চসিক নির্বাচন

উৎসবের নগরী চট্টগ্রাম

বিক্ষিপ্ত কয়েকটি ঘটনা উত্তেজনা বাড়ালেও প্রচার চলছে সমানে

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০২১

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

উৎসবের নগরী চট্টগ্রাম

বুধবার পাথরঘাটায় আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরীর গণসংযোগ (বাঁয়ে), পাহাড়তলীতে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেনের প্রচারে ছিলেন কেন্দ্রীয় নেতারা -সমকাল

মেয়র-কাউন্সিলর মিলিয়ে ২৩৭ প্রার্থীর বিরামহীন প্রচারে সরগরম বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। রাজপথ থেকে অলিগলি এখন পোস্টারে একাকার। ভোটারদের নজর কাড়তে ৪১ ওয়ার্ডের প্রতিটিতে মাইকিং হচ্ছে নানা রঙে, নানা ঢঙে। প্রার্থীর গুণগান গাইতে কেউ ব্যবহার করছেন জারি গানের সুর, কেউ বেছে নিয়েছেন চট্টগ্রামের জনপ্রিয় আঞ্চলিক গান। প্রার্থীর নামে বরাদ্দ হওয়া প্রতীককেও নানা বর্ণে বর্ণিল করে উপস্থাপন করা হচ্ছে মিছিলে, মিটিংয়ে। প্রার্থীদের অনুসারীরা নানা দলে ভাগ হয়ে যাচ্ছেন ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে। কেউ গিয়ে প্রার্থীর নামে সালাম দিচ্ছেন। কেউবা ভোটার নাম্বার দিয়ে আসছেন আগাম। প্রার্থীদের কেউ করছেন উঠান বৈঠক। কেউবা ছুটছেন মার্কেটে, দোকানে দোকানে। মেয়রের পাশাপাশি ৪১ জন সাধারণ কাউন্সিলর ও ১৪ জন সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর নির্বাচন করতে এবার চট্টগ্রামে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন ১৯ লাখ ৩৮ হাজার ৭০৬ জন।

৪১ ওয়ার্ডের ৩২টিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় চট্টগ্রামের ভোটের মাঠে প্রাণ যেমন আছে, আছে উত্তাপও। বিক্ষিপ্ত দুই-একটি ঘটনায় ছন্দপতন হলেও বড় ধরনের কোনো সহিংসতা হয়নি এখনও। পোস্টার, মাইকিং, মিছিল, মিটিং ইত্যাদি বন্দরনগরীকে পরিণত করেছে উৎসবের নগরীতে।

পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সভাপতি ও ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সিকান্দর খান বলেন, 'ভোটকে উৎসবে পরিণত করতে প্রচারের অবশিষ্ট দিনগুলোতেও সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। প্রার্থীর যেকোনো অভিযোগ আমলে নিয়ে তা সমাধান করতে হবে নিরপেক্ষ ও কঠোর অবস্থানে থেকে।'

একই প্রত্যাশা ভোটারদেরও। এবারে প্রথম ভোটার হওয়া চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী মারিয়া তাবাসসুম বলেন, 'ভোটের দিন উৎসবমুখর রাখতে ভোটের আগের সময়টুকু খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রার্থীদের কেউই যাতে আচরণবিধি লঙ্ঘন না করেন, সে ব্যাপারে মনোযোগী হতে হবে প্রশাসনকে। নির্বাচনী পরিবেশ এমন উৎসবমুখর রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও ভোট পর্যন্ত তৎপর থাকতে হবে।'

নির্বাচনী প্রচারে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে মাঠে নামানো হয়েছে ১৪ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে। প্রার্থীদের কে কোথায় আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন, তা সরেজমিন গিয়ে দেখছেন তারা। এছাড়া ভোটের আগে-পরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নতুন করে ২০ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গতকাল নির্বাচন কমিশনের উপ-সচিব (আইন) আফরোজা শিউলী স্বাক্ষরিত এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ভোটের আগে দু'দিন ও ভোটের পরের দু'দিন দায়িত্ব পালন করবেন তারা। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে গণসংযোগের সময় পুলিশ পাহারাও দেওয়া হচ্ছে চট্টগ্রামে মেয়র পদের প্রধান দুই প্রার্থীকে।

এদিকে নগরীর পাঁচটি থানার ওসি পরিবর্তন করা হয়েছে। এর মধ্যে একজন ওসির বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ না থাকার অভিযোগ এনেছিলেন এক কাউন্সিলর প্রার্থী। আচরণবিধি লঙ্ঘন করায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা এখন পর্যন্ত পাঁচজন কাউন্সিলর প্রার্থীকে সতর্ক ও জরিমানা করেছেন। নির্বাচনে সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য কমাতে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করছে পুলিশ। বিদ্রোহী প্রার্থী থাকা ওয়ার্ডগুলোতে কঠোর অবস্থানে আছে প্রশাসন। একই ওয়ার্ডের একই পয়েন্টে একাধিক কাউন্সিলর প্রার্থী যাতে গণসংযোগ চালাতে না পারেন, সেজন্য সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিচ্ছেন থানার ওসিরা।

চসিক নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান বলেন, 'নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, তত উত্তাপ বাড়ছে। প্রার্থীদের মৌখিক ও লিখিত যে অভিযোগ আমরা পাচ্ছি তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করছি। আচরণবিধি পর্যবেক্ষণ করতে ১৪ জন ম্যাজিস্ট্রেটকে আরও তৎপর হতে বলেছি। উৎসবের এই আমেজ ধরে রাখতে প্রশাসনকেও ঢেলে সাজানো হচ্ছে। একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে প্রার্থী এবং ভোটারদের সহযোগিতা চাই আমরা।'

আওয়ামী লীগের প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, 'প্রার্থীরা স্বাধীনভাবে প্রচার চালানোর সুযোগ পাওয়ায় উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে চট্টগ্রামে। নির্বাচন কমিশনও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করছে। অহেতুক সমালোচনা না করে ভালোকে ভালো বলার মানসিকতা যদি পোষণ করেন সবাই, তবে এই নির্বাচন সারাদেশের জন্য দৃষ্টান্ত হবে।'

বিদ্রোহী প্রার্থী ঘিরে উত্তাপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'ভোটের মাঠে বিক্ষিপ্ত ঘটনা উদাহরণ হতে পারে না। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আনলে মানুষের মধ্যে স্বস্তিই দেখা যাবে বেশি। পক্ষ-প্রতিপক্ষ আছে বলেই উৎসবমুখর পরিবেশ আছে। এই নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতাপূর্ণ হবে।'

বিএনপি দলীয় মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, 'ভোটের মাঠ উৎসবমুখর করতে হলে একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দরকার, যাতে সব প্রার্থী সমানভাবে প্রচার চালাতে পারেন। বেশ কয়েকটি ঘটনায় আমাদের প্রচার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তারপরও আমরা আশাবাদী বাকি দিনগুলোতে আরও নিরপেক্ষ আচরণ করবে নির্বাচন কমিশন। ভোটের মাঠ উৎসবমুখর রাখতে হলে আমাদের সবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকতে হবে। ভোটারদের মনে আতঙ্ক তৈরি হয়, এমন কিছু করা যাবে না। ঘটনা যাই ঘটেছে, সেগুলোকে আমরা বিক্ষিপ্ত ভাবতে চাই, ভুলে যেতে চাই। হাঁটতে চাই একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করে দৃষ্টান্ত স্থাপনের পথে।'

উৎসবে ছন্দপতন ঘটাচ্ছে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা :গতকাল বিকেলে বাকলিয়ার বলিরহাট এলাকায় নির্বাচনী প্রচারের সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের সংঘর্ষে চারজন আহত হয়েছেন। তারা হলেন- ১৮ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক সোহান এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক ওয়াজেদ। বিএনপির আহতরা হলেন- ছাত্রদল নেতা ইউনুস ও নুরুদ্দিন।

বিএনপির অভিযোগ- গত শনিবার পূর্ব বাকলিয়ায় প্রচারের কাজে ব্যবহূত মাইক ভাঙচুর করে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ছেলেরা। একই দিন বাগমনিরামে বিএনপি প্রার্থীর পোস্টার ছিঁড়ে ফেলে সরকারদলীয় লোকজন। বহদ্দারহাট বাড়ইপাড়া এলাকায় গত সোমবার বিএনপির কাউন্সিলর প্রার্থী হাসান লিটনের গণসংযোগে হামলা হয়। এতে আহত হন যুবদল নেতা নুরুল আমিন, তৌহিদুল আলম ও মোহাম্মদ রেজু। তারা মাথায় গুরুতর আঘাত পান।

পাল্টা অভিযোগ আছে আওয়ামী লীগেরও। তাদের দাবি- বিএনপির হামলায় এখন পর্যন্ত ছাত্রলীগ ও যুবলীগের এক ডজনেরও বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।