মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন-সমকাল অনলাইন সংলাপ

বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে চাই সর্বাত্মক প্রচেষ্টা

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০২০

সমকাল প্রতিবেদক

নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন সূচকে বিভিন্ন অগ্রগতির পরও বাল্যবিয়ে সমাজে একটি কালো তিলক হিসেবে রয়ে গেছে। প্রাকৃতিক ও স্বাস্থ্যজনিত দুর্যোগের পাশাপাশি বাংলাদেশকে 'বাল্যবিয়ে' নামক সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এর ফলে মেয়েরা পারছে না প্রস্ম্ফুটিত হতে। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে আইন রয়েছে; কিন্তু শুধু আইন করে এই ক্ষত সারানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার, সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। সরকার, গণমাধ্যম ও উন্নয়ন সংগঠন সবাই একসঙ্গে কাজ করলে ধীরে ধীরে বাল্যবিয়ের মতো কালো দাগ সমাজের বুক থেকে দূর হবে।

'করোনা ও দুর্যোগে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে আমরা কতটা প্রস্তুত' শীর্ষক এক ডিজিটাল সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। গতকাল মঙ্গলবার সমকাল ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন যৌথভাবে ভার্চুয়াল এই সংলাপের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি। এতে আলোচক হিসেবে অংশ নেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা এমপি, মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম।

সংলাপের শুরুতে মুস্তাফিজ শফি বলেন, নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়নের প্রশ্নে নীতি ও কাঠামোগত দিক থেকে ইতিবাচক ও উদাহরণমূলক নানা অগ্রগতি সত্ত্বেও বাল্যবিয়ে সমাজে একটি অন্ধকার গলি হিসেবে রয়ে গেছে। আমরা প্রাকৃতিক ও স্বাস্থ্যজনিত দুর্যোগের পাশাপাশি 'বাল্যবিয়ে' সংকট মোকাবিলা করছি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, করোনার মতো দুর্যোগে ধর্ষণের মতো গুরুতর নারী নির্যাতনও থেমে নেই। এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। আমাদের সমাজে নারীর প্রতি যে বহুমাত্রিক সহিংসতা চলে আসছে, ধর্ষণের অঘটনগুলো তারই ধারাবাহিকতা। সমকাল সব সময় সমাজের এসব অসঙ্গতি নিয়ে সোচ্চার। বাল্যবিয়ে নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সমকাল আরও দুটি সংলাপের আয়োজন করেছে। আগের দুটি সংলাপে করোনা দুর্যোগেও বাল্যবিয়ে বেড়ে যাওয়ার কারণ এবং এক্ষেত্রে কীভাবে সামাজিক প্রতিরোধ হতে পারে, সেসব বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় এটি তৃতীয় সংলাপ। তবে গত এক মাসে পরিস্থিতি কতটা পাল্টে গেছে, তা আর নতুন করে বলার নেই। আমরা যখন এই সংলাপ করছি, তখনও রাজধানীসহ গোটা দেশ ধর্ষণসহ নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার। গত সোমবার 'নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন' দ্বিতীয় দফা সংশোধন মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে এবং সংসদ অধিবেশন না থাকায় মঙ্গলবার এ ব্যাপারে অধ্যাদেশও জারি হয়েছে। তবে শুধু আইন থাকলে হবে না। আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ প্রয়োজন।

সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক বলেন, এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার নারী। নারীরা অনেক দূর এগিয়েছে। তারপরও বাল্যবিয়ে সমাজের জন্য ক্ষত হয়ে আছে। বাল্যবিয়ের কারণে মেয়েরা নিজেদের মতো প্রস্ম্ফুটিত হতে পারছে না। তিনি বলেন, বাল্যবিয়ের মতো ক্ষত সারাতে শুধু আইন করে লাভ হবে না। এজন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক দুটো অঙ্গীকারই লাগবে। বাল্যবিয়ে রোধে সরকার, গণমাধ্যম ও উন্নয়ন সংগঠন সবাই একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সমকাল নারীর অধিকারের প্রশ্নে সব ধরনের সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে সব সময় একাত্মতা প্রকাশ করে কাজ করে যাবে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা বলেন, নারীর কখন বিয়ে হবে, সে কয়টা সন্তান নেবে- এই সিদ্ধান্ত নারীদের সাধারণ অধিকার। বাল্যবিয়ের কারণে মেয়েরা এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। এর কারণে তারা শিক্ষা থেকে, কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হয়। অল্প বয়সে বিয়ে হলে তাড়াতাড়ি বাচ্চা হয়, যা মা ও শিশু উভয়ের জন্য ঝুঁ?কিপূর্ণ। এতে মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অঙ্গীকার করেছেন, ২০৪১ সালের মধ্যে দেশে কোনো বাল্যবিয়ে থাকবে না। প্রধানমন্ত্রী একজন নারীবান্ধব নেত্রী। ধর্ষণ রোধে যখন সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি উঠেছে, সঙ্গে সঙ্গেই তিনি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে আইন সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী কর্মস্থলে অর্ধেক নারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছেন। তার এই বক্তব্য নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে ম্যাগনাকার্টার হয়ে থাকবে।

ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা বলেন, সরকার বাল্যবিয়ে রোধে কাজ করছে। আইন সংস্কার করা হয়েছে। যৌতুকবিরোধী কাজ চলছে। বাল্যবিয়ে রোধে জাতীয় হেল্পলাইন আছে। করোনার মধ্যে নয় লাখ কল এসেছে। অ্যাপসও রয়েছে। প্রত্যেক ইউনিয়ন পর্যায়ে কিশোর-কিশোরীরা সংগঠিত হচ্ছে। বাল্যবিয়ে রোধে ২৪ ঘণ্টা মোবাইল কোর্ট কাজ করছে। কারণ অনেক এলাকায় অভিভাবকরা অল্প বয়সী মেয়েদের রাতে বিয়ে দেয়, যাতে কেউ জানতে না পারে।

নারীদের উন্নয়নে সরকারের গৃহীত কার্যক্রমের বর্ণনা দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, নারীদের শিক্ষা বৃদ্ধিতে সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। নারীদের শিক্ষায় ধরে রাখতে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রণালয় স্থানীয় প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করছে। তিনি বলেন, নারী উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নে অগ্রগতির কারণে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছেন এবং নানা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, এখন করোনা পরিস্থিতিতে সারাবিশ্ব স্তব্ধ হয়ে গেছে। চাকরি নেই, আয় কমেছে। একই সঙ্গে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে। জাতিসংঘের পরিসংখ্যান টেনে তিনি বলেন, করোনার সময় বাল্যবিয়ে ২০ শতাংশ বেড়েছে। তিনি বলেন, করোনায় অনেক প্রবাসী দেশে ফিরেছেন। তারা বিয়ে করছেন। সমাজে প্রবাসী পাত্রের চাহিদা বেশি। স্বাস্থ্যবিধি মানার কারণে এ সময় বিয়ের খরচও কম। এসব কারণে করোনার সময় বাল্যবিয়ে বেড়েছে।

ফজিলাতুন নেসা বলেন, বাল্যবিয়ে পারিবারিক ও সামাজিক সংস্কৃতির ওপরও নির্ভর করে, যা ধীরে ধীরে পরিবর্তন করতে হবে। মানুষের স্বভাব বদালানোর জন্য কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, শুধু সরকার, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে বাল্যবিয়ে রোধ করা সম্ভব নয়। ধর্মীয় নেতা, তৃণমূলের প্রভাবশালী ব্যক্তিসহ সবাইকে নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য কাজ করতে হবে। এ বিষয়ে গবেষণা করতে হবে। তা হলে সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ের হার শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।

অন্য আলোচকদের কয়েকটি প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারী নির্যাতন রোধে কমিটি গঠন করা হয়েছে। মেয়েদের জন্য পৃথক ল্যাট্রিন তৈরি করা হচ্ছে, বিনা পয়সায় স্যানিটারি ন্যাপকিন সরবরাহ করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে এনজিওগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে।

মালেকা বানু বলেন, আমরা সমতার কথা বলি, সহিংসতা প্রতিরোধের কথা বলি, ক্ষমতায়নের কথা বলি; এর সঙ্গে বাল্যবিয়ে যায় না। দেশের অনেক অগ্রগতি আছে, সামাজিক সূচকে দেশ এগিয়েছে; আবার বাল্যবিয়ে বা নারীর প্রতি সহিংসতায়ও এগিয়ে আছি। আমাদের অগ্রগতি স্থায়ী হবে না, যদি না নারীদের প্রতি সহিংসতা কমে। তিনি বলেন, করোনাকালে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে কন্যা বা নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে। প্রতিদিন তিন থেকে চারজন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসন, সমাজকর্মীরা বাল্যবিয়ে রোধে ভূমিকা রাখছে, কিন্তু করোনার সময় এ ভূমিকা কমে গেছে।

এই নারী নেত্রী বলেন, বাল্যবিয়ের জন্য দায়ী কাজিসহ সংশ্নিষ্ট সবার শাস্তি হতে হবে। বাল্যবিয়েতে ভুয়া জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করা হচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

মালেকা বানু বলেন, বাল্যবিয়ে রোধে যে আইন রয়েছে, তাতে পরিবর্তন আসায় এখন এটি রোধে মাঠ প্রশাসনের অনীহা দেখা দিচ্ছে, কারণ আইনে ছাড় দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বাল্যবিয়ে রোধে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে ভূমিকা রাখতে হবে। তাদের কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং করতে হবে। যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়কে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করতে হবে। সুলভ মূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। সামাজিক-সাংস্কৃৃতিক যেসব মূল্যবোধ মানবাধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, সেগুলোর পরিবর্তনে সবাইকে কাজ করতে হবে- সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে।

শাহীন আনাম তার বক্তৃতায় বলেন, বাল্যবিয়ে একটি মেয়ের জন্য বড় ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন। এতে তার বেড়ে ওঠা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হয়। উপমহাদেশের দেশগুলোর মধ্যে অনেক সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও বাল্যবিয়েতে অনেক পিছিয়ে। তার কারণ সমাজের অনেকেই এখনও মনে করেন, মেয়েদের অল্প বয়সেই বিয়ে দেওয়া শ্রেয়। কারণ মা-বাবা মেয়েদের নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। অভিভাবকদের ধারণা, তাড়াতাড়ি বিয়ে দিলে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। এসব ধারণা থেকে অভিভাবকদের বের করে আনা খুব কঠিন।

তিনি বলেন, সরকার বাল্যবিয়ে রোধে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। অন্য সবাইও চেষ্টা করছেন। তারপরও এটা বন্ধ হচ্ছে না। গত পাঁচ বছরে ৩০ হাজার বাল্যবিয়ে বন্ধ করেছি। তারপরও ৫১ ভাগ মেয়ের বিয়ে হচ্ছে ১৮ বছরের আগে।

শাহীন আনাম বলেন, নারীদের প্রতি নেতিবাচক ধ্যান-ধারণা দূর না হলে, সন্তানদের নিয়ে নিরাপত্তার ভয় থাকলে বাল্যবিয়ে রোধ করা কঠিন। সবকিছু আইন দিয়ে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য সমাজ ও সংসারের ধ্যান-ধারণা পাল্টাতে হবে। তিনি বলেন, সমাজ পালটাচ্ছে। নারীরা অনেক এগিয়েছে, হিমালয়েও তাদের পদচিহ্ন পড়েছে। কিন্তু সমাজের একটি অংশের ধ্যান-ধারণা এখনও পাল্টায়নি, তাদের চিন্তাচেতনা এখনও এই যে, মেয়েরা শুধু সংসার করবে। পরিবারে মেয়ে ও ছেলে মানুষ করার ক্ষেত্রে এখনও বৈষম্য করা হচ্ছে। পোশাক কর্মী মেয়েরা তাদের আয় সংসারে ব্যয় করলেও কোনো মূল্যায়ন নেই। তিনি বলেন, মেয়েদের যতদিন সম্ভব স্কুলে ধরে রাখতে হবে। তাদের শরীর নিয়ে সামাজিক ট্যাবু থেকে বেরুতে হবে। তবেই বাল্যবিয়ের মতো ক্ষত থেকে সমাজ মুক্ত হবে।