বিদ্যুতের খুঁটিতে সয়লাব শিশুদের খেলার মাঠ

মৌলভীবাজারে বিদ্যুৎ বিভাগের স্বেচ্ছাচারিতা

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০১৯

সিলেট ব্যুরো

বিদ্যুতের খুঁটিতে সয়লাব শিশুদের খেলার মাঠ

মৌলভীবাজারের লুয়াইউনি-হলিছড়া চা বাগানের খেলার মাঠ বিদ্যুতের হাজার হাজার খুঁটি রেখে দখল করে রাখা হয়েছে। এর ফলে শিশুদের খেলাধুলাও বন্ধ হয়ে গেছে- সমকাল

মৌলভীবাজারে প্রায় দেড় বছর ধরে একটি চা বাগানের একমাত্র খেলার মাঠ জোর করে দখল করে বিদ্যুতের কয়েক হাজার খুঁটি রেখেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। এর ফলে এই মাঠে আশপাশের কয়েকশ' শিশু-কিশোরের খেলাধুলা বন্ধ। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

কুলাউড়া উপজেলায় অবস্থিত লুয়াইউনি-হলিছড়া চা বাগান কর্তৃপক্ষ খুঁটি সরিয়ে নিতে বিদ্যুৎ বিভাগকে বারবার অনুরোধ করলেও তারা তা উপেক্ষা করছেন।

খেলার মাঠ দখলের বিরুদ্ধে সরকারের কড়া নির্দেশনা থাকলেও তা আমলে নিচ্ছেন না বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা ও তাদের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে শিশু-কিশোররা বিনোদনবঞ্চিত হওয়ায় চা বাগান ও পার্শ্ববর্তী অন্তত পাঁচ গ্রামের বিক্ষুব্ধ মানুষ বিদ্যুতের খুঁটি অপসারণের দাবিতে আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

জানা গেছে, প্রতিদিনের কাজের পর চা বাগানের শ্রমিকরাও এই মাঠে ফুটবলসহ নিয়মিত বিভিন্ন খেলাধুলা করতেন। বিদ্যুৎ বিভাগের স্বেচ্ছাচারিতার জন্য তারাও চিত্তবিনোদনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। হলিছড়া বাগানের শ্রমিক আলাউদ্দিন ও সুখ দেব সমকালকে জানান, চা বাগানের একমাত্র খেলার মাঠ দখল করে রাখায় কেউ খেলাধুলা করতে পারছে না। ছোট বাচ্চাদের পাশাপাশি বাগানের তরুণ-যুবক শ্রমিকরাও এ মাঠে খেলাধুলা করত। কিন্তু পুরো মাঠ বিদ্যুতের খুঁটি দিয়ে ভরে রাখা হয়েছে। এই খুঁটিগুলো বড় বড় ট্রাকে করে আনার সময় পুরো মাঠকে এবড়োখেবড়ো করে ফেলা হয়েছে। তারা মাঠ থেকে বিদ্যুতের খুঁটিগুলো দ্রুত অপসারণের পাশাপাশি তা খেলার উপযোগী করার দাবি জানান।

হলিছড়া চা বাগানের শ্রমিক আব্দুল মজিদ সমকালকে বলেন, প্রথমে শুনলাম মাস খানেকের জন্য খুঁটিগুলো রাখা হয়েছে। কুলাউড়া উপজেলায় বিদ্যুতের নতুন লাইন টানার সুবিধার জন্য মাঠে খুঁটি রাখা হয়েছে। তবে কয়েকদিনের মধ্যেই আরও শত শত খুঁটি আনা হয়। এখন তা কয়েক হাজারে ঠেকেছে। বিদ্যুৎ বিভাগের নিজেদের সুবিধার জন্য হাজার হাজার শ্রমিকের অধিকার খর্ব করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। হলিছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক দুলাল ভর সমকালকে বলেন, স্কুলের ছেলেমেয়েরা এ মাঠে খেলত। এখন তারা খেলতে পারে না। শিশুদের সুস্থ-স্বাভাবিক বিকাশে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাও প্রয়োজন।

জানা গেছে, সিলেটে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন সংস্কারের অংশ হিসেবে চার জেলায় দুটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর মধ্যে মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার প্রধান বিদ্যুৎ লাইন সংস্কারের জন্য কুলাউড়া উপজেলার প্রয়োজনীয় খুঁটিগুলো লুয়াইউনি-হলিছড়া চা বাগানের খেলার মাঠে রাখা হয়। পরে আশপাশের উপজেলার বিদ্যুতের খুঁটিগুলোও এ মাঠে মজুদ করা হয়। বর্তমানে এই দুই জেলার জন্য প্রয়োজনীয় খুঁটি চা বাগানের মাঠে রাখা হয়েছে বলে বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তিনি সমকালকে বলেন, বড় খালি জায়গা না পেলে সাধারণত রাস্তার পাশে খুঁটি রাখা হয়। হলিছড়া চা বাগানের বিশাল মাঠ থাকায় তা কাজে লাগানো হচ্ছে।

লুয়াইউনি-হলিছড়া চা বাগানের মহাব্যবস্থাপক মাবুদ আলী সমকালকে বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে কিছুদিনের জন্য মাঠ ব্যবহারের অনুরোধ করা হয়েছিল। বাগানের শ্রমিক ও শিশুদের কথা বিবেচনায় প্রথমে খেলার মাঠ তাদের দিতে চাইনি। পরে কুলাউড়া উপজেলার ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মমদুত আহমদ অনুরোধ করেন। তিনি এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে সহযোগিতা চান। তার অনুরোধে মাসখানেকের জন্য মাঠে খুঁটি রাখতে দেওয়া হয়। এখন দেড় বছর পরও তারা সরাচ্ছেন না। খুঁটি সরানোর কথা বললে তারা নানা টালবাহানা করেন। সিলেটে গিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা আশ্বাস দেন। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন।

চেয়ারম্যান মমদুত আহমদ সমকালকে বলেন, উন্নয়নের স্বার্থে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা খুঁটি রাখার জন্য জায়গা দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। তাই চা বাগান কর্তৃপক্ষকে তাদের খেলার মাঠ দিতে বলেছিলাম। কিছুদিনের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগ জায়গা চেয়েছিল বলে অনুরোধ করেছিলাম। এখন তারা মাঠ ছাড়ছে না। একাধিকবার আমি নিজেও মাঠ ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছি। ইদানীং বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তারা ফোন ধরেননি।

এ ব্যাপারে প্রকল্প পরিচালক কেএম নাজিম উদ্দিনের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। সিলেট নগরীর বাগবাড়িতে সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাহিদুর রহমান খান এ প্রকল্পের কাজ দেখাশোনা করেন। প্রকৌশলী জাহিদুরের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেও তাকে অফিসে পাওয়া যায়নি। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মতিন দাবি করেন, তিনি এ প্রকল্পের বিষয়ে অবগত নন। তিনি স্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন বলে জানান। দু'দিন পর মতিন সমকালকে বলেন, ঈদের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে মাঠ খালি করতে সংশ্নিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে মাঠের খুঁটি কতদিনের মধ্যে অপসারণ করা হবে, তা তিনি জানাতে রাজি হননি।