পিরোজপুরের সাবেক এমপি আউয়ালের স্ত্রীর অভিনব জালিয়াতি

প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯      

ফসিউল ইসলাম বাচ্চু ও ফিরোজ মাহমুদ, পিরোজপুর

পিরোজপুরের সাবেক এমপি আউয়ালের স্ত্রীর অভিনব জালিয়াতি

লায়লা পারভীন

পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি একেএমএ আউয়ালের স্ত্রী লায়লা পারভীনের বিরুদ্ধে অভাবনীয় জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। লায়লা পারভীন পিরোজপুর জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। সরকারি একটি খাস জমি নিয়ে তিনি তিন ধরনের জালিয়াতি করেছেন। লায়লা পারভীন নাজিরপুর উপজেলা সদর থানার সামনের একটি খাস জমি ভুয়া নামে ইজারা নিয়ে সেখানে বেআইনিভাবে বাড়ি তৈরি করেছেন। পরে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে সেটি পিরোজপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কাছে ভাড়া দিয়েছেন।

লিখিত চুক্তিপত্রের মাধ্যমে ২০১৭ সাল থেকে সমিতির নাজিরপুর সাব-জোনাল অফিস হিসেবে বাড়িটি ব্যবহূত হচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকা থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি টিম আউয়ালের দুর্নীতি তদন্তে নাজিরপুরে এলে তাদের অনুসন্ধানে জালিয়াতির বিষয়টি বের হয়েছে বলে জানা গেছে।

বাড়ি ভাড়ার চুক্তিপত্রে দেখা যায়, লায়লা ইরাদ (লায়লা পারভীন) প্রতিমাসে ১৭ হাজার ২৫০ টাকা চুক্তিতে পিরোজপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কাছে বাড়িটি ভাড়া দিয়েছেন। চুক্তির মেয়াদ ২০১৭ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এ হিসাবে ভাড়া বাবদ  তিনি ছয় লাখ ২১ হাজার টাকা পাবেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আউয়াল এমপি থাকাকালে প্রভাব খাটিয়ে নাজিরপুর সদর বাজারের সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত ওই জায়গা ভুয়া নামে একসনা লিজ নিয়ে সেখানে অবৈধভাবে দোতলা টিনশেড ভবন নির্মাণ করেন।

পিরোজপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজারের (জিএম) সঙ্গে লায়লা পারভীন ভাড়ার যে চুক্তিপত্র করেছেন তাতে প্রতারণার মাধ্যমে অন্য একটি বাড়ির ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। এতে ঠিকানা দেখানো হয়েছে নাজিরপুর শহরের হাসপাতাল সড়কে অবস্থিত ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি বাড়ি। ওই বাড়ির মালিক পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা শেখ আবুল বাশার। তিনি গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিমের বড় ভাই। বাড়িটি ১৩ শতক জমির ওপর নির্মিত। তিন তলা বাড়িটিতে ছয়টি ইউনিট রয়েছে। নাজিরপুর সাব-জোনাল অফিসের কার্যক্রম যেখানে চলছে, সেটি দোতলা টিনশেড বাড়ি।

প্রয়াত বাশারের ছোট ভাই ব্যবসায়ী নুরে আলম সিদ্দিকী শাহিন জানান, লায়লা পারভীন বাড়িটি ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে অভিনব জালিয়াতি করেছেন। তার ভাইয়ের বাড়ির ঠিকানা ও তফসিল ব্যবহার করে খাস জমির ওপর নির্মিত বাড়িটি ভাড়া দিয়েছেন তিনি।

পিরোজপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জিএম প্রকৌশলী মফিজুর রহমান দাবি করেন, বাড়িটি যখন ভাড়া নেওয়া হয়, তখন তিনি এখানে ছিলেন না। আর এ বিষয়ে এতদিন কোনো অভিযোগ না পাওয়ায় পিরোজপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি খোঁজখবরও নেয়নি। জালিয়াতির বিষয়টি এখন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।

নাজিরপুর উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার আবুল হোসেন জানান, পল্লী বিদ্যুতের নাজিরপুর সাব-জোনাল অফিসের কার্যক্রম যেখানে চলছে, সে ভবনটি খাস জমির ওপর নির্মিত। ছয় ব্যক্তির নামে ওই জায়গা একসনা লিজ নেওয়া ছিল। পরে লিজ নবায়নের জন্য ওই ছয় ব্যক্তিকে নোটিশ করা হলে, তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

লায়লা পারভীনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তিনি এখন ঢাকায়। বাড়িভাড়ার বিষয়টির খোঁজখবর না নিয়ে কিছু বলতে পারবেন না।

জানা গেছে, গত ১৮ নভেম্বর থেকে সাবেক এমপি আউয়ালের দুর্নীতির তথ্য অনুসন্ধানে মাঠে নেমেছে দুদক। তার স্ত্রী লায়লা পারভীন এবং ছেলে আব্দুর রহমান, আব্দুর রহিম ও মেয়ে বুশরা আউয়াল অন্তরার সম্পদের বিষয়েও দুদক অনুসন্ধান চালাচ্ছে।

সূত্র জানায়, দুদকের উপপরিচালক আলী আকবরসহ কমিশনের একটি টিম পিরোজপুরে অবস্থান করে তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালাচ্ছন। দুদক কর্মকর্তারা আউয়াল ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে দলিল করে নেওয়া পিরোজপুর শহরের রাজারহাটের রাজারপুকুর ও আশপাশের সরকারি জায়গা পরিদর্শন করেন। তারা পিরোজপুর সদরের শংকরপাশা ইউনিয়নে সরকারি টাকায় নির্মাণাধীন একেএমএ আউয়াল ফাউন্ডেশনও পরিদর্শন করেন।

জানা গেছে, দুদক কর্মকর্তারা পিরোজপুর, নাজিরপুর ও স্বরূপকাঠি উপজেলায় আউয়াল এবং তার পরিবারের সদস্যদের দখল করা সরকারি অর্পিত সম্পত্তি, খাসজমি, হিন্দুদের দেবোত্তর সম্পত্তি এবং তাদের সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধান করছেন। সংসদ সদস্য থাকাকালে আউয়ালের অনিয়ম, দুর্নীতি, নিয়োগ ও টেন্ডার বাণিজ্য, টিআর-কাবিখাসহ সরকারী উন্নয়নমূলক কাজ থেকে কমিশন আদায়ের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের বিষয়েও দুদক কর্মকর্তারা অনুসন্ধান করছেন।

অভিযোগ রয়েছে, আউয়াল ২০০৮ সালে প্রথমবার এমপি হওয়ার পর থেকেই অনিয়ম, দুর্নীতিসহ নানা বিতর্কিত কাজ করতে শুরল্ফম্ন করেন। ২০১৪ সালে দ্বিতীয় দফায় নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তার বিরুদ্ধে আরও ব্যাপকভাবে অনিয়ম-দুর্নীতি, সরকারি ও হিন্দুদের সম্পত্তি দখল, নিয়োগ ও টেন্ডার বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ ওঠে। তবে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।