকতেন সুজন। তার স্ত্রী হালিমা আক্তার বলেন, 'কিছুদিন পরই ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সুজন আমারে ফাঁকি দিয়া একাই চলে গেল।' এ কথা বলেই তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

শ্রীপুর উপজেলার ধনুয়া নতুন বাজার এলাকার হাসেন আলীর ছেলে নিহত আনোয়ার হুসাইন। তার ভাই আয়নাল হুসাইন বলেন, 'আমার ভাইডা ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত। তাবলিগ জামাতে যেত মাঝে মধ্যে। কিন্তু ওর কপালে এই লেখা আছিল? ওরে আমি একটু বেশিই আদর করতাম। হঠাৎ কইরা ও এভাবে চইল্যা গেলো।'

২২ বছরের তরুণ শাহ জালাল। বিয়ের কাবিনও হয়েছে তার। কোরবানি ঈদের পর আনুষ্ঠানিকভাবে বউ বাড়িতে আনার কথা ছিল। ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডে পরিবারের সব স্বপ্ন পুড়ে গেছে।

অগ্নিকাণ্ডের সময় কারখানার উত্তর দিকে দরজার সামনে দায়িত্ব পালন করছিলেন নিরাপত্তাকর্মী রাসেল আহমেদ। আটকাপড়া শ্রমিকদের রক্ষার জন্য কারখানার ভেতরে এগিয়ে যান তিনি। আগুনের শিখা তখন ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করে। ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে কারখানার ভেতরেই লুটিয়ে পড়েন রাসেল। পরে দগ্ধ হয়ে মারা যান তিনি।

এ ছাড়া মারা গেছেন এসি প্লান্ট সেকশনে কর্মরত আবির রায়হান। তিনি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার ভুবনকুড়া গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে।

শ্রীপুর থানার ওসি মো. লিয়াকত আলী বলেন, ৬টি মরদেহের মধ্যে মঙ্গলবার রাতেই নিরাপত্তাকর্মী রাসেলে আহমেদের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। গাজীপুরে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে সেলিম কবীর, সুজন সরদার, শাহ জালাল ও আবির রায়হানের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।