বিহঙ্গ কথা

চোখ মেলেই কুলটুসের দেখা

প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১

আ ন ম আমিনুর রহমান

চোখ মেলেই কুলটুসের দেখা

কুলটুস বসন্তবৌরি পাখি- লেখক

করোনাকালে ঘরে বন্দি থেকে হাঁপিয়ে উঠেছে সবাই। কাজেই শত বাধা সত্ত্বেও ১০ জনের পারিবারিক টিমে গত বছর ৪ সেপ্টেম্বর রাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সাগরপানে ছুটলাম। রাতভর বাসের ঝাঁকুনিতে আধা-ঘুম আধা-জাগরণ শেষে সকালে কক্সবাজারের ডলফিন মোড়ে ঢোকার আগে চোখ মেললাম। বাসের পর্দা সরাতেই সকালের মিষ্টি রোদ মুখের ওপর পড়ল। ঘরে বন্দি থাকতে থাকতে মনটাই যেন ছোট হয়ে গেছে। সাগরের বিশালতায় তা বড় হয় কিনা দেখি। বাইরে তাকিয়ে যখন এসব ভাবছি তখনই সবুজ এক বিহঙ্গ উড়ে গেল ঠিক সামনে দিয়ে। ওড়ার ভঙ্গিই ওর পরিচয় বলে দিল। সৈকত শহরে ঢুকতে না ঢুকতেই এমন দৃশ্যে মন আনন্দে ভরে উঠল।

সবুজ এই পাখিটিকে কতই না দেখেছি! 'কুকুরুক-কুকুরুক-কুকুরুক...' স্বরে অনবরত ডাকে সে। বন-বাগান, গ্রাম, পার্ক- কোথায় নেই সে! খুব জোরে যে সে ডাকে, তা নয়। থেমে থেমে ছন্দে ছন্দে ডাকে। কবে-কখন প্রথম ওর ডাক শুনেছিলাম, মনে নেই। কিন্তু ওর ডাকে কেমন যেন একটা মায়া আছে। সে মায়ার টানে বারবার ওর ডাক শুনতে ইচ্ছা করে। বন-বাগানে হারিয়ে যাই ওর মায়াভরা ডাকে। ওর বহু ছবি তুলেছি এ জীবনে। ক'দিন আগেও ওকে দেখলাম হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের টাওয়ার থেকে একটি শিমুল গাছে বসে থাকতে।

মায়াভরা ডাকের সবুজ এই পাখি এ দেশের বহুল দৃশ্যমান আবাসিক পাখি ডোরা বসন্তবৌরি, গোরখোদ বসন্তবৌরি বা বড় আমতোতা। পশ্চিমবঙ্গে বলে রেখা বসন্ত। ওর আরও একটি সুন্দর নাম রয়েছে- কুলটুস বসন্তবৌরি। আমার কাছে এ নামটিই সবচেয়ে ভালো লাগে। ইংরেজি নাম লিনিয়েটেড বারবেট। মেগালাইমিডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Psilopogon lineatus|। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিভিন্ন দেশের আবাসিক পাখি সে।

প্রাপ্তবয়স্ক কুলটুস বসন্তবৌরির দৈর্ঘ্য ২৫-৩০ সেন্টিমিটার, ওজন ১১৫-২০৫ গ্রাম। শক্তপোক্ত হলদে চঞ্চুর পাখিটি একনজরে ঘাসের মতো সবুজ। গলা সাদা। মাথা, গলা ও বুকজুড়ে তো বটেই; ঘাড়, পিঠের কিছুটা জুড়ে ফ্যাকাসে বাদামি রঙের অসংখ্য খাড়া খাড়া দাগ রয়েছে। বাদামি চোখের চারদিকে থাকে হলদে বলয়। ফ্যাকাসে গোলাপি চঞ্চু। পা, পায়ের পাতা ও আঙুল হলুদ। নখ কালচে-বাদামি। স্ত্রী ও পুরুষের চেহারা অভিন্ন। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথা ও বুকের দাগগুলো ফ্যাকাসে।

ওরা দেশব্যাপী সব ধরনের আবাসস্থলে বাস করতে পারে। সচরাচর একাকী, জোড়ায় বা বিচ্ছিন্ন দলে বিচরণ করে। খাদ্যের জন্য ফলদ গাছ ও ঝোপ-ঝাড়ে ঘোরাফেরা করে। পাকা ফল, রসালো পোকা, ছোট গিরগিটি, গেছো ব্যাঙ ইত্যাদি প্রিয় খাবার। 'কুকুরুক-কুকুরুক-কুকুরুক...' শব্দে ডাকে।

মার্চ থেকে জুন প্রজননকাল। এ সময় ভূমি থেকে ৩ থেকে ১২ মিটার উঁচুতে গাছের মরা ডালে গর্ত খুঁড়ে বাসা বানায়। ডিম পাড়ে ২-৪টি, রং সাদা। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে ডিমে তা দেয়। ডিম ফোটে ১৫-১৭ দিনে। স্বামী-স্ত্রী মিলেমিশে ছানাদের লালন-পালন করে। আয়ুস্কাল ৮-৯ বছর।