সিলেট আওয়ামী লীগ

'চাপা ক্ষোভে'র মধ্যে কেন্দ্রে জমা পড়েছে জেলা-মহানগর কমিটি

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০     আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০

চয়ন চৌধুরী, সিলেট

কেন্দ্রের বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যেই সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা অনুমোদনের জন্য জমা দেওয়া হয়েছে। সোমবার রাতে মহানগরের শীর্ষ দুই নেতা কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদকের হাতে তাদের কমিটির পূর্ণাঙ্গ তালিকা জমা দেন। আগের দিন রোববার জেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা হয়েছে।

এ দুটি কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে কারও মতামত নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে অনেক নেতার মধ্যেই 'চাপা ক্ষোভ' রয়েছে। তবে বাদ পড়ার আশঙ্কায় তারা প্রকাশ্যে কিছু বলছেন না। অবশ্য উভয় কমিটির শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন, বিগত কমিটির সক্রিয়দের রেখেই নতুন কমিটি প্রস্তুত করে জমা দিয়েছেন তারা।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন খান সমকালকে জানান, ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করে জমা দেওয়ার কথা ছিল। এ নির্দেশনা অনুযায়ী রোববার তিনি নিজে গিয়ে কমিটি জমা দিয়েছেন। জেলার সভাপতি অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান অসুস্থ থাকায় যেতে পারেননি।

মহানগর সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সোমবার রাতে সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেনকে নিয়ে তিনি পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা জমা দিয়েছেন। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ৭৫ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১৭-১৮ জন উপদেষ্টার তালিকাও দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের কারও নাম বলেননি মাসুক উদ্দিন।

গত বছরের ৫ ডিসেম্বর জেলা ও মহানগরের সম্মেলনে শুধু সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘ ৯ মাস পর কেন্দ্রের নির্দেশে উভয় কমিটির পূর্ণাঙ্গ তালিকা অনুমোদনের জন্য জমা দেওয়া হলো। গত ২ সেপ্টেম্বর দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এক প্রশ্নের জবাবে জেলার সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন খান বলেন, বিগত কমিটির সক্রিয় কেউ যেন বাদ না পড়েন, তা নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ছাড়া সুবিধাবাদী ও অনুপ্রবেশকারীদের ব্যাপারে সতর্ক ছিলাম। তিনি বলেন, বিরোধ থাকলে মতামত নেওয়ার প্রশ্ন আসে। সভাপতির সঙ্গে আলোচনা করেই কমিটি করেছি।

অন্যদিকে মহানগর সভাপতি মাসুক উদ্দিন বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতি করি; সবার সম্পর্কে ধারণা তো আছেই। এদের মধ্যে যারা ক্লিন ইমেজের ও দলের জন্য নিবেদিত, তাদের নিয়ে কমিটি করেছি। অনুপ্রবেশকারী ও যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে বেড়ায়, তাদের ব্যাপারে সতর্ক ছিলাম। এখন কেন্দ্র যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন দেবে।

সর্বশেষ সম্মেলনে জেলা ও মহানগরের সম্ভাব্য সভাপতি হিসেবে আলোচনায় ছিলেন শফিকুর রহমান চৌধুরী ও আসাদ উদ্দিন আহমদ। সাবেক এমপি শফিকুর রহমান জেলার ও আসাদ উদ্দিন বিগত কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বর্তমান সভাপতি লুৎফুর রহমান ভারপ্রাপ্ত থেকে পূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ায় শফিকুর রহমান বঞ্চিত হন।

অন্যদিকে কেন্দ্রের নির্দেশে শেষ মুহূর্তে 'বড় ভাই' মাসুক উদ্দিন সভাপতি প্রার্থী হওয়ায় সম্মেলনে এ পদে আর প্রার্থী হননি আসাদ উদ্দিন। সেই সময়ে তারা বঞ্চিত হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে শফিকুর ও আসাদের অনুসারীরা আশা দেখছেন। জেলা ও মহানগরে তাদের সিনিয়র সহসভাপতি পদে রাখার কথা আলোচনায় রয়েছে।

তবে জেলা বা মহানগরের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের কেউ পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি। কয়েক দিন ধরে পদপ্রত্যাশী নেতারা চেষ্টা করেও তাদের তরফে কোনো সুযোগ পাননি। বিগত কমিটির সহসভাপতি, যুগ্ম সম্পাদক ও সম্পাদকীয় পদে ছিলেন এমন অনেক নেতা সমকালের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, সম্মেলনের মাধ্যমে তারা দায়িত্ব পেলেও আওয়ামী লীগ তো শুধু তাদের হয়ে যায়নি। নিজেরা দীর্ঘদিন ধরে দলের জন্য কাজ করছেন উল্লেখ করে তারা বলেছেন, নূ্যনতম মতামত নিলে নিজেদের মূল্যায়ন হচ্ছে ভাবতে পারতাম। জানি না, কাকে কোথায় রাখা হয়েছে। পদ পাওয়া নিয়েও শঙ্কা আছে।

সর্বশেষ ২০১১ সালের ২২ নভেম্বর সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই সময় আব্দুজ জহির চৌধুরী সুফিয়ান সভাপতি ও শফিকুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করে জেলার কমিটি হয়। মহানগরে সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান সভাপতি ও আসাদ উদ্দিন সাধারণ সম্পাদক হন।

২০১৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তৎকালীন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সুফিয়ান মারা গেলে অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালের সিলেট সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী কামরানের পরাজয়ের পর মূলত কেন্দ্র থেকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

প্রায় ৯ বছর আগে সর্বশেষ গঠিত পূর্ণাঙ্গ কমিটির মৃত, শারীরিকভাবে অসুস্থ ও স্থায়ীভাবে বিদেশে বসবাসরত এবং নিষ্ফ্ক্রিয়দের বাদ দিয়ে বাকি সবাই নতুন কমিটিতে রয়েছেন বলে সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অবশ্য সক্রিয়দের মধ্যে কয়েকজন নেতাকে বয়সের কারণে উপদেষ্টা হিসেবে রাখা হয়েছে। এখন সবাই কেন্দ্রের অনুমোদনের অপেক্ষায়। এমন পরিস্থিতিতে পদ-পদবি নিয়ে শঙ্কায় থাকা কয়েক নেতা কেন্দ্রে যোগাযোগ শুরু করেছেন বলেও জানা গেছে। এ ছাড়া পছন্দের লোকজনকে গুরুত্বপূর্ণ পদ পাইয়ে দিতে জনপ্রতিনিধিদের কেউ কেউ তৎপরতা শুরু করেছেন। সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন নিয়ে চাপা ক্ষোভের পাশাপাশি উত্তেজনাও রয়েছে।