প্রকৃতি

হেমন্তের নিশিপুষ্প

প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০২০     আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০২০

মোকারম হোসেন

হেমন্তের নিশিপুষ্প

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে তোলা হিমঝুরি ফুলের ছবি- লেখক

হেমন্তের অন্যতম সুগন্ধি ফুল হিমঝুরি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ 'সাঁওতাল মেয়ে' কবিতায় লিখেছেন- 'হিমঝুরি শাখা-'পরে/ চিকন চঞ্চল পাতা ঝলমল করে/ শীতের রোদ্‌দুরে।'

এই সুদর্শন গাছটি কোথাও কোথাও আকাশনীম নামেও পরিচিত। প্রকৃতিপ্রেমী কবি বিষ্ণু দে বলেছেন- 'তাই কৃষ্ণচূড়া, তাই জারুল গোলমোরে/ অশোক বান্দরলাঠি পিয়াশাল বিজাশালে/ হিজলে সোঁদালে/ শিরীষে আকাশনীমে নানা বনস্পতি মহিরুহে/ স্বদেশ আত্মার মূর্তি।'

'নগরে নিসর্গ' গ্রন্থে বিপ্রদাশ বড়ূয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান গ্রন্থাগারের প্রবেশপথ লাগোয়া গাছটি সম্পর্কে লিখেছেন, 'বিজ্ঞানাচার্য সত্যেন বসু এ গাছের চারাটি কলকাতার শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে এনেছিলেন। তখন এখানে তাঁর বাসা ছিল।' তিনি কুয়াকাটার মিছরিপাড়ায় রাখাইনদের বাড়িতে আরও ৩টি গাছের সন্ধান দিয়েছেন। নিজে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির বাগানে লাগিয়েছেন একটি গাছ। কয়েক বছর আগে রমনা পার্কে অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা 'তরুপল্লব'-এর উদ্যোগে একটি গাছ লাগিয়েছেন। তা ছাড়া বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণেও লেখক মাহরুখ মহিউদ্দিনের উদ্যোগে একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী অন্যান্য কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি গাছ লাগিয়েছেন। ঢাকায় বলধা গার্ডেনের পাশে খ্রিষ্টান কবরস্থানের ভেতর বিভিন্ন আকারের কয়েকটি গাছ দেখা যায়। মিয়ানমারের নিজস্ব এই বৃক্ষ আমাদের দেশে এসেছে প্রায় দু'শ বছর আগে। দক্ষিণ ভারতের কোথাও কোথাও প্রায় সব বাড়ি ও স্থাপনার পাশে এই গাছ দেখেছি।

হিমঝুরি (Millingtonia hortensis) সুউচ্চ চিরসবুজ বৃক্ষ; খাড়া ডালপালায় নোয়ানো আগা, ছোটখাটো ডালের মতো সরু পত্রিকাবহুল পক্ষাকার যৌগপত্র। ফুল মধুগন্ধি, ফোটে রাতে, ভোরের আগেই ঝরে পড়ে, শাখান্তের বড়সড় যৌগিক মঞ্জরিতে, ছাড়া ছাড়াভাবে। ফুলগুলো সাদা ও নলাকার। নলমুখে বসানো থাকে পাঁচটি খুদে পাপড়ির একটি তারা। ফাঁকে ফাঁকে আছে পাঁচটি পরাগধানী, যেন সযত্নে বসানো রত্নপাথর, সাদা বা হলুদ; গর্ভকেশরযুক্ত। ফলগুলো সরু, লম্বা; আগা ও গোড়া সুচালো, সরু সরু পক্ষল বীজে ভরাট, ১ ফুট বা ততোধিক দীর্ঘ। বীজগুলো ঈষৎ স্বচ্ছ পাখনা ঘেরা এবং সে কারণেই উড়ূক্কু ও দূরগামী। এ গাছ ছায়াঘন নয় এবং শিকড় অগভীর হওয়ায় ঝড়ে উপড়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই পথতরুর অনুপযোগী। বীজ ছাড়াও গাছের শিকড় থেকে গজানো চারা (বেশ দূরে) থেকেই বংশবিস্তার। কাঠ নরম, হালকা, হলুদ, মসৃণ এবং আসবাব ও সজ্জাকার্যের উপযোগী। ইন্দোনেশিয়ায় বাকলের তেতো রস থেকে জ্বরের ওষুধ বানানো হয়। এক সময় গাছের বাকল থেকে শিশি বা ছোট বোতলের কর্ক বানানো হতো। এ কারণে কর্কগাছ নামেও পরিচিত।