যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা-৩

'সময়টাই ছিল অন্যরকম'

প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯      

আবু সালেহ রনি

'সময়টাই ছিল অন্যরকম'

অনিল কুমার রায়

১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরকার 'রাষ্ট্রদ্রোহিতার দায়ে আগরতলা মামলা' করে। বঙ্গবন্ধুর মুক্তি ও এই মামলা বাতিলের দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে, যার উত্তাপ দিনাজপুরেও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানকার ফুলবাড়ী থানার (বর্তমানে উপজেলা) শমসেরনগর গ্রামের কিশোর অনিল কুমার রায়কেও এই আন্দোলনের উত্তাপ স্পর্শ করে। তিনিও মিছিলে যোগ দিয়ে স্লোগান তোলেন, 'জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনব', 'তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা'। এই আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন তিনি।

একাত্তরে ফুলবাড়ীর রাজা রামপুর সরফুদ্দিন হাই স্কুলের ম্যাট্রিকুলেশন (এসএসসি) পরীক্ষার্থী ছিলেন অনিল কুমার রায়। তার জন্ম ১৯৫৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি শমসেরনগর গ্রামে। বাবা দৌলত চন্দ্র পেশায় কৃষক ছিলেন। শত বিঘার ওপর জমি ছিল তার। মা অনন্ত মনি ছিলেন গৃহিণী। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে অনিল ছিলেন চতুর্থ। মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার প্রেক্ষাপট জানাতে গিয়ে অনিল কুমার রায় সমকালকে বলেন, 'তখন পরিস্থিতিই ছিল এমন যে, মুক্তিযুদ্ধে না গিয়ে উপায় ছিল না। কারণ পূর্ব বাংলার অর্থ চলে যেত পশ্চিম  পাকিস্তানে। তা দিয়ে তাদের উন্নয়ন হতো। অথচ এখানে কোনো উন্নয়নই ঘটত না। কিশোর হলেও বড়দের আলোচনা থেকে এসব জেনেছিলাম আমরা। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময় স্কুলে স্কুলে সভা হয়, গ্রামে গ্রামে উঠান বৈঠক হয়, মিছিল হয়। তখন তাদের সঙ্গে জড়িয়ে যাই। পরে একাত্তরের ২৫ মার্চ পাকিস্তানিরা পূর্ব বাংলায় গণহত্যা শুরু করলে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া নিয়ে আর কোনো সংশয় দেখা দেয়নি।'

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী দিনাজপুর শহরে ক্যাম্প স্থাপন করে। পরে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে শুরু করে গণহত্যা ও নির্যাতন। অনিলদের শমসেরনগর গ্রামের দক্ষিণ পাশে ছিল কয়রাকল গ্রাম। এপ্রিলের প্রথম দিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কয়রাকলের হিন্দুদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। এতে মানুষজন আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। জীবন বাঁচাতে তাদের সঙ্গে অনিলও পরিবার-পরিজন নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে চলে যান ভারতের পশ্চিম দিনাজপুরের কুমারগঞ্জের থলসামায়। আশ্রয় নেন এক আত্মীয়ের বাড়িতে। এমনই এক সময় তিনি সিদ্ধান্ত নেন যুদ্ধে যাওয়ার।

এ প্রসঙ্গে অনিল কুমার রায় বলেন, "তখন শরণার্থী এলাকাগুলোতে আওয়ামী লীগের অফিস ছিল। তাদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণে যাওয়া যেত। আমি আর আমার বন্ধু পুষ্প প্রথমে গেলাম গঙ্গারামপুর ইয়ুথ ক্যাম্পে। দিনাজপুরের জর্জ ভাই ক্যাম্পের ইনচার্জ ছিলেন। তিনি বললেন, 'খাওয়া ও ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে পারব। কিন্তু থাকার জায়গা নেই। তোমরা সপ্তাহখানেক পরে আস।' এই সাত দিনে যুদ্ধে যেতে আগ্রহী আরও ছয়জন বাড়ল- রণজিত, নীলকান্ত, প্রেমা, রমেশ, চিত্ত, বীরেনও আমাদের সঙ্গে যেতে চাইল। কিন্তু এবারও ইয়ুথ ক্যাম্পে ঠাঁই হলো না। গঙ্গারামপুর আওয়ামী লীগ অফিস একটি স্লিপ দিয়ে আমাদের পাঠিয়ে দিল পশ্চিম দিনাজপুরের ডাঙ্গারহাটের কাটলা ক্যাম্পে। সেখানে ক্যাম্প ইনচার্জ ছিলেন ক্যাপ্টেন ফজলুর রহমান। ওই ক্যাম্পে তিন সপ্তাহ পিটি প্যারেড হলো। পরে ১৪ আগস্ট আমাদের মধ্যে থেকে বাছাই করা ৫০ জনকে পতিরাম ট্রানজিট ক্যাম্প দিয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয় শিলিগুড়ির পানিঘাটায়। প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিল ভারতের শিখ আর গুরখা রেজিমেন্ট। সেখানে আমাদের এলএমজি, মাইন, রাস্তা উড়ানো, অ্যামবুশ করা, ববিট্রাফস ফিট করা, ব্রিজ ওড়ানোর নানা পদ্ধতি শেখানো হয়। পানিঘাটার ওই ক্যাম্পে আমরা মোট ২৫০ জন ত্রিশ দিনের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম। সেখান থেকে পরে আমাদের একটি দলকে ভারতের কুমারগঞ্জ থানার আঙ্গিনাবাদে পাঠানো হয়।"

অনিল কুমার রায় মুক্তিযুদ্ধ করেন সাত নম্বর সেক্টরে। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন কর্নেল কাজী নুরজ্জামান বীরউত্তম। তাদের ১০ জনের গ্রুপের কমান্ডার ছিলেন একরামুল হক। অনিল ছিলেন টোয়াইসি। তাদের গ্রুপটি প্রথম অপারেশন করে জলপাইতলির মাচুয়াপাড়ায়। ওই অপারেশনে ইসমাইল নামে তার এক সহযোদ্ধা মারা যান। পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে তার মাথা থেকে মগজ বেরিয়ে যায়। বন্ধু পুষ্পও হাতে গুরুতর আঘাত পান। পরে অনিল অপারেশন করেন দিনাজপুরের চৌহাটি, মধ্যপাড়া, ঘুঘুমারি, খোলাহাটি, বেলাইচ,ি ধূলাউদাইলসহ পার্বতীপুর ও ফুলবাড়ী থানার বিভিন্ন এলাকায়।

গেরিলা আক্রমণের সেসব দিনের কথা স্মরণ করে অনিল কুমার বলেন, 'আমরা গেরিলা আক্রমণ করে পাকিস্তানি সেনাদের আতঙ্কিত করে তুলি। সাধারণ মানুষও এতে সহযোগিতা করত। তাদের সহযোগিতা না থাকলে অপারেশন কখনই সফল হতো না।' এভাবেই নানা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু বিপদ তখনও কাটেনি। কারণ অস্ত্র জমা দেওয়ার জন্য ক্যাম্পে গিয়ে ঘটে রক্তাক্ত ঘটনা। যেখানে প্রায় আটশ' মুক্তিযোদ্ধার প্রাণহানি ঘটে। অনিল কুমারকে হারাতে হয় তার ডান পা।

দুঃসহ সেই দিনের স্মৃতিচারণ করে অনিল কুমার রায় বলেন, '১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমপর্ণের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকার বাহিনীর সঙ্গে দিনাজপুরসহ অনেক এলাকায় তখনও খ খ যুদ্ধ হচ্ছিল। যেমন, আমরা সৈয়দপুর মুক্ত করেছিলাম ১৮ ডিসেম্বর। এভাবে মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় সাধারণ জনগণকে অনেক এলাকাতেই রাজাকারদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হচ্ছিল। কিন্তু সাত নম্বর সেক্টর ক্যাম্প থেকে আমাদের অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো। পরে আমরা দিনাজপুরের আঙ্গিনাবাদে অস্ত্র জমা দেই। কয়েকদিন পর ৬ জানুয়ারি দিনাজপুর মহারাজা গিরিজানাথ হাই স্কুুলের মিলিশিয়া ক্যাম্পে আমাদের ক্লোজ হওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হলো। সেদিন সকালে গিয়ে ক্যাম্পে রিপোর্ট করলাম। আমার মতো হাজারও মুক্তিযোদ্ধা সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। ক্যাম্পটিতে বিশেষ ব্যবস্থায় রাখা হয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনীর ফেলে যাওয়া অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মাইন, অ্যান্টি-পারসোনাল মাইন, টু-ইঞ্চ মর্টার, থ্রি-ইঞ্চ মর্টারসহ অনেক কিছু। বিকেলে বাঁশির শব্দ শুনে নিয়ম অনুযায়ী ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে মাঠে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। খানিকটা দূরে হিলি থেকে আসা একটি ট্রাক আনলোড করা হচ্ছিল। যাতে ছিল বিভিন্ন ধরনের মাইন। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সন্ধ্যার আগে আগে ক্যাম্প এলাকার কোথাও বিস্ম্ফোরণ হয়। এরপর চোখ খুলে প্রথমেই দেখলাম টিনের তৈরি লঙ্গরখানাটা নেই। পুরো ভবন উড়ে গেছে। উঠে দৌড় দেওয়ার জন্য ডান পা-টা সামনে ফেলতেই উপুড় হয়ে পড়ে গেলাম। পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলাম সেটি ভেঙে হাড় বেরিয়ে গেছে।'

এরপর অনিলকে রংপুর মেডিকেলে নেওয়া হয়। সেখানেই তার ডান পা হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলা হয়। পরে খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন, ওইদিন প্রায় ৮০০ মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছিলেন।

এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক অনিল কুমার রায় বর্তমানে ক্র্যাচে ভর দিয়ে চলাফেরা করেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে নির্ধারিত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ভাতাও পাচ্ছেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু সরকার অনিল কুমারকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে চাকরি দেন। ২০১৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ওই মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদ থেকে অবসরে যান তিনি। স্বাধীন বাংলাদেশের কাছে প্রত্যাশার কথা জানাতে গিয়ে অনিল বলেন, 'তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাক। দেশটাকে যাতে সুন্দরভাবে এগিয়ে নিতে পারি, আর কখনও যেন স্বাধীনতাবিরোধীরা রাষ্ট্রক্ষমতায় না আসে। দেশের মানুষ সুখে থাক।' কষ্টের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'এক পা নিয়ে চলতে হয়। ছেলেমেয়েরা এখনও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। ওদের জন্য চিন্তা হয়।'