রাজধানী ঢাকা প্রায়ই বিশ্বের দূষিত বাতাসের শহরের তালিকায় শীর্ষে থাকে। শীত আসার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার বায়ুর গুণগত মান আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। বাতাসে বাড়ছে বিপদ। এরই মধ্যে রাজধানীর বাতাসে দূষিত বস্তুকণার পরিমাণ এতই বেড়েছে যে, তা 'খুবই অস্বাস্থ্যকর' থেকে 'বিপজ্জনক' হয়ে উঠেছে।

বিশ্বের বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণকারী যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা এয়ার ভিজুয়ালের পর্যবেক্ষণ (এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স) অনুযায়ী, গতকাল শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে রাজধানীর বায়ুর মান ছিল ২৩৫, যাকে বায়ুমান সূচকে অস্বাস্থ্যকর বলা হয়। বায়ুদূষণের দিক থেকে গতকাল দিনভর বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। সকাল ৯টা থেকে বায়ুর মান ওঠানামা করলেও গতকাল সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত টানা ১০ ঘণ্টা বায়ুদূষণে ঢাকা শীর্ষে ছিল। প্রথম অবস্থানে ছিল পাকিস্তানের লাহোর, তৃতীয় অবস্থানে ভারতের দিল্লি। চতুর্থ ও পঞ্চম অবস্থানে ছিল ভিয়েতনামের হ্যানয় শহর। তবে সন্ধ্যা ৭টার দিকে ঢাকার বায়ুর মান ২১৩-তে নেমে আসে। তখন ঢাকার অবস্থান ছিল চতুর্থ আর হ্যানয় শহর উঠে যায় শীর্ষে। এ সময় হ্যানয়ের বায়ুর মান ছিল ২৭৭। এয়ার ভিজুয়ালের হিসাবে, বায়ুর মান শূন্য থেকে ৫০ থাকলে ওই স্থানের  বায়ু ভালো। আর মান ২০০ থেকে ৩০০-এর মধ্যে থাকা মানে খুবই অস্বাস্থ্যকর। বায়ুর মান ৩০০-এর বেশি থাকা মানে ওই স্থানের বায়ু বিপজ্জনক। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের হিসাবে, ঢাকার বায়ুর মান গত শুক্রবার রাত ৯টার দিকে ৩৩২ উঠেছিল। এর আগে গত ১০ জানুয়ারি ঢাকায় দূষণের মাত্রা উঠেছিল ৫০২-এ। এদিন স্বাভাবিকের তুলনায় ছয় গুণ দূষিত বায়ু গ্রহণ করতে হয়েছে রাজধানীবাসীকে।

সাধারণত প্রতি বছর নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে শীত পড়তে শুরু করলে ঢাকার বায়ু অস্বাস্থ্যকর হতে শুরু করে। শীতে কুয়াশার কারণে বাতাসে জলীয় বাষ্প বেড়ে যায়। আর তাতে জমা হয় মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর সূক্ষ্ণ বস্তুকণা।

বায়ুদূষণ নিয়ে কাজ করা গবেষকরা বলছেন, ঢাকার বায়ুদূষণের অন্যতম উৎস ধুলাবালি। আরেকটি উৎস হচ্ছে কয়লা ও জৈব জ্বালানি পোড়ানো, ইটভাটা, শিল্পকারখানার ধোঁয়া, যানবাহনের ধোঁয়া এবং সড়ক ও ভবন নির্মাণসামগ্রী থেকে তৈরি ধুলা। এসব বাতাসে ক্ষুদ্র কণা ছড়ায়, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছয় ধরনের পদার্থ ও গ্যাসের কারণে ঢাকায় দূষণের মাত্রা সম্প্রতি অনেক বেড়ে গেছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ধূলিকণা অর্থাৎ পিএম ২ দশমিক ৫-এর কারণে ঢাকায় দূষণ অতিমাত্রায় বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠছে।

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের একটি জরিপ বলছে, গত বছর জানুয়ারি মাসের তুলনায় এবার ১২ শতাংশ বায়ুদূষণ বেড়েছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ১৫ শতাংশ বেশি দূষণ ছিল।

মানবস্বাস্থ্য বিবেচনায় বায়ুদূষণ রোধে সংশ্নিষ্টদের জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, শহরের চারপাশে ইটভাটা, বড় প্রকল্পের কাজ, নির্মাণাধীন ভবনের কাজ, যানবাহনের ধোঁয়ায় ঢাকার বাতাস বিষে পরিণত হয়েছে। ঢাকায় বায়ুদূষণের কারণে স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা জারির পরিস্থিতি তৈরি হলেও এখনও কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না।

মন্তব্য করুন