নিয়ম অনুযায়ী অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসৃজন কর্মসূচির কাজ শেষ হওয়ার কথা ৪০ দিনের মধ্যে। কিন্তু 'করিৎকর্মা' প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নির্ধারিত সময়ের আগেই তা সম্পন্ন করেছেন। খাতা-কলমে কাজ সম্পন্ন করার সময় সঠিক দেখালেও কাজ হয়েছে ৩১ দিন। এতে বাকি বড় অঙ্কের টাকা যাচ্ছে প্রকল্প কর্মকর্তার পকেটে। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় নন-ওয়েজ ফান্ডের অর্থও ব্যয় করা হয়নি। খুলনার কয়রা উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে ৩০টি প্রকল্পে অর্থ আত্মসাতের এ ঘটনা ঘটেছে।

অবশ্য উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সাগর হোসেন সৈকতের দাবি, প্রকল্পে ৩৯ দিন কাজ হয়েছে। পরে বলেন, "এ উপজেলায় নতুন যোগদান করার পর 'অনেক কিছ'ু সম্পর্কে বুঝতে একটু দেরি হচ্ছে। আশা করছি, ভবিষ্যতে এমন ভুল হবে না।" তাহলে প্রকল্পের এই আট দিনের টাকার কী হবে, জানতে চাইলে তিনি এ প্রতিবেদককে অফিসে এসে আলাপ-আলোচনা করতে বলেন।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসৃজন কর্মসূচির আওতায় প্রথম পর্যায়ে কয়রা উপজেলায় ২৫৩৩ জন উপকারভোগীর ৪০ দিনের মজুরি হিসাবে ২ কোটি ২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ ছাড়া উপকারভোগীদের মজুরির বাইরে 'নন-ওয়েজ' ফান্ডের আরও ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের ৩০টি প্রকল্পে এসব উপকারভোগীর দৈনিক ২শ টাকা মজুরি হিসাবে কাজ করানো হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী উপকারভোগীদের জব কার্ডের মাধ্যমে সপ্তাহ শেষে প্রত্যেকের নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা তুলে নেওয়ার কথা। খাতা-কলমে গত ২৪ অক্টোবর এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে ৩০ ডিসেম্বর শেষ দেখানো হয়েছে। সে অনুযায়ী প্রথমে উপকারভোগীদের ২৪ দিন, পরে ১৫ দিন মিলিয়ে মোট ৩৯ দিনের মজুরি ছাড় করা হয়। অথচ শ্রমিকদের দাবি, ১৫ ডিসেম্বর কাজ শেষ করা হয়েছে। ৩১ দিন কাজ হওয়ায় পরে ছাড় হওয়া ১৫ দিনের মজুরির মধ্যে উপকারভোগীরা পাবেন সাত দিনের টাকা। বাকি আট দিনের ৪০ লাখ ৫২ হাজার ৮০০ টাকা যাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও সংশ্নিষ্টদের পকেটে। কাজ হয়নি দেখিয়ে বাকি এক দিনের টাকা ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

এদিকে উপকারভোগীরা জানিয়েছেন, তারা এ কর্মসূচির আওতায় গত ৩১ অক্টোবর থেকে মোট ৩১ দিন কাজ করেছেন। এ পর্যন্ত তাদেরকে ১৮ দিনের মজুরি পরিশোধ করা হয়েছে। তাদের দৈনন্দিন কাজের মজুরি হিসাবে ২শ টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও অনেকেই তা পাননি। তাদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন, ১৮ দিনের মজুরি হিসাবে ৩৬০০ টাকার জায়গায় ২৪০০ টাকা দেওয়া হয়েছে।

উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নে এ প্রকল্পের আওতায় ২০৮ জন উপকারভোগী কাজ করেছেন। ওই প্রকল্পের উপকারভোগী আরতি মুন্ডা বলেন, 'আমরা মোটমাট ৩১ দিন করতি পারিছি। এর মধ্যি মেম্বার আমাগে ২৪শ টাকা দেছে। বাকি টাকা চাতি গেলি আজ না কাল করে ঘোরাচ্চে।'

একই প্রকল্পের আরেক উপকারভোগী পানপতি মুন্ডা বলেন, 'সরকার আমাগের জন্যি কাজের মাধ্যমে যে টাকার বেবস্তা করেচে, তার বেশিরভাগ টাকা থেকে আমরা বঞ্চিত হই।'

দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ইউপি সদস্য রবিউল ইসলাম বলেন, 'আমার প্রকল্পে ৬০ জন শ্রমিক ৪০ দিন কাজ করেছে। তাদের টাকা তুলতে বেগ পেতে হয়। অথচ কয়রা সদর ইউনিয়নে মাত্র ২৫ দিন কাজ হয়েছে; তাদের বেলায় কারও কোনো অভিযোগ নেই।' যদিও খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, তার প্রকল্পে ৭৫ জন উপকারভোগীর কাজ করা কথা। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা করার কথা বলেন।

বাগালি ইউনিয়ন পরিষদের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, তাদের ইউনিয়নে যে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হয়েছে, তার প্রতিটিতে উপকারভোগীর সংখ্যা কম রয়েছে। ওই প্রকল্পের উপকারভোগীরা জানিয়েছেন, তারা কেউ ৩১, কেউ ৩০ আবার কেউ ২৫ দিন কাজ করেছেন।

একই অভিযোগ পাওয়া গেছে কয়রা সদরসহ অন্যান্য ইউনিয়নের প্রকল্পেও। প্রতিটি প্রকল্পে উপকারভোগীর সংখ্যা এবং দিন কমিয়ে কাজ হলেও খাতা-কলমে সব ঠিক রাখা হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন এলাকায় সাইনবোর্ড থাকার কথা থাকলেও কোথাও তা দেখা যায়নি। এ ছাড়া উপকারভোগী কারও কাছে জব কার্ড পাওয়া যায়নি। মহারাজপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের একটি প্রকল্পের সভাপতি বলেন, উপকারভোগীদের মজুরির টাকা আত্মসাৎ করতে প্রকল্পের মেয়াদ কমানো হয়েছে। প্রতিবাদ করেও লাভ হচ্ছে না।

এ বিষয়ে কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, 'প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার ব্যাপারে অনেকেই অভিযোগ করেছেন এবং এর সত্যতা পেয়েছি। তাকে ডেকে সতর্ক করা হয়েছে। তিনি ভুল স্বীকার করে ভবিষ্যতে এমন করবেন না বলে জানিয়েছেন। বাকি টাকা উপকারভোগীদের মধ্যে বণ্টন করে দিতে বলা হয়েছে।'













মন্তব্য করুন