দুর্ঘটনা রোধে রেলের টনিক কেবল 'গতি নিয়ন্ত্রণ'

গুরুত্বপূর্ণ রুটের অনেক পয়েন্টকে 'ডেড স্পট' ঘোষণা

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০১৯     আপডেট: ০৫ জুলাই ২০১৯

তৌফিকুল ইসলাম বাবর, চট্টগ্রাম

দুর্ঘটনা রোধে রেলের টনিক কেবল 'গতি নিয়ন্ত্রণ'

ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলরুটের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ও কুমিরার মাঝামাঝি স্থানে ৪৬ নম্বর সেতুর কাছে এলেই ট্রেনের গতি ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটারে নামিয়ে আনতে হয়। দুর্ঘটনা এড়াতে সেতুটিতে কাঠের ঠেস দিয়ে রাখা হয়েছে - সেকান্দার হোসাইন

গতি বাড়ালেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ছে ট্রেন। অনেক স্থানে রেললাইন ও সেতুর দুরবস্থার কারণে নির্ধারিত গতিতে ট্রেন চালানো যাচ্ছে না। ফলে কেবল গতি নিয়ন্ত্রণ করেই ট্রেনের দুর্ঘটনা রোধের চেষ্টা করছে রেলওয়ে। কোনো কোনো স্থানে ট্রেনের গতি ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত নামিয়ে আনা হয়েছে। তারপরও দুর্ঘটনা রোধ করা যাচ্ছে না। স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হওয়ায় অতিরিক্ত সময় লেগে যাচ্ছে ট্রেন চলাচলে। নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছতে পারছেন না যাত্রীরা।

দুর্ঘটনা এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন রেলরুটের বেশ কয়েকটা ব্রিজকে 'ডেড স্টপ' ঘোষণা করেছে রেলওয়ে। এ ধরনের ব্রিজ পার হওয়ার আগে ট্রেনের গতি একেবারে নিচে নামিয়ে আনা হয়। অনেক রেললাইনের বেশকিছু অংশকেও অলিখিতভাবে 'ডেড স্পট' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, রেলের ব্রিজগুলোর অবস্থা ভালো নয়। অনেক ব্রিজের মেয়াদ বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে। এসব ব্রিজ দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ট্রেন চলাচল করছে। আবার ট্র্যাকেরও (রেললাইন) অবস্থা নাজুক। জোড়াতালি দিয়ে এসব ব্রিজ ও ট্র্যাকে ট্রেন চলাচল অব্যাহত রাখা হয়েছে। গতি নিয়ন্ত্রণ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও এভাবে বেশিদিন চলবে না। দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেতে হলে ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজগুলো ভেঙে পুনঃনির্মাণ করতে হবে। ট্র্যাকে পর্যাপ্ত পাথর ও স্লিপার বসিয়ে ট্রেন চলাচলে ঝুঁকি কমাতে হবে।

সর্বশেষ গত ২৫ জুন গতি নিয়ন্ত্রণের আদেশ জারির বিবরণ করে রেলওয়ে। এতে দেখা যায়, বিভিন্ন সময় পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগের আটটি সেকশনের ১৮টি পয়েন্টে গতি কমিয়ে আনা হয়। পুরনো নড়বড়ে ব্রিজ ও দুর্বল ট্র্যাকে (রেললাইন) চলতে গিয়ে যাতে দুর্ঘটনায় পড়তে না হয়, সে জন্যই মূলত গতি নিয়ন্ত্রণ করে দেওয়া হয়েছে। সেকশনগুলো হলো- চট্টগ্রাম বিভাগের আওতাধীন চট্টগ্রাম-আখাউড়া সেকশন; ঢাকা বিভাগের আওতাধীন ঢাকা-আখাউড়া সেকশন, আখাউড়া-সিলেট সেকশন, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সেকশন, ভৈরব বাজার-ময়মনসিংহ সেকশন, টঙ্গী-ময়মনসিংহ সেকশন, জামালপুর-বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব সেকশন ও জামালাপুর-দেওয়ানগঞ্জ বাজার সেকশন।

দুর্ঘটনা রোধে ট্রেনের গতি নিয়ন্ত্রণে জারি করা আদেশ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, রেলের আখাউড়া-সিলেট সেকশনের কুলাউড়া বরমচালে আন্তঃনগর ট্রেন উপবন দুর্ঘটনায় পড়ার পর এখানে ট্রেনের গতি ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটারে নামিয়ে আনা হয়। ২৩ জুন দুর্ঘটনা ঘটে এবং পরদিন ২৪ জুন থেকে এখানে গতি কমিয়ে আনা হয়। এতে এই পয়েন্টটি পার হতে অতিরিক্ত ৫ মিনিট সময় লাগে। অভিযোগ উঠেছে- নির্ধারিত গতির চেয়ে অতিরিক্ত গতিতে ট্রেন চালানোর কারণে রেললাইন থেকে উল্টে পড়ে বগিগুলো। একই সেকশনের ভাটেরা বাজার-মাইজগাঁও রুটের ৩৪৭ নম্বর ব্রিজের কারণে পয়েন্টটি পার হতে ঘণ্টায় ১০ কিলোমিটার সময় বেঁধে দেওয়া হয়। ১৩ জুন থেকে এই নির্দেশনা কার্যকর করা হয়েছে। এতে পয়েন্টটি পার হতে অতিরিক্ত ৫ মিনিট সময় লেগে যায়। এই সেকশনের আরও দুটি পয়েন্টে গতি কমিয়ে আনায় পুরো সেকশনটি পার হতে একটি ট্রেনের অতিরিক্ত সময় লাগে ১৪ মিনিট।

একইভাবে চট্টগ্রাম-আখাউড়া সেকশনের ভাটিয়ারী-কুমিরার মাঝখানে অবস্থিত ৪৬ নম্বর ব্রিজের কারণে গত ২৪ মার্চ থেকে ট্রেনের আপ-ডাউন ট্রিপের গতি ঘণ্টায় ৫ মিনিটে নামিয়ে আনায় এখানেও অতিরিক্ত ৫ মিনিট সময় লাগছে। গতি কমিয়ে আনা হয়েছে এখানকার আরও দুটি পয়েন্টে। ফলে সেকশনটি পার হতে ট্রেনের আপ-ডাউন ট্রিপে ৭ মিনিট করে ১৪ মিনিট অতিরিক্ত সময় লাগবে। জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জ বাজার সেকশনের মোহনগঞ্জ-দেওয়ানবাজার রুটের ৪৩৫ নম্বর ব্রিজ পার হতে হচ্ছে ঘণ্টায় ১০ কিলোমিটার গতিতে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজটি ও তৎসংলগ্ন এলাকাটি পার হতে লাগছে অতিরিক্ত ৫ মিনিট।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সেতু প্রকৌশলী মো. আবরার হোসেন বলেন, 'ঢালাওভাবে রেলের ব্রিজগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ বলা যাবে না। কিছু সেতু দুর্বল হয়ে পড়েছে। নিয়মিতভাবে এগুলো মেরামতও করা হচ্ছে। সব ব্রিজের মেরামত কাজ যদি একসঙ্গে শুরু করা হয়, তাহলে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে তুলনামূলক নাজুক ব্রিজগুলো মেরামত করা হচ্ছে। পুরনো হলেও রেলের বেশিরভাগ ব্রিজই এখনও বেশ শক্ত-পোক্ত। শুধু ব্রিজের কারণে ট্রেনের গতি কমানো হয় না। ট্র্যাকের সমস্যাসহ নানা কারণে এটা করা হয়।' এক প্রশ্নের জবাবে সেতু প্রকৌশলী আবরার বলেন, 'কুলাউড়ার বরমচালে যে দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেটা শুধু সেতুর কারণে হয়নি। অন্য কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।'

রেলওয়ের ২০১৫-১৬ সালের এক তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট ও চট্টগ্রাম-সিলেট রুটে ছোট-বড় ২৩৩টি সেতুর অবস্থা নাজুক। এর মধ্যে ৮৫টি বড় সেতু ঝুঁকিপূর্ণ। এসব রুটে ১৪৮টি ছোট ছোট সেতু রয়েছে, যেগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। তবে বড় আকৃতির ব্রিজ নিয়ে দুশ্চিন্তা বেশি।

শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট ও চট্টগ্রাম-সিলেট রুটেই নয়; ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজ রয়েছে অন্যান্য রেল রুটেও। ২০১৫ সালের ১৯ জুন চট্টগ্রাম-দোহাজারী রুটের বোয়ালখালী অংশে একটি ঝুঁকিপূর্ণ রেল সেতু ধসে তেলবাহী ট্রেনের তিনটি ওয়াগন খালে পড়ে যায়। ২০০৫ সালে সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হলেও সংস্কার করা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত মাশুল দিতে হয়। নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে রেলওয়ের সেতু বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রেলের যেসব ব্রিজের অবস্থা ভালো নয়, সেগুলো নিয়মিত সংস্কার করে ট্রেন চালানোর উপযোগী রাখা হচ্ছে। তবে যেগুলোর অবস্থা বেশি খারাপ, সেগুলো পারাপারে ট্রেনের গতিসীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ডেড স্টপ হলে ট্রেন থামিয়ে পরে ঘণ্টায় ৫ থেকে ১০ কিলোমিটার এবং অন্য ব্রিজগুলোতে অবস্থাভেদে ট্রেনের গতি ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটারে নামিয়ে আনা হয়।