কঠিন, তবুও আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে বিশেষজ্ঞদের অভিমত

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২১

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের মধ্যস্থতায় মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন বৈঠক নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী হতে চান না বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, মিয়ানমারে যারা এখন ক্ষমতায়, তাদের কথায় আস্থা রাখা কঠিন। তারা কথা দিয়ে কথা রাখে না, এটা বারবারই দেখা গেছে। ফলে তারা কোনো বিষয়ে একটা আশ্বাস দিলেই আস্থা রাখা যাবে না। তবে দীর্ঘদিন পর মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা শুরু এবং চীনের মধ্যস্থতাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

কূটনীতিকদের মতে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কূটনীতি অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছিল। রোহিঙ্গা সংকট ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশ উদ্বিগ্ন হলেও মিয়ানমারের কাছে একেবারেই গুরুত্ব নেই- এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকেও এ সংকট নিয়ে উচ্চবাচ্য দেখা যাচ্ছিল না। চীন ক্রমাগত মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান স্পষ্ট করায় এবং প্রতিবেশী ভারত ও বন্ধু রাষ্ট্র জাপানের শীতল ভূমিকাও হতাশা বাড়িয়ে দিচ্ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের মধ্য দিয়ে আবার রোহিঙ্গা সংকট আলোচনার টেবিলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল- এটাই এ বৈঠকের বড় অর্জন।

মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সম্মত হওয়া এবং চীনের এ সংকটকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বের দাবি রাখে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

বাংলাদেশের একজন সাবেক সচিব বলেন, রোহিঙ্গা সংকট ইস্যু নিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে শীর্ষ অবস্থানে যাওয়ার প্রত্যাশা করা চীন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক ধরনের ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে। সেটা থেকে উত্তরণের জন্যই চীন এখন এ সংকট সমাধানে নিজেদের অবস্থান প্রমাণের চেষ্টা করছে। তারই একটি প্রকাশ এই ত্রিপক্ষীয় বৈঠক। এ কারণেই এ বৈঠককে তাৎপর্যপূর্ণ বলতে হবে।

মঙ্গলবারের বৈঠকের পর পররাষ্ট্র সচিব রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর ব্যাপারে বাংলাদেশ 'কশাসলি অপটিমিস্টিক (সতর্কভাবে আশাবাদী)' বলে জানান। বৈঠকে আসছে ফেব্রুয়ারি-মার্চে বাংলাদেশ-মিয়ানমার ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকসহ তিনটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। তবে বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গ্রাম বা অঞ্চল ভিত্তিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর প্রস্তাবে মিয়ানমার অসম্মতি জানায়। দেশটি তাদের যাচাই-বাছাই করা ৪২ হাজার রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকে একটি দলকে প্রথম পাঠানোর কথা বলে।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ওয়ালিউর রহমান সমকালকে বলেন, কূটনীতিতে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আলাপ-আলোচনা এবং বোঝাপড়া করতে করতেই একটা ইতিবাচক ফল আসবে- এটাই কূটনীতিতে প্রচলিত। এই বৈঠকটি সেভাবেই বিবেচনা করা ভালো।

তিনি বলেন, মিয়ানমার অসত্য কথা বলে, কথা দিয়ে কথা রাখে না- এটা বারবারই দেখা গেছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে হতাশার মূল জায়গাটাও এখানেই। কিন্তু তার পরও আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই।

ওয়ালিউর রহমান মনে করেন, অনেক দিন পর একটা বৈঠকের মধ্য দিয়ে আবার আলোচনা শুরু হলো। সামনে আরও কয়েকটি বৈঠক হবে। সেসব বৈঠক থেকে আরও কিছু অগ্রগতি হয়তো হবে। তবে দেখার বিষয়, চীন কী করছে। কারণ চীন যত এ সংকট সমাধানে এগিয়ে আসবে, মিয়ানমারও তত সমাধানের পথে আসবে, প্রত্যাবাসন তত দ্রুত হবে।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মোহাম্মদ তৌহিদ হোসেন বলেন, বৈঠকের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর বিষয়ে সতর্ক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, এটাই সঠিক বক্তব্য। কারণ প্রত্যাবাসন শুরু নিয়ে চট করে আশাবাদী হওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। আবার হতাশও হওয়া যাবে না।

তিনি বলেন, চীনের মধ্যস্থতা এই বৈঠকের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। এ সংকট নিয়ে চীন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খুব একটা সুখকর অবস্থানে নেই। এ কারণে চীন হয়তো একটা কিছু করতে চাচ্ছে। তাই মধ্যস্থতার ভূমিকায় এসেছে। এ কারণেই এ বৈঠকটিকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করতে হয়।