খুবির এক শিক্ষক বরখাস্ত অপসারণের সিদ্ধান্ত আরও দু'জনকে

প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২১

খুলনা ব্যুরো ও খুবি প্রতিনিধি

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে একাত্মতা পোষণকারী খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) এক শিক্ষককে চাকরি থেকে বরখাস্ত ও দু'জনকে অপসারণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গতকাল শনিবার বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের ২১২তম সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। তাদের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ এনেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

বরখাস্ত হওয়া শিক্ষক হলেন বাংলা ডিসিপ্লিনের সহকারী অধ্যাপক মো. আবুল ফজল। আর একই ডিসিপ্লিনের প্রভাষক শাকিলা আলম এবং ইতিহাস ও সভ্যতা ডিসিপ্লিনের প্রভাষক হৈমন্তী শুক্লা কাবেরীকে অপসারণ করা হয়েছে। অবশ্য তিন শিক্ষকই প্রশাসনের এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক খান গোলাম কুদ্দুস জানান, ১৮ জানুয়ারি সিন্ডিকেটের ২১১তম সভায় ওই তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তির সিদ্ধান্ত হয়। তবে নিয়মানুযায়ী রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে কেন তাদের বরখাস্ত ও অপসারণ করা হবে না জানতে চেয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য প্রত্যেককে চিঠি দেওয়া হয়। অভিযুক্ত তিনজন নির্ধারিত সময় ২১ জানুয়ারি দুপুরের মধ্যে চিঠির জবাব দেন। গতকালের সিন্ডিকেট সভায় তিন শিক্ষকের আত্মপক্ষ সমর্থনের জবাব নিয়ে দীর্ঘ পর্যালোচনা করা হয়। শেষে সিন্ডিকেট একজনকে বরখাস্ত ও দু'জনকে অপসারণের সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়।

এ বিষয়ে বরখাস্ত হওয়া সহকারী অধ্যাপক আবুল ফজল বলেন, ১৮ জানুয়ারি সিন্ডিকেটের সভায় আমাদের চূড়ান্তভাবে শোকজ করা হয়। সভা শেষ করে ওই রাতেই কার্যবিবরণী প্রস্তুত করা হয়। এরপর রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত শোকজের চিঠি পরদিন ভোরে, অর্থাৎ ১৯ জানুয়ারি সকালে আমাদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। চিঠিতে ২১ জানুয়ারি দুপুর ২টার মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়। আমরা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেয়েছি মাত্র আড়াই দিন।

আবুল ফজল অভিযোগ করেন, তারা উপাচার্যের ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার। শাস্তি দেওয়ার পুরো বিষয়টি আগে থেকেই নির্ধারণ করা ছিল। যার কারণে তদন্ত কমিটি গঠন থেকে শুরু করে কোনো কার্যক্রমেই তাদের কোনো সহযোগিতা করা হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদন চেয়ে লিখিত আবেদন করেছিলেন, সেটাও তাদের দেওয়া হয়নি। তিনি জানান, সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের কাগজপত্র হাতে পেলে তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বেতন-ফি কমানো, আবাসন সংকট সমাধানসহ পাঁচ দফা দাবিতে গত বছরের ১ ও ২ জানুয়ারি ক্যাম্পাসে আন্দোলন করেন শিক্ষার্থীরা। এর প্রায় ৯ মাস পর ১৩ অক্টোবর ওই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে ওই তিন শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তিন দিনের মধ্যে নোটিশের জবাব দিতে বলা হয়। ওই চিঠির জবাব দেওয়া হলে ৯ নভেম্বর আরেকটি কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। ২৩ নভেম্বর ওই চিঠির জবাব দেওয়া হলে পরদিন তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

গত ৭ ডিসেম্বর তিন শিক্ষককে আবারও চিঠি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। চিঠিতে তাদের ১০ ডিসেম্বর হাজির হয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার কাজে সহযোগিতা করার জন্য ডাকা হয়। পরে ১৩ ডিসেম্বর বিশেষ সিন্ডিকেট সভা ডেকে আবারও তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। ১০ জানুয়ারি ওই চিঠির জবাব দেন শিক্ষকরা। এরপর ১৮ জানুয়ারি সিন্ডিকেট সভা করে কারণ দর্শানোর চূড়ান্ত নোটিশ দেয় প্রশাসন।

অনশনরত দুই শিক্ষার্থীর একজন হাসপাতালে :বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে খুবির প্রশাসনিক ভবনের সামনে অনশনরত দুই ছাত্র ইমামুল ইসলাম ও মোবারক হোসেন নোমান আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাদের মধ্যে ইমামুলকে গতকাল সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাম্বুলেন্সে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। গতকাল তাদের শরীরে স্যালাইন দেওয়া হয়। দুপুরে রক্তচাপ কমে গেলে তাদের মাথায় পানি ঢালেন সহপাঠীরা। এদিকে অনশনে সংহতি জানিয়ে গতকাল সন্ধ্যা ৭টা থেকে ওই স্থানে নোমানের সঙ্গে অনশন শুরু করেন ইমামুলের সহপাঠী জোবায়ের হোসাইন।

হাসপাতালে নেওয়ার আগে ইমামুল ও নোমান সমকালকে বলেন, আমরা কোনো অন্যায় করিনি, শিক্ষকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করিনি। শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক ৫ দফা দাবি নিয়ে আন্দোলন করছিলাম। অন্যায়ভাবে আমাদের শিক্ষাজীবন ধ্বংস করা হচ্ছে।

খুবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফায়েক উজ্জামান সমকালকে বলেন, অসদাচরণের অভিযোগে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য তাদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। নোমানের চূড়ান্ত নোটিশের জবাব দেওয়ার জন্য সময়সীমা আগামী ২৭ জানুয়ারি এবং ইমামুলের ৩১ জানুয়ারি। তারা জবাব দিলে খুবির শৃঙ্খলা বোর্ড সভা করে তাদের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

চবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ :চবি সংবাদদাতা জানান, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীকে বহিস্কারের প্রতিবাদে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শিক্ষার্থীরা গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা সংহতি জানান। এ সময় খুবি শিক্ষার্থীদের বহিস্কারাদেশ বাতিল না হওয়া পর্যন্ত লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন বক্তারা। ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শাহ মোহাম্মদ শিহাবের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক মাইদুল ইসলাম, অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী দেওয়ান তাহমিদ, ছাত্র ইউনিয়ন চবি সংসদের সভাপতি গৌরচাঁদ ঠাকুর, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের ঋজু লক্ষ্মী অবরোধ, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের শ্রাবণ চাকমা প্রমুখ।