কুমিল্লার ঐতিহাসিক লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ের সর্ব উত্তরে বিচ্ছিন্ন টিলায় রানী ময়নামতি প্রাসাদের অবস্থান। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে সর্বপ্রথম খনন কাজ হয় এখানে। এরপর একে একে চার দফা খনন চলাকালে এখানে আবিস্কৃত হয়েছে মাটির ভাঙা পাত্র, লোহার পেরেক ও বিভিন্ন তৈজসপত্রের ভাঙা অংশ। এ ছাড়া পাওয়া গেছে সপ্তম-অষ্টম শতকের একটি গোপন পথ। সম্প্রতি টাকার অভাবে খননকাজ বন্ধ থাকায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে প্রাসাদটি। এতে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান পুরাকীর্তি।

কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের উত্তর পাশে বিচ্ছিন্ন টিলায় প্রাসাদ এলাকাটির অবস্থান। এখানে খননের ফলে আবিস্কৃত ক্রুশাকৃতি স্থাপনার সঙ্গে শালবন বিহারের প্রথম আমলের কেন্দ্রীয় মন্দিরের সাদৃশ্য রয়েছে। চারটি নির্মাণ যুগের নিদর্শন আবিস্কৃত হওয়া এ স্থাপনার উত্তর-দক্ষিণে ১৫৫ দশমিক ৪৫ মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১৫২ দশমিক ৪০ মিটার প্রাচীর ঘেরা ছিল, যা এখন শুধু সীমানা চিহ্ন বহন করে। এখানে বিগত সময়ে আবিস্কৃত পুরাকীর্তির মধ্যে অন্যতম পোড়ামাটির চিত্রফলক। কয়েকটি ফলকের দৃশ্যে আড্ডায় একাধিক পুরুষ, শিকারসহ নকুল জাতীয় প্রাণী, নরসিংহ, বামন, কচ্ছপ, মহিষ, রাজহাঁস, রূপান্বিত ময়ূর, হামাগুড়ি দিয়ে শিশুর সঙ্গে খেলায় মত্ত মা, কিষানের হালকর্ষণ, দুটি চতুষ্পদ প্রাণীর মৈথুন, কিন্নর, লোহার পেরেক, ভাঙা তৈজসপত্র ইত্যাদি। এ ছাড়া আবিস্কৃত কয়েকটি ইটে পিরামিড ও পদ্মপাপড়ির রূপচিহ্ন আছে।

রানী ময়নামতি প্রাসাদ এলাকার মাঝামাঝি অংশে আবিস্কৃত ঢিবির ওপর উনিশ শতকের গোড়ার দিকে আগরতলার তৎকালীন মহারাজা কুমার কিশোর মানিক্য বাহাদুর তার স্ত্রী মনমোহিনীর জন্য একটি বাগানবাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। সেই থেকে এলাকাটি 'রানীর বাংলো' নামে পরিচিত। এখন এলাকাটি গো-চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে খননের সময় রানী ময়নামতি প্রাসাদের দক্ষিণ দিকের সীমানাপ্রাচীরের কিছু কাজ করা হয়েছিল। তবে প্রায় পুরো অংশ এখনও অরক্ষিত রয়ে  গেছে।

রানী প্রাসাদ-সংলগ্ন ময়নামতি কালী মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কিংকর দেবনাথ জানান, দর্শনার্থীরা এখানে এসে নানা সময় ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া রাতের বেলা অনেকেই এখানে মাদক সেবন করে। চারদিকে কোনো বৈদ্যুতিক বাতি না থাকায় অন্ধকার থাকে পুরো এলাকা।

জাতীয় দলের সাবেক কৃতী ফুটবলার হুমায়ুন কবীর জানান, রানী ময়নামতি প্রাসাদের চারদিকে সীমানাপ্রাচীরের পাশজুড়ে ছিল বকুল, দোলনচাঁপা, সোনালু, কৃষ্ণচূড়া, কাঁঠালিয়া, চাঁপাসহ বিভিন্ন ফুলের বড় বড় গাছ। প্রাসাদের চারদিকে গোলাকার বড় চারটি ফুলের বাগান ছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনী সে বাগান থেকে ১৯৫০ সালের পর বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের গাছ তুলে নিয়ে ময়নামতি সেনানিবাসে রোপণ করেছিল। তিনি বলেন, প্রাসাদের উত্তর-পূর্ব কোণে ছিল পাঁচটি বটগাছ, যা পঞ্চবটিকা নামে পরিচিত ছিল। ১৯৫৬-৫৭ সালে সেগুলো স্থানীয়রা কেটে ফেলে।

অরক্ষিত অবস্থায় খননকৃত এলাকা ফেলে রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক ড. আতাউর রহমান বলেন, ফান্ডের অভাবেই খননকাজ বন্ধ রয়েছে। আমরা সরকারের কাছে বরাদ্দ চেয়েছি। পেলে সীমানাপ্রাচীরসহ খননকৃত কাজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।

মন্তব্য করুন