রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসা থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন মালয়েশিয়ার এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটিতে (এপিইউ) পড়ূয়া সাদমান সাকিব রাফি (২৩)। সঙ্গে ছিল ল্যাপটপ আর মোবাইল ফোন। ওই ঘটনায় ভাটারা থানায় সাধারণ ডায়েরি করার পরের দিন হাতিরঝিল লেকের পানিতে অজ্ঞাতপরিচয় এক তরুণের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর ১৫ দিনের মাথায় হাতিরঝিলের অন্য প্রান্তে মেলে রাফির ব্যবহূত মোবাইল ফোনের সিমকার্ড।

ছবি আর পোশাক দেখে স্বজনরা শনাক্ত করেন, অজ্ঞাতপরিচয়ে উদ্ধার করা তরুণের লাশটিই রাফির। ততদিনে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হয়ে গেছে তার লাশ। কীভাবে (রাফির) মৃত্যু হলো, তা জানতে পারছেন না স্বজনরা। সিমকার্ড মিললেও তার মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপটি কোথায়- সে প্রশ্নেরও উত্তর মেলেনি।

গত ১৩ জানুয়ারি বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয়ে যান এপিইউতে ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী রাফি। ওইদিনই সন্ধ্যায় তার মা মনোয়ারা হোসেন ভাটারা থানায় জিডি করেন। ২৯ জানুয়ারি হাতিরঝিলে এক ঝাড়ূদারের কাছে তার মোবাইলের সিমকার্ড সক্রিয় পেয়ে পুলিশ তা জব্দ করে। এরপর থেকে রাফির মা ছেলের সন্ধানে হাতিরঝিলেই ঘুরে বেড়াতেন। অন্যান্য দিনের মতো গত সোমবার ছেলের সন্ধানে ওই এলাকার লেকের পাড়ে ঘুরে তিনি থানায় যান পুলিশের সহায়তা নিতে। তখনই হাতিরঝিল থানা পুলিশ তাকে অজ্ঞাতপরিচয়ে উদ্ধার করা লাশের জামাকাপড় আর ছবি দেখান। এর পরই নিজের ছেলে চিনতে পেরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

রাফির মা মনোয়ারা হোসেন গতকাল কাঁদতে কাঁদতে সমকালকে বলেন, তিনি বিভিন্ন সময়ে ভাটারা থানায় গেছেন। পুলিশ কোনো তথ্যই দিতে পারেনি। মর্গ থেকে মর্গে ছুটে গেছেন, কেউ অজ্ঞাতপরিচয়ের লাশও দেখায়নি। শুধু রেজিস্টার খাতা দেখিয়ে ফেরত পাঠিয়েছে। এখন ছেলের লাশ উদ্ধারের বিষয়ে নিশ্চিত হলেও কবরটা শনাক্ত করতে পারছেন না। কারণ, তার ছেলেকে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম বেওয়ারিশ হিসেবে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করে। একই দিন আরও চারটি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করায় তার ছেলের কবর কোনটি, তা জানতে পারেননি।

এই মা বলেন, ২৯ তারিখে ছেলের মোবাইল ফোনের সিম উদ্ধারের তথ্য পান তিনি। এরপর ভাটারা থানার জিডির তদন্ত কর্মকর্তা তাকে বলেন, হাতিরঝিল এলাকার বাসা বা মেসগুলোতে ছেলের সন্ধান করতে। সে অনুযায়ী তিনি পুরো এলাকা চষে বেড়িয়েছেন। কেউ কোনো তথ্য দিতে পারেনি।

রাফির নিখোঁজের জিডি তদন্ত করছিলেন ভাটারা থানার উপপরিদর্শক হাফিজুর রহমান। গতকাল তিনি সমকালকে বলেন, রাফির বাসার আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্নেষণ করে তাকে স্বাভাবিকভাবে হেঁটে যেতে দেখা গেছে। বসুন্ধরার সি ব্লক পর্যন্ত তার মোবাইল ফোনটির লোকেশন পাওয়া গিয়েছিল। এরপর সন্ধান না মিললেও ডিবি পুলিশ তার ব্যবহূত সিমটি হাতিরঝিল এলাকা থেকে উদ্ধার করে।

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, হাতিরঝিল থেকে অজ্ঞাতপরিচয়ে লাশ উদ্ধারের খবর তিনি পাননি। এজন্য বাদীকে জানাতে পারেননি। তবে সিমটি ওই এলাকা থেকে উদ্ধারের খবর পেয়ে তার মাকে পরামর্শ দেন ওই এলাকায় ছেলের সন্ধান করতে।

জানতে চাইলে হাতিরঝিল থানার ওসি আব্দুর রশিদ বলেন, লাশ উদ্ধারের ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেলে বোঝা যাবে, কীভাবে ওই তরুণের মৃত্যু হয়েছিল।

ডিবির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হাতিরঝিলের এক পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মোবাইল ফোনে রাফির সিমকার্ডটি সক্রিয় পাওয়া যায়। ওই পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে ডেকে নেওয়ার পর তিনি জানিয়েছিলেন, ঝাড়ূ দেওয়ার সময় সেটি পেয়েছিলেন। তাকে সন্দেহ না হওয়ায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

স্বজনরা বলছেন, রাফির জন্ম ও বেড়ে ওঠা সৌদি আরবে। তার বাবা-মা, ভাইবোনও থাকেন সেখানে। সৌদি থেকেই মালয়েশিয়ায় পড়তে যান তিনি। তবে করোনার সময়ে তার মা ঢাকায় এসে আটকা পড়লে রাফিও গত বছরের সেপ্টেম্বরে দেশে চলে আসেন। বিমান বন্ধ থাকায় আর মালয়েশিয়া বা সৌদিতে ফিরতে পারেননি। এরপর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও এপিইউ থেকে ক্রেডিট ট্রান্সফার না হওয়ায় ভর্তি বাতিল হয়ে যায়। এরপর থেকে রাফি কিছুটা বিষণ্ণ ছিলেন।

মন্তব্য করুন