স্বেচ্ছাশ্রমে চলছে বাঁধ মেরামত

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২০     আপডেট: ২৩ মে ২০২০

কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি ও শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা

স্বেচ্ছাশ্রমে চলছে বাঁধ মেরামত

খুলনার কয়রায় হরিণখোলা গ্রামে আম্পানের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ সংস্কার করছেন এলাকাবাসী - সমকাল

'মেলা ছবি তুলেছে, ভিডিও করেছে, তবুও পানি ঢোকা বন্ধ হয়নি। এমন কিছু করো, যেন সরকার ভেঙে যাওয়া বাঁধ বেঁধে আমাগো বাড়িতে থাকার সুযোগটা করে দেয়।' করুণ সুরে কথাগুলো শেষ করে দুই হাতে চোখ মুছে নেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার দাতিনাখালীর বাসিন্দা সত্তরোর্ধ্ব মোসলেম সানা। বাঁধ ভেঙে হুহু করে পানি ঢুকে তার খামারের দুই হাজার মুরগি ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ধসে যায় বসতঘর। দু'দিন ধরে রাস্তায় কাটাতে হচ্ছে তার গোটা পরিবারকে। এদিকে, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে ধসে যাওয়া বেড়িবাঁধ স্বেচ্ছাশ্রমে মেরামতের উদ্যোগ নিয়েছেন খুলনার কয়রা উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী। বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে গতকাল শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত স্থানীয়রা বেশ কয়েকটি স্থানে নদীর পানি প্রবেশ বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছে। তবে কয়রা সদরের হরিণখোলা, মহারাজপুর ইউনিয়নের লোকা ও দশহালিয়া বাঁধ এখনও মেরামত করা যায়নি। ফলে গতকাল দুপুরের জোয়ারেও নদীর পানি ঢুকে আরও কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে উপকূল রক্ষা বাঁধ নদীতে বিলীন হওয়ায় সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গোটা দাতিনাখালী ও পাশের বুড়িগোয়ালীনি গ্রামের হাজারো পরিবার চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। সুন্দরবনে গিয়ে একবার বাঘের আক্রমণ থেকে বেঁচে যাওয়া জহুরা বেগম বলেন, আম্পানের পর বাড়িতে ফিরলেও ঘরের মধ্যে পানি। তাই খাটের ওপর বসে জোয়ারের সময় পার করতে হচ্ছে। এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে তিনি সরকারের তরফ থেকে পাওয়া চিড়া-গুড় খেয়ে দু'দিন পার করেছেন। টিউবওয়েল ডুবে থাকায় খাবার পানির জন্য কষ্ট হচ্ছে। একমাত্র সাইক্লোন শেল্টারে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় অনেকে রাস্তায় শুয়ে-বসে কাটাচ্ছেন।

গত বুধবার ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে খুলনার কয়রা উপজেলার ২১টি স্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধের ক্ষতি হয়। এর মধ্যে সাতটি স্থান দিয়ে লোকালয়ে নদীর পানি প্রবেশ করে। এতে কমপক্ষে ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়। এর ফলে এক লাখ ৪৮ হাজার মানুষের ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। হরিণখোলা বাঁধ ভাঙার কারণে গতকাল দুপুরে নতুন করে উপজেলা পরিষদসহ মদিনাবাদ ও মহারাজপুর গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

গতকাল সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের জোড়শিং নৌপুলিশ ফাঁড়ির সামনে থেকে কোস্টগার্ড ক্যাম্প পর্যন্ত দুই কিলোমিটার ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ স্থানীয়রা নিজ উদ্যোগে মেরামত করেছেন। এ ছাড়া চরামুখা, মাটিয়াভাঙ্গা, ছোট আংটিহারা এলাকার বাঁধ মেরামতেও এলাকাবাসী প্রাণান্ত চেষ্টা চালাচ্ছেন। গ্রামবাসীর কয়েকজন জানান, নিজেদের বাড়িঘর রক্ষায় তারা সব ভয় উপেক্ষা করে এগিয়ে এসেছেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মোজাফফর হোসেন বলেন, এ মুহূর্তে পাউবোর কোনো কর্মকর্তা তাদের এলাকায় না আসাই ভালো। কারণ, তাদের দেখলে লোকজন কাজের আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন।

গতকাল ভোর থেকেই কয়রা সদর ইউনিয়নের ভেঙে যাওয়া হরিণখোলা বাঁধটি মেরামতের জন্য স্থানীয়রা কাজে নেমে পড়েন। দুপুরের জোয়ার আসার আগ পর্যন্ত তারা বাঁধের এক-তৃতীয়াংশ আটকাতে সক্ষম হন। সেখানে জোয়ারের সময়ও কাজের জন্য লোকজনকে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।

গোবরা গ্রামের বাসিন্দা ও কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির সদস্য সচিব ইমতিয়াজ উদ্দিন বলেন, পাউবোর অপেক্ষায় থাকলে এলাকাবাসীর কষ্ট দীর্ঘমেয়াদি হবে ভেবেই আমরা নিজেরা উদ্যোগ নিয়েছি। বাঁধটি দিয়ে যাতে নদীর পানি না ঢোকে আপাতত সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওই বাঁধটি স্থায়ীভাবে মেরামতের জন্য সংশ্নিষ্টদের প্রতি জোর দাবি জানান তিনি।

কয়রা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এসএম শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, স্থানীয়দের বাঁধ মেরামতের উদ্যোগে উপজেলা পরিষদ থেকেও সহযোগিতা করা হচ্ছে।

পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী মশিউল আবেদীন জানিয়েছেন, ভেঙে যাওয়া বাঁধ মেরামতে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। এলাকাবাসীর কাজে সহযোগিতার জন্য আমরা সিনথেটিক ব্যাগ সরবরাহ করেছি।

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী খান আরিফুজ্জামান বলেন, এ মুহূর্তে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের মূল্যায়ন বা পরিমাপ করা হচ্ছে। সে অনুযায়ী বরাদ্দের জন্য আবেদন করা হবে।

খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনের সাংসদ মো. আখতারুজ্জামান বাবু বলেন, ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে উপকূলীয় এলাকার বাঁধ রক্ষায় গৃহীত মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কয়রার মানুষের কষ্ট স্থায়ীভাবে লাঘব হবে। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো জরুরিভিত্তিতে মেরামতের চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।