মোটা অঙ্কের ছিনতাই করাই ওদের 'কাজ'

এখন পর্যন্ত ১৭ জনকে শনাক্ত

প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১     আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১

সাহাদাত হোসেন পরশ

পুরান ঢাকার লালবাগের এতিমখানার ভাতের গলিতে গত ১২ জানুয়ারি হঠাৎ এক ব্যক্তিকে প্রাইভেটকারে তুলে নেওয়া হয়। তিনি সাজ প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজের ম্যানেজার একেএম জাহাঙ্গীর হাসান। উত্তরা ব্যাংকের আজিমপুর শাখা থেকে টাকা তুলে তিনি রিকশায় অফিসে ফিরছিলেন। পরে তাকে সোনারগাঁর মদনপুর এলাকায় রাস্তার পাশে হাত-পা ও চোখ বাঁধা অবস্থায় ফেলে যায়। ছিনিয়ে নেওয়া হয় তিন লাখ ২০ হাজার টাকা।

ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, আশুলিয়া ও সাভার এলাকায় প্রায়ই এমন ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। একটি চক্র প্রায় এক দশক ধরে এমন অপরাধ করছে। সম্প্রতি এ চক্রের হোতা মামুন খানসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। জব্দ করা হয়েছে ছিনতাইয়ে ব্যবহূত তিনটি প্রাইভেটকার। গাড়িতে তোলার পর কেউ বাধা দিলে শ্বাসরোধে হত্যা করতেও তারা পিছপা হয় না।

ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ বিভাগ রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে মামুন ছাড়াও ইমরান হোসেন, মোহাম্মদ আলী, আহাম্মদ আলী, জাহাঙ্গীর আলম, আল আমিনকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশের ভাষ্য, তারা এ ছিনতাই চক্রের সদস্য। এখন পর্যন্ত মামুনের ছিনতাই চক্রে সরাসরি জড়িত এমন ১৭ জনের নাম পাওয়া গেছে।

পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) বিপ্লব বিজয় তালুকদার সমকালকে বলেন, লালবাগের একটি ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে বড় ধরনের ছিনতাই চক্রের খোঁজ পাওয়া গেছে। ঢাকাসহ তিনটি জেলায় তারা সক্রিয়। যারা বড় অঙ্কের লেনদেন করে তাদের টার্গেট করে তারা। চক্রটির আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

পুলিশ জানায়, জাহাঙ্গীরের ঘটনায় করা মামলার তদন্তে গিয়ে প্রায় ৫৭ হাজার মোবাইল নম্বর ও ৭৭টি সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হয়। এর পরই বেরিয়ে আসে ছিনতাই চক্রের কাহিনি। মামুন খান এ চক্রের নেতা। থাকত মিরপুর-১০ নম্বর সেকশনে। ছিনতাইয়ের জগতে গুরু হিসেবে পরিচিত মামুনের রয়েছে আরও অন্তত আটটি ছদ্মনাম। নিজ বলয়ে সে বেশি পরিচিত 'বুলেট বিপ্লব' নামে। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, ব্যাংক-বীমাসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মোটা লেনদেনে জড়িত ব্যক্তিদের টার্গেট করে তুলে নেয় এই চক্র। গাড়িতে তুলে হাত-পা ও চোখ বেঁধে টাকা ছিনিয়ে নেয়। কেউ বাধা দিলে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ছক কষার কারণেই বিপ্লবের দল 'ভিআইপি ছিনতাই পার্টি' হিসেবে পরিচিত।

তদন্তসংশ্নিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, সে শ্যামল, মামুন খান, রোমান, রুমন, ওয়াকিল, ওয়াকিল সুলতান, সুলতান, মোহাম্মদ আলী ও বুলেট বিপ্লব নামে পরিচিত। টার্গেট করা ব্যক্তিদের প্রাইভেটকারে তুলতে কখনও তারা গোয়েন্দা পুলিশ ও র‌্যাবের পরিচয় দেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আদলে তারা জ্যাকেট ও ওয়াকিটকি ব্যবহার করে। এ ছাড়া ভয় দেখাতে খেলনা পিস্তল, ধারালো চাকু ও চাপাতি থাকে। প্রতি অপারেশনের আগে দলের সদস্যদের নতুন মোবাইল ও সিম নম্বর সরবরাহ করে বুলেট বিপ্লব। সব অপারেশনের আগে প্রত্যেক সদস্যকে নতুন ছদ্মনাম দেওয়া হয়। ঘটনায় ভূমিকা অনুযায়ী টাকা ভাগবাটোয়ারা হয়ে থাকে।

পুলিশের দায়িত্বশীল আরেক কর্মকর্তা জানান, মোবাইল নম্বর পোর্টাবিলিটি (এমএনপি) সার্ভিস ব্যবহার করে এক অপারেটরের সিম অন্য অপারেটরের সিমে নিবন্ধন করে ছিনতাই চক্রের সদস্যরা। এতে ঘটনার পর প্রযুক্তিগত তদন্তে জড়িতদের শনাক্ত করতে পুলিশের বেগ পেতে হয়। একই সিরিয়ালের সিম একাধিক অপারেটরের কাছ থেকে নেয় তারা। এসব সিম অন্যদের নামে কেনা হয়।

সিসিটিভির ফুটেজ

১২ জানুয়ারি জাহাঙ্গীর হাসান যেভাবে ছিনতাই চক্রের কবলে পড়েন তার সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে। এতে দেখা যায়, বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে নীল শার্ট ও মাথায় টুপি পরা এক ব্যক্তি ব্যাংকের ভেতর ঢুকছে। মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে কাউন্টারের দিকে নজর রাখছিল সে। সাড়ে ৩টার দিকে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বের হন জাহাঙ্গীর। তখনও মোবাইল ফোনে কথা বলছিল সন্দেহভাজন ওই ব্যক্তি। জাহাঙ্গীর ব্যাংক থেকে বেরিয়ে রিকশায় ওঠার পর একটি সাদা প্রাইভেটকার তার পেছনে যেতে দেখা যায়। আর নীল শার্ট পরা সেই ব্যক্তিকে রিকশাটি অনুসরণ করতে দেখা যায়।