ভূমিবিরোধ ও দুর্নীতি-৮

খুলনায় আবেদন হয়, নিষ্পত্তি হয় না

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০১৯      

হাসান হিমালয় ও এম এ এরশাদ, খুলনা

ভিটেমাটি বলতে কিছুই নেই ডুমুরিয়া উপজেলার ভাণ্ডারপাড়া গ্রামের আবদুল কুদ্দুসের। ভূমিহীন কুদ্দুস তাই উপজেলার খাস জমি পেতে আবেদন করেছিলেন ১৯৯৬ সালে। উপজেলা পর্যায় থেকে তার আবেদনটি ওই বছরই পাঠানো হয় জেলা পর্যায়ে। কিন্তু প্রায় দুই যুগেও তার আবেদনের সুরাহা হয়নি। উপজেলা ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ছোটাছুটি করতে করতে তিনি এখন ক্লান্ত।

ডুমুরিয়া সদরের মনু চৌকিদার খাস জমি বন্দোবস্ত পেতে আবেদন করেছিলেন ১৯৮৫ সালে। কোনো ত্রুটি ছাড়াই তার আবেদন পাঠানো হয় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) কাছে। এরপর কেটে গেছে ৩৪ বছর, কিন্তু আবেদনটি নিষ্পত্তি হয়নি। জমির নিবন্ধন পেতে এখনও ঘুরছেন মনু চৌকিদার। শুধু আবদুল কুদ্দুস ও মনু চৌকিদারই নন; সরকারি খাস জমি বন্দোবস্ত পেতে বছরের পর বছর ধরে ঘুরছেন ভূমিহীনরা। জমি বন্দোবস্ত পেতে অনেক টাকা ঘুষও দিয়েছেন এসব মানুষ। তারপরও আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়ায় হতাশ তারা।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, নতুন ও পুরাতন মিলিয়ে ভূমি বন্দোবস্তের ৭৫০টি প্রস্তাব দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। শুধু খাস জমি বন্দোবস্তই নয়; ভূমির নামজারি সংক্রান্ত মামলা, জেলা প্রশাসনের সঙ্গে ভূমিবিরোধে উৎপত্তি হওয়া দেওয়ানি মামলা, রাজস্ব জমা না দেওয়ার কারণে সার্টিফিকেট মামলাগুলো ঝুলছে বছরের পর বছর। এসব মামলায় পক্ষভুক্ত সাধারণ মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত জুন মাস পর্যন্ত খুলনায় নামজারি বিষয়ক অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা ৬ হাজার ৩৭০টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবেদন অনিষ্পত্তি অবস্থায় রয়েছে বটিয়াঘাটা উপজেলায় ১ হাজার ৭৭৫টি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ডুমুরিয়া, এখানে সেই সংখ্যা ১ হাজার ৬২৫টি।

ডুমুরিয়া উপজেলার দোহাখোলা গ্রামের কৃষক আলমগীর হোসেন নিজ গ্রামে একটি জমি কেনেন গত মে মাসে। জুনে তিনি নামজারির জন্য আবেদন করেন। প্রায় দুই মাস অতিবাহিত হলেও তার নামজারি কাজের কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না। তিনি সমকালকে বলেন, 'তিন-চার দিন পরপর ভূমি অফিসে খোঁজ নিতে যাই। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। কোনো কিছুর নিশ্চয়তা পাচ্ছি না। অথচ ইতিমধ্যে হাজার চারেক টাকা খরচ হয়ে গেছে।'

কাটেংগা গ্রামের নজরুল ইসলাম আবেদন করেছেন গত মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে। প্রায় পাঁচ মাস ধরে তিনিও ঘুরছেন ভূমি অফিসে। নামজারির জন্য এখনও ডাক পড়েনি তার।

ভূমি বন্দোবস্তের জন্য আবেদন করা ভাণ্ডারপাড়া গ্রামের আবদুল কুদ্দুস বলেন, খাস জমি বন্দোবস্ত পেতে ভূমি অফিসের কিছু কর্মকর্তাকে চাহিদা অনুযায়ী টাকা দিয়েছেন। কিন্তু তারপরও তার জমি নিবন্ধন হচ্ছে না।

এসব বিষয়ে ডুমুরিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাজমুল হাসান বলেন, 'খাস জমি বন্দোবস্তের আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সেখানেই আবেদন নিষ্পত্তি হয়। কিন্তু কেন এতদিন ধরে আবেদন নিষ্পত্তি হচ্ছে না, সেটা আমরা বলতে পারব না।' নামজারি মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, সার্ভারে সমস্যা থাকায় মাঝখানে তিন সপ্তাহ কাজ বন্ধ ছিল। দ্রুত এসব মামলা নিষ্পত্তি করা হবে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, নামজারি ও খাস জমি বন্দোবস্তের মতো জেনারেল সার্টিফিকেট মামলা নিয়েও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে ভুক্তভোগীদের। খুলনায় গত জুন পর্যন্ত ২ হাজার ৮৭৬টি সার্টিফিকেট মামলা চলছে। নতুন করে তালিকাভুক্ত হয়েছে ৫৫টি। এসব মামলায় মোট দাবির পরিমাণ ৩৪৫ কোটি ৩ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা চলছে রূপসা উপজেলায়। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ফুলতলা। এ ছাড়া জেলা প্রশাসনের সঙ্গে ভূমিবিরোধ নিয়ে খুলনার বিভিন্ন আদালতে ৮ হাজার ৩৩৬টি দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন। গত জুনে নতুন করে ১৪১টি মামলা যুক্ত হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে এসব মামলা চলায় দুর্ভোগের শেষ থাকছে না মানুষের।

খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সারোয়ার আহমেদ সালেহীন হজে গিয়ে এখনও ফেরেননি। তার দায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) ইকবাল হোসেন। তিনি বলেন, ভূমির জটিলতাগুলো সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিই ভালো বলতে পারবেন। আর মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।