ছাতক সিমেন্ট কারখানার অর্থ আত্মসাৎ

সাবেক ৩ এমডিসহ সাত কর্মকর্তা ফাঁসছেন

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০১৯

শাহ্‌ মো. আখতারুজ্জামান ছাতক (সুনামগঞ্জ)

জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় রাষ্ট্রায়ত্ত ছাতক সিমেন্ট কারখানার সাবেক তিন এমডিসহ সাত কর্মকর্তা ফেঁসে যাচ্ছেন। তাদের কাছ থেকে আত্মসাৎ করা পৌনে তিন কোটি টাকা আদায়ে পদক্ষেপ নিয়েছে কারখানার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। বেতন-ভাতা ও পেনশনের অর্থ থেকে এ টাকা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে বিসিআইসি। গত সপ্তাহে সংস্থার চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত আদেশে ওই কর্মকর্তাদের অভিযুক্ত করে সংশ্নিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

ভুয়া ক্রেডিট ভাউচার ও ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে এক ডিলারকে আড়াই কোটি টাকার সিমেন্ট দিয়েছিলেন এসব কর্মকর্তা। পরে সেই টাকা আর আদায় হয়নি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কারখানার ডিলার হিসেবে বেশ কয়েক বছর যাবত ব্যবসা করছেন রুবেল মিয়া। মেসার্স সম্পা অ্যান্ড সন্স এবং হানিফ এন্টারপ্রাইজ নামের প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী রুবেল ২০১৭ সালের ২ নভেম্বর থেকে ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত পূবালী ব্যাংক ছাতক শাখার কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল করে আটটি ভুয়া ক্রেডিট ভাউচারের মাধ্যমে কোম্পানি সংশ্নিষ্ট শাখায় জমা দেন। ওই ক্রেডিট ভাউচারের বিপরীতে তিনি ৯২ লাখ ৫০ হাজার টাকার সিমেন্ট উত্তোলন করেন। পরবর্তী সময়ে ফ্যাক্টরির ব্যাংক অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্টে অর্থের হিসাবে গরমিল ধরা পড়ে। এ ছাড়া রুবেল মিয়া রূপালী ব্যাংকের রাজধানীর কাপ্তান বাজার শাখার সাবেক ম্যানেজার মাসুদুর রহমান ও কর্মকর্তা বিকাশ দত্তের যোগসাজশে ২ কোটি টাকার ভুয়া ব্যাংক গ্যারান্টি সনদ জমা দিয়ে ১ কোটি ৬০ লাখ ৯৫ হাজার টাকার সিমেন্ট উত্তোলন করেন।

অর্থ জালিয়াতির ব্যাপারে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ছাতক সিমেন্ট কারখানা থেকে বিসিআইসি বোর্ড চেয়ারম্যান বরাবর লিখিতভাবে জানানো হয়। গত বছরের জানুয়ারিতে সংস্থার বোর্ড সভায় অর্থ আত্মসাৎ ও জালিয়াতির বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়। ওই সভায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব ও বিসিআইসি প্রধান কার্যালয়ের দু'জন কর্মকর্তা সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর অর্থ জালিয়াতির বিষয়ে গত বছরের জুলাইয়ে সাবেক এমডিসহ সাত কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। অভিযুক্তরা হলেন- সাবেক তিন এমডি আবু সাইদ, কাজী মো. রুহুল অমিন, নেপাল কৃষ্ণ হালদার এবং কারখানার কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম, আব্দুল বারী, আতিকুল হক ও রেজাউল আলম। অভিযুক্তদের নোটিসের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সেই কমিটি বিধি মোতাবেক চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি চূড়ান্ত কারণ দর্শানোর নোটিস দেয়। গত ১৪ জানুয়ারি অভিযুক্তরা নোটিসের জবাব দেন। সেই জবাবেও অভিযোগ থেকে তাদের অব্যাহতির কোনো সুযোগ নেই বলে বিসিআইসির এক আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত সপ্তাহে বিসিআইসি চেয়ারম্যান হাইয়ুল কাইয়ুম স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়, ছাতক সিমেন্ট কারখানার হিসাব বিভাগের কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম ভুয়া ক্রেডিট অ্যাডভাইজের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। এ কারণে বাকিতে বিক্রি ১ কোটি ৭ লাখ ২৯ হাজার সিমেন্ট বিক্রির জন্য তিনি দায়ী। ডিলার থেকে এই টাকা আদায়ে ব্যর্থ হলে তার চাকরির পাওনা প্রদান বন্ধ এবং পেনশনের টাকা পরিশোধের ওপর স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে।

চেয়ারম্যানের পৃথক আদেশে ১ কোটি ৬০ লাখ ৯৫ হাজার টাকা সিমেন্ট বাকিতে বিক্রির জন্য সাবেক এমডি আবু সাইদ, কাজী মো. রুহুল অমিন, নেপাল কৃষ্ণ হালদার এবং কর্মকর্তা আব্দুল বারীকে দায়ী করা হয়েছে। ডিলার থেকে এই টাকা আদায় না হলে তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ৩২ লাখ ১৯ হাজার টাকা করে আদায় করার জন্য চাকরি থেকে তাদের পাওনাদি প্রদান বন্ধ ও পেনশনের টাকা পরিশোধে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়।

এ ছাড়া সংস্থার অপর এক আদেশে বলা হয়েছে, ভুয়া ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির বিষয়ে ঠিকাদারের সঙ্গে সংশ্নিষ্টতার জন্য কারখানার হিসাব বিভাগের কর্মকর্তা আতিকুল হক ও রেজাউল আলম দায়ী। ডিলারের কাছ থেকে আদায়ে ব্যর্থ হলে তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে একই পদ্ধতিতে ৫ লাখ টাকা আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অভিযুক্ত সিরাজুল ইসলাম আদেশের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, তিনি এখন হজে রয়েছেন। তাই বিসিআইসি কর্তৃপক্ষের চিঠি এখনও হাতে পাননি। দেশে ফিরে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন।

অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গত বছর ছাতক সিমেন্ট কারখানার অতিরিক্ত ব্যবস্থাপক রেজাউল করিম বাদী হয়ে থানায় পৃথক দুটি মামলা করেন। আদালতের নির্দেশে একটি মামলার তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন। থানায় করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কাজী গোলাম মোস্তাফা জানান, এ মামলায় ডিলার রুবেল মিয়াকে অভিযুক্ত করে ইতিমধ্যে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন (চার্জশিট) দাখিল করা হয়েছে।