বদলে যাচ্ছে নিঝুম দ্বীপ

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০১৯

আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম

বদলে যাচ্ছে নিঝুম দ্বীপ

নিঝুম দ্বীপে পর্যটকদের জন্য তৈরি হবে এ রকম আধুনিক কটেজ = নকশার ছবি

অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি নিঝুম দ্বীপে হাজার হাজার চিত্রা হরিণের পাল এবং ৩৫ প্রজাতির পাখি দেখে মুগ্ধ হন যে কোনো পর্যটক। সেই সঙ্গে দ্বীপের দক্ষিণে বৃত্তাকারে প্রায় ১২ কিলোমিটারজুড়ে থাকা বিশাল সি বিচের স্বচ্ছ জলরাশিতে চাইলে গা ভেজাতে পারেন পর্যটকরা। মনোরম পরিবেশে অবলোকন করতে পারেন বঙ্গোপসাগরের বুকে চোখজুড়ানো সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত। এছাড়া দ্বীপের মাঝে থাকা আঁকাবাঁকা ছোট ছোট খালে নৌকা ভ্রমণের আনন্দ অন্যমাত্রা দেয় পর্যটকদের।

অন্যদিকে সাগরের তরতাজা ইলিশ ও হরেক রকমের সামুদ্রিক মাছের স্বাদ নেন দ্বীপ ঘুরতে যাওয়া যে কেউ। কিন্তু এত সব আনন্দ-বিনোদনের মধ্যে পর্যটকদের পথের কাঁটা হয়ে ওঠে অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা ও যাত্রী যাপনের জন্য উন্নত কোনো হোটেল, মোটেল ও কটেজ না থাকায়। এবার পর্যটকদের সেই চাহিদার ষোলকলা পূর্ণ করতে নিঝুম ও হাতিয়ায় বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন (বিপিসি) হাতে নিয়েছে অর্ধশত কোটি টাকার আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প। যেখানে পর্যটন মোটেল-হোটেল, আধুনিক কটেজ, রেস্তোরাঁ, ওয়াচ টাওয়ার থেকে শুরু করে পর্যটকদের দ্বীপে আনা নেওয়ার জন্য পর্যটন করপোরেশন সাগরে ভাসাবে পর্যটকবাহী দুটি ক্রুজ ভেসেলও।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ডেপুটি ম্যানেজার (পরিকল্পনা) শিপ্রা দে বলেন, নিঝুম দ্বীপ ও হাতিয়া দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে দুটি প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমরা চেষ্টায় আছি খুব দ্রুত ভূমি অধিগ্রহণ করে প্রকল্পের কাজ শুরু করার। ২০২০ সালের মধ্যেই আমরা নিঝুম দ্বীপ ও হাতিয়ায়

দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সেবা দেওয়া শুরু করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

চট্টগ্রাম পর্যটন মোটেলের ডেপুটি ম্যানেজার সাইফুর রহমান বলেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলের পর্যটন শিল্পের বিকাশে বিপিসি একগুচ্ছ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে নিঝুম দ্বীপ অন্যতম।

প্রায় ৯২ বর্গমাইল আয়তনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার নিঝুম দ্বীপ হাতিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে ৯০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। ১১টি চরের ৪০ হাজার ৩৯০ একর ভূমি নিয়ে প্রাকৃতিক রূপে ভরে ওঠা দ্বীপের নাম 'নিঝুম দ্বীপ'। এক সময় ৪০ হাজার চিত্রা হরিণ থাকলেও পাচারের কারণে এ সংখ্যা দিন দিন কমছে। নিঝুম দ্বীপের গহিন অরণ্যে রয়েছে প্রায় সাত প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৩৫ প্রজাতির পাখি, ১৬ প্রজাতির সাপ, ২১ প্রজাতির বনজসম্পদ, ৪৩ প্রজাতির লতাগুল্ম, ৮৩ প্রজাতির গুল্ম এবং ২১ প্রজাতির অন্যান্য গাছসহ সবুজে সবুজে সমারোহে বঙ্গোপসাগরের বুকে এক টুকরো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হয়ে উঠেছে এই প্রাকৃতিক দ্বীপ। যার রূপ দেখতে প্রতি বছরই দেশি-বিদেশি পর্যটকরা ভ্রমণ করেন এই দ্বীপ। তাই এ দ্বীপকে বিশ্বজগতে পর্যটকদের সামনে তুলে ধরতে চায় পর্যটন করপোরেশন। দ্বীপ ভ্রমণে যাওয়া পর্যটকদের সকল ধরনের উন্নত ও মানসম্মত সুযোগ-সুবিধা দিতে প্রতিষ্ঠানটি হাতে নিয়েছে একগুচ্ছ কার্যক্রম।

করপোরেশন সূত্রে জানায়, ৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নোয়াখালীর হাতিয়া ও নিঝুম দ্বীপে দুটি পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয় বিপিসি। ২০১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর প্রকল্পটি অনুমোদন পাওয়ার পর এটি এখন চলমান রয়েছে। ২০২০ সালে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হবে। প্রকল্পের মধ্যে নিঝুম দ্বীপে পর্যটকদের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত ১৬টি কটেজ, ১৬ শয্যার ডরমিটরি, ৯২ আসনের রেস্তোরাঁ, একটি এম্ম্ফি থিয়েটার, একটি মালটি পারপাস হল, একটি পিকনিক শেড, একটি ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করবে করপোরেশন। এ ছাড়া পর্যটকদের নোয়াখালী থেকে দ্বীপে আনা-নেওয়ার জন্য ২টি ক্রুজ ভেসেলও সাগরে নামাবে পর্যটন করপোরেশন।

অন্যদিকে হাতিয়ায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত ১৫টি কটেজ, ৬৪ শয্যার ইয়ুথ বিল্ডিং, ১২৮ আসনের রেস্তোরাঁ, একটি মালটি পারপাস হল, একটি পিকনিক শেড, একটি ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করবে বিপিসি। নিঝুম দ্বীপে ও হাতিয়ার দুটি জায়গার ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এ কাজ শেষ হলেও অবকাঠামোগত উন্নয়ন পুরোদমে শুরু হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিঝুম দ্বীপে চলাচলের জন্য পাকা সড়ক রয়েছে হাতেগোনা মাত্র দুটি সড়ক। তারও অবস্থাও খারাপ। সুপেয় পানির জন্য এই দ্বীপে নেই কোনো সুব্যবস্থা। আর প্রাকৃতিক বন পাহারা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত প্রহরী নেই। এখন দ্বীপে ভ্রমণে যাওয়া পর্যটকদের জন্য বেসরকারি দুটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে দুটি আবাসন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। রয়েছে দুটি সাধারণ হোটেল। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। নিঝুম দ্বীপে নামার বাজার এলাকার নিঝুম রিসোর্টের পরিচালক শিবলু আজম কোরাইশী জানান, বেশ কিছুদিন ধরে নিঝুম দ্বীপে কোনো পর্যটক নেই। পর্যটক আকর্ষণের জন্য নিঝুম দ্বীপে অনেক কিছু থাকলেও নেই কোনো নিরাপত্তা। যোগাযোগ ব্যবস্থার চিত্রও করুণ। তাই আগ্রহ থাকলেও অনেকে দ্বীপে আসার সাহস করেন না। সরকারকে সুনজর দেওয়া প্রয়োজন।