যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা-৯

আঁধারেও আলোর আশা করিমের

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

আবু সালেহ রনি

আঁধারেও আলোর আশা করিমের

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আবদুল করিম

ঢাকাতে গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টে কথা হয়েছিল যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা জহির উদ্দিন প্রধানের সঙ্গে। তিনি জানিয়েছিলেন, সহযোদ্ধা আবদুল করিম গুরুতর অসুস্থ। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার দুই চোখ নষ্ট হয়েছে। একটু খোঁজ নিতে পারেন। পরে ঠিকানা নিয়ে যাই শ্যামলীর মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ারে। খোঁজ করতেই দরজার ওপাশ থেকে আবদুল করিমের স্ত্রী বলেন, 'তিনি তো অসুস্থ, ঘুমাচ্ছেন। কাউকে ইন্টারভিউ দেন না।'

এমন সময় ভেতর থেকে ভরাট গলায় ভেসে এলো, 'কে ওখানে?' দেখা করার জন্য ঘরে ঢুকেই বুঝলাম তিনিই যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আবদুল করিম। ড্রইংরুম লাগোয়া বিছানায় শুয়ে আছেন তিনি। জানতে চাইলাম তার অবস্থা।

আবদুল করিম জানালেন, শারীরিক অবস্থা ভালো না। সবকিছুই অন্ধকার তার। ২৭ অক্টোবর স্ট্রোক হয়েছিল। ১ নভেম্বর সিটি স্ক্যান করানোর পর ডাক্তারদের কাছ থেকে তা জানতে পারেন। চিকিৎসা নিয়েছেন আগারগাঁওয়ের নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে।

তাৎক্ষণিক সাক্ষাৎকার দিতে রাজি না হলেও পরে তাতে সম্মতি দেন তিনি। তার অসুস্থতার কারণে তিন দফায় অল্প অল্প করে তিনি জানান একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে কীভাবে পাকিস্তানিদের গুলিতে দুই চোখ এবং ডান হাতের কব্জি ও বাম হাতের কয়েকটি আঙুল হারিয়েছিলেন।

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আবদুল করিমের জন্ম ১৯৫৪ সালের ১ জানুয়ারি, ঢাকার উত্তরখানের চামুড়খান গ্রামে (বর্তমানে ৪৪ নম্বর ওয়ার্ড)। বাবা মো. শওকত আলী বেপারী ছিলেন কৃষক। মা মতিজা খাতুন বর্তমানে অসুস্থ। পাঁচ ভাই ও তিন বোনের সংসারে আবদুল করিম সবার বড়। একাত্তরে গাজীপুরের ভাওয়াল ডিগ্রি কলেজে এইচএসসি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার পটভূমি জানাতে গিয়ে আবদুল করিম সমকালকে বলেন, 'তখন বয়স ছিল ১৭ বছর। কেবল কলেজে উঠেছি। স্কুল থেকেই ছাত্রলীগ করতাম। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনী হামলা চালালে সিদ্ধান্ত নিই, মুক্তিযুদ্ধে যাব। সম্ভবত জুনের দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে ভারতের আগরতলার হাপানিয়া ক্যাম্পে চলে যাই। সঙ্গে আয়নাল আহমেদসহ ছয় বন্ধু। সেখান থেকে পরে আমাদের পাঠানো হয় আসামের লোহারবনে। সেদিন ছিল শবেবরাতের রাত (অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ)। আসামে ভারতীয় সেনা সদস্যরা আমাদের ৩০ দিনের প্রশিক্ষণ দেয়। লাইলাতুল কদরের রাত; মানে ঈদের তিন-চার দিন (২০ নভেম্বর ঈদ হয়) আগে আবার ২ নম্বর সেক্টরের হেডকোয়াটার আগরতলার মেলাঘরে চলে আসি আমরা। এখানে ঈদের কয়েক দিন পর আমাদের ১০০ জনের একটি গ্রুপকে ঢাকায় পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা অপারেশন করার জন্য পাঠানো হয়। গ্রুপ কমান্ডার ছিলেন দক্ষিণখান ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান এসএম মোজাম্মেল হক (প্রয়াত)। একই গ্রুপে ছিলেন উত্তরখান হাই স্কুলের তৎকালীন সহকারী শিক্ষক জয়নাল আবেদীন, কুর্মিটোলা হাই স্কুলের আরেক সহকারী শিক্ষক জয়নাল আবেদীন প্রমুখ। আমাদের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর হায়দার (আবু তাহের মোহাম্মদ হায়দার)। তেজগাঁও পূর্বাঞ্চলে আমরা গেরিলা অপারেশন করেছিলাম। কারণ ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধ করার মতো পরিস্থিতি ছিল না; তেমন অস্ত্র এবং গোলাবারুদও ছিল না। তা ছাড়া সেটা করলে উল্টো আমাদেরই ক্ষতি হতো। তাই ক্যাম্পের নির্দেশনা ছিল শুধু বাঙ্কার, ওয়্যারলেস স্টেশন ও পাকিস্তানিদের চলাচলে ব্যবহূত কালভার্ট ধ্বংস করাসহ এ ধরনের ছোট ছোট অপারেশন করার।'

ঢাকায় পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে অভিযানের কথা বলতে গিয়ে আবদুল করিম বলেন, 'প্রথম অপারেশনে কসাইবাড়ি অর্থাৎ যেটা বর্তমানে বিমানবন্দর, সেখান থেকে দু'জন পাকিস্তানি সেনা সদস্যকে আটকেছিলাম। তখন টহল দিচ্ছিলাম, এ সময় ওই দু'জন কোদাল খুঁজছিল। কোদাল দেওয়ার কথা বলে ওদের চায়ের স্টলে এনে বসাই। তখন একটু দূরে অবস্থানরত আমাদের আরও দু'জন সঙ্গী পেছন থেকে এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। তখন প্রথমেই আমরা দু'জন ওই দুই সেনার রাইফেল ছিনিয়ে নিই এবং অন্য দু'জন অতর্কিতে তাদের দুই কানে এবং নাকে থাবা দিয়ে কাবু করে ফেলি। তারপর তাদের বালু নদীর ওপারে আমুয়ায় নিয়ে যাই। আজমপুরেও আমরা বাঙ্কার অপারেশন করেছিলাম।'

এর পরের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কিছুটা থমকে যান আবদুল করিম। বর্ণনা করেন তার দুই চোখ ও দুই হাত হারানোর হৃদয়বিদারক ঘটনাটি। তিনি বলেন, 'দিনটি ছিল ৮ ডিসেম্বর। ওই দিন সন্ধ্যার খানিকটা পর গ্রুপ কমান্ডার মোজাম্মেল হক আমাকে ও শামসুদ্দিনকে ঢাকার উত্তরার আজমপুরে পাকিস্তানিদের রেকি (গতিবিধি পর্যবেক্ষণ) করতে পাঠান। সিদ্ধান্ত ছিল রাত পৌনে ১২টায় আজমপুর এলাকায় পাকিস্তানি ক্যাম্পে গেরিলা অপারেশন চালানোর। পাকিস্তানিরা যে মাইন পুঁতে রেখেছে, তা আমাদের জানা ছিল না। তাই রেকি করে ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় রেললাইন ক্রস করে ক্রলিং করে একটু সামনে পশ্চিমদিকে এগোতেই মাইনে আমার হাত লেগে যায়। আমার হাতে তখন গ্রেনেড ও আর্মস দুটোই ছিল। আচমকা মাইন বিস্ম্ফোরিত হলে বাম হাতের কব্জি পর্যন্ত ছিন্নভিন্ন হয়ে উড়ে যায়। আর বিস্ম্ফোরণে ডান হাত এবং দুই চোখেরও ক্ষতি হয়। কিন্তু এতে যে দুই চোখই নষ্ট হয়ে যাবে- তা বুঝিনি। তখন আমার কোনো জ্ঞান ছিল না।'

আবদুল করিম জানান, মাইন বিস্ম্ফোরণের পর পাকিস্তানি ও তার সহযোদ্ধাদের মধ্যে গোলাগুলি হয়। এক পর্যায়ে তারা বালু নদীর পূর্বদিকে নিরাপদ এলাকায় চলে আসেন। জ্ঞান ফেরার পর থেকে তিনি আর চোখে দেখেননি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর পর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল অর্থাৎ তখনকার পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়।

আবদুল করিমের চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু সরকার দু'দফা উদ্যোগ নেয়। তাকে ১৯৭২ সালে বুলগেরিয়া ও ১৯৭৪-এ পোল্যান্ডে পাঠানো হয়। কিন্ত তিনি দৃষ্টি ফিরে পাননি। ১৯৮১ সালে আবদুল করিমকে যুক্তরাজ্যে পাঠানো হয়। চিকিৎসার পর তখন মাত্র ৯ মাসের জন্য দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান তিনি। এর পর চিরদিনের জন্য দৃষ্টিশক্তি হারান আবদুল করিম। তিনি বলেন, 'অনেক হাসপাতালে অনেক ডাক্তার দেখিয়েছি। তারা বলেছেন, চোখের কর্নিয়া নষ্ট হয়ে গেছে। আর কাজ হবে না।'

আট-নয় মাসের দেখা স্বাধীন বাংলাদেশের স্মৃতিই আবদুল করিমের জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এ বিষয়ে তিনি বলেন, 'দেশটা মুক্ত দেখে খুব ভালো লেগেছিল। সবচেয়ে ভালো লেগেছিল ঢাকার রাস্তাঘাট দেখে। কারণ মুক্তিযুদ্ধের আগে রাস্তাঘাট ছিল সবই কাঁচা, ইটের। কিন্তু দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়ে সেগুলো পাকা দেখার পর মনে হয়েছিল, জাদুর খেলা। বাবাও তখন বেঁচে ছিলেন। বাবা-মাকে দেখেও ভালো লেগেছিল।' বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতিতে ২০০২ সালে প্রশিক্ষক হিসেবে যোগ দেন তিনি। ২০১১ সালের আগস্টে সেখান থেকেই অবসরে যান।

আবার যদি চোখের আলো ফিরে পান- এমন প্রশ্নে আবদুল করিম বলেন, 'পাঁচ ছেলে-মেয়ে, পরিবার; কাউকেই তো দেখিনি। তাদের দেখব, স্বাধীন দেশের মানুষ দেখব, মানুষের আনন্দ দেখব... আর কী চাই!

১৯৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি আবদুল করিম ঢাকার উত্তরখানের বাসিন্দা তাহমিনা আক্তারকে বিয়ে করেন। তাদের দুই ছেলে ও তিন মেয়ে। ৩৭ বছরের সংসার জীবন নিয়ে জানতে চাইলে তাহমিনা আক্তার বলেন, 'সব সময়ই তাকে আগলে রেখেছি। এতদিন চলাফেরা করতে পারতেন, কিন্তু এখন তো তাও পারছেন না। তার জন্য দোয়া করবেন।'

স্বাধীন বাংলাদেশের কাছে প্রত্যাশার কথা জানাতে গিয়ে আবদুল করিম বলেন, 'সুখী-সমৃদ্ধশালী দেশ হোক- এটাই চাওয়া। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন মাতৃভূমিকে ভালোবাসে, উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তোলে।'