মুজিববর্ষের উপহার

আপন ঠিকানা

শনিবার ৬৯ হাজার ভূমিহীন পরিবারকে ঘর হস্তান্তর করবেন প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০২১

অমরেশ রায়

আপন ঠিকানা

পাবনার ৯ উপজেলায় এক হাজার ৮৬ গৃহহীন পাচ্ছেন এ রকম পাকা ঘর - সমকাল

নদীভাঙনে নিঃস্ব ও গৃহহীন খুলনার রূপসা উপজেলার আঠারোবেকী নদীর তীরে ঝুপড়িতে বসবাসকারী ৮০ বছরের ইনুচ শেখের চোখেমুখে এখন খুশির ঝিলিক। খুশির আভা ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার বুরাইচ ইউনিয়নের জয়দেবপুরের ৮৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ আলতাফ ফকিরের চোখেমুখেও। জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার হিসেবে জমিসহ ঘর পাচ্ছেন তারা।

শুধু খুলনার ইনুচ শেখ কিংবা ফরিদপুরের আলতাফ ফকির নন; মুজিববর্ষ উপলক্ষে সারাদেশে গৃহহীন ভূমিহীন এমন প্রায় ৯ লাখ পরিবার পাবে স্থায়ী ঠিকানা। আগামী শনিবার প্রথম পর্যায়ে ৬৯ হাজার পরিবারকে ঘর হস্তান্তর করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পর্যায়ক্রমে অন্যদেরও জমি ও সুদৃশ্য রঙিন টিনশেডের পাকা গৃহনির্মাণ করে দেওয়া হবে।

খুলনার ইনুচ শেখ পাচ্ছেন ২ শতাংশ জমিসহ একটি নান্দনিক পাকা ঘর। নদীর তীরে রাস্তার পাশে খাসজমিতে ঝুপড়ি বেঁধে স্ত্রী রোকেয়া বেগমকে (৬৫) নিয়ে ৩০ বছর ধরে মানবেতরভাবে জীবন কাটাচ্ছেন তিনি। তাদের ছয় সন্তানের মধ্যে চার মেয়ে আর দুই ছেলেই থিতু হয়েছে আলাদা সংসারে। ইনুচ শেখ ও রোকেয়া বেগম এখন অধীর হয়ে অপেক্ষা করছেন নতুন স্থায়ী ঠিকানায় উঠবেন বলে।

অধীর হয়ে অপেক্ষা করছেন ফরিদপুরের আলতাফ ফকিরও। চার ছেলে ও এক মেয়ের জনক তিনি। মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে থাকেন। ছেলেরা কামলা খেটে কোনোমতে দিন কাটান। কোনোমতে ছাপরাঘরে বসবাস করেন তারা। সমকালকে বলছিলেন তিনি, 'শেখ সাব আমাগো দ্যাশটা স্বাধীন করছে। শেখের বেটি আমাগো জন্নি ঘর বানাই দিতেছে। শেখের বেটিরে আল্লায় বাঁচায়ে রাহুক।'

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে সরকার ঘোষিত চলমান 'মুজিববর্ষে' সারাদেশের ৬৪টি জেলার তৃণমূল পর্যায়ে তালিকা করে ছিন্নমূল ও দুস্থ পরিবারকে এ ধরনের বিশেষ ঘর দেওয়া হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার হিসেবে। ৯ লাখ পরিবারের মধ্যে ২৩ জানুয়ারি শনিবার জমি ও ঘর হস্তান্তর করা হবে প্রথম ধাপের ৬৯ হাজার ৯০৪টি গৃহহীন পরিবারকে। এদিন সকাল সাড়ে ১০টায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে হস্তান্তর কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। 'মুজিববর্ষ' উপলক্ষে 'আশ্রয়ণের অধিকার, শেখ হাসিনার উপহার' স্লোগান সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর আওতায় এসব ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর প্রকল্প পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মাহবুব হোসেন সমকালকে জানান, প্রথম ধাপে আগামী শনিবার ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ৬৬ হাজার ১৮৯টি পরিবারকে একক গৃহ হস্তান্তর করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে ৭৪৩টি ব্যারাকে তিন হাজার ৭১৫ পরিবারকে পুনর্বাসন করা হবে। অর্থাৎ এই ধাপে মোট ৬৯ হাজার ৯০৪টি পরিবারকে ঘর দেওয়া হচ্ছে।

তিনি জানান, এ ছাড়া আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই বরাদ্দ করা হবে আরও এক লাখ একক ঘর। এ জন্য দুটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। একটি তালিকা করা হয়েছে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের। এ তালিকায় রয়েছে দুই লাখ ৯৩ হাজার ৬১টি পরিবার। দ্বিতীয় তালিকায় রয়েছেন জমি আছে কিন্তু ঘর নেই অথবা জরাজীর্ণ ঘর রয়েছে এমন পাঁচ লাখ ৯২ হাজার ২৬১টি পরিবার।

সরকারের হিসাবমতে, সারাদেশে আট লাখ ৮৫ হাজার ৬২২টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে এক লাখ ২৯ হাজার ১৯৭, ময়মনসিংহ বিভাগে ৩৬ হাজার ৩, চট্টগ্রাম বিভাগে এক লাখ ৬১ হাজার ২৯৭, রংপুর বিভাগে এক লাখ ৮৩ হাজার ৮৩৪, রাজশাহী বিভাগে ৯৬ হাজার ৫০৪, খুলনা বিভাগে এক লাখ ৪২ হাজার ৪১১, বরিশাল বিভাগে ৮০ হাজার ৫৮৪ এবং সিলেট বিভাগে ৫৫ হাজার ৬২২টি গৃহহীন পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে জমি ও ঘর নেই, এমন পরিবারের পাশাপাশি ১০ শতাংশ জমি আছে, কিন্তু ঘরদোর জরাজীর্ণ এমনও পরিবার রয়েছে। মুজিববর্ষে এই প্রায় ৯ লাখ পরিবারই পর্যায়ক্রমে গৃহ পাচ্ছেন, যার সূচনা ঘটছে আগামী শনিবার।

গত বছরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছিলেন, মুজিববর্ষে দেশে কোনো মানুষ গৃহহীন থাকবে না। সরকার সব ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষকে ঘর তৈরি করে দেবে। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা অনুযায়ী শুরু হয় সারাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে গৃহহীন-ভূমিহীনদের তালিকা তৈরি করে বাড়ি নির্মাণের মহাযজ্ঞ। চলতি বছরের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঘোষিত মুজিববর্ষের মধ্যেই এসব ঘর নির্মাণের কাজ শেষ করতে চায় সরকার।

গৃহহীন ও ভূমিহীনদের স্থায়ী ঠিকানা দেওয়ার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প প্রথম পর্যায়ের ৬৬ হাজার ১৮৯টি একক গৃহনির্মাণের সামগ্রিক কার্যক্রম সমন্বয় করছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে গঠিত কমিটির মাধ্যমে একক গৃহগুলো নির্মাণ করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় ঘরের পাশাপাশি ২ শতাংশ খাসজমিও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় নির্মিত সব গৃহের নকশা হচ্ছে একই রকম। প্রতিটি গৃহে ইটের দেয়াল, কংক্রিটের মেঝে এবং রঙিন টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি দুটি করে শোয়ার ঘর, একটি রান্নাঘর, টয়লেট এবং সামনে খোলা বারান্দা থাকবে। গৃহপ্রতি ব্যয় হয়েছে এক লাখ ৭১ হাজার টাকা। এ হিসাবে গৃহহীনদের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে এক হাজার ১৬৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।

আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে ২৪ হাজার ৫৩৮টি পরিবারের জন্য মোট বরাদ্দ ৪১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৩৮ হাজার ৫৮৬টি গৃহ বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৫৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে গুচ্ছগ্রাম দ্বিতীয় পর্যায়ের সিভিআরপি প্রকল্পের আওতায় তিন হাজার ৬৫টি গৃহ বরাদ্দ করা হয়েছে। এই খাতে বরাদ্দ ৫২ কোটি ৪১ লাখ টাকা। অতিরিক্ত পরিবহন বাবদ বরাদ্দ (প্রতিটি ঘরের জন্য চার হাজার টাকা হিসাবে) মোট ২৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এ ছাড়া সারাদেশের সব উপজেলায় জ্বালানি বাবদ বরাদ্দ ১০ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

প্রথম ধাপের এই ৬৬ হাজার ১৮৯টি গৃহনির্মাণের কাজ নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। অবশ্য চলতি মুজিববর্ষের মধ্যে আগেই ২১ জেলার ৩৬টি উপজেলায় ৪৪টি প্রকল্প গ্রামে ৭৪৩টি ব্যারাক নির্মাণের মাধ্যমে তিন হাজার ৭১৫টি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে।

যেসব জেলায় গৃহহীন ও ভূমিহীনদের ঘর দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে ফরিদপুর অন্যতম। সেখানে মোট এক হাজার ৪৭০টি ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন ঘরগুলোর সুবিধাভোগী নির্বাচন, কবুলিয়াত সম্পাদন এবং জেলা টাস্কফোর্সের মাধ্যমে ঘর বরাদ্দের আনুষ্ঠানিকতা এরই মধ্যে শেষ করেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এসব ঘর হস্তান্তর করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে স্থানীয় প্রশাসন।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার এ প্রসঙ্গে বলেন, প্রতিটি ঘর নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। ঘরের ভেতর স্যানিটেশন, ইলেকট্রিসিটিসহ নাগরিক জীবনের নূ্যনতম সুবিধাগুলোও নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন, জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসহায় ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের জন্য উপহার হিসেবে এসব আশ্রয়স্থল করে দিচ্ছেন। এই কাজ বাস্তবায়নে উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নিরলস কাজ করছেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া বলেন, সম্পূর্ণ সরকারি খরচে এত বিপুলসংখ্যক ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষকে জমির মালিকানাসহ পাকা বাড়ি নির্মাণ করে একটি স্থায়ী ঠিকানা দেওয়ার এমন নজির বিশ্বের আর কোথাও নেই। সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে মুজিববর্ষে বিশ্বে মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার এ উদ্যোগ দারিদ্র্য বিমোচনেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।