র‌্যাব-১-এর গাজীপুরের পোড়াবাড়ি ক্যাম্পের সদস্য ছিলেন ইদ্রিস মোল্লা। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি তিনি দায়িত্ব পালন করছিলেন পোড়াবাড়ি তল্লাশি চৌকিতে। আগাম গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মাদকবাহী একটি ট্রাককে থামার সংকেত দেন সাহসী ইদ্রিস ও তার সহকর্মীরা। ট্রাকটি সংকেত অমান্য করে চলতে থাকে। এরপর পেছনে পেছনে মোটরসাইকেলে ধাওয়া করে ময়মনসিংহের ভালুকায় গিয়ে ট্রাকের সামনে দাঁড়ান র‌্যাবের কয়েকজন সদস্য। এ সময় ট্রাকটির চালক কনস্টেবল ইদ্রিসের ওপর গাড়ি তুলে দিলে ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি।

এরপর থেকেই পলাতক ছিল ওই ট্রাকচালক ও তার সহকারীরা। তবে কেরানীগঞ্জের র‌্যাবের অন্য একটি মাদকবিরোধী অভিযানে ইদ্রিসের ঘাতক সেই চালক মারা গেছে।

গত ১৯ ফেব্রুয়ারি কেরানীগঞ্জের সেই এলাকায় মাদকবিরোধী আরেকটি পৃথক অভিযান চালায় র‌্যাব-১০-এর একটি দল। সেখানে র‌্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলা চালায় মাদক কারবারিরা। এতে র‌্যাবের এক সদস্য গুরুতর আহত হন। সেখানে গোলাগুলিতে আহত হয় এক যুবক। তাকে পরে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। র‌্যাব বলছে, ওই যুবকের জাতীয় পরিচয়পত্র ও বায়োম্যাট্রিক পরীক্ষায় বেরিয়ে আসে অভিযানে নিহত সেই ট্রাকচালকের নাম মো. শফি শেখ।

তার গ্রামের বাড়ি জামালপুর সদরের রানাগাছায়। শফির বাবার নাম তারা শেখ আর মা সুফিয়া বেগম। গাজীপুরে সে ইদ্রিসকে ট্রাকচাপা দিয়ে পালিয়ে যায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গ, স্বজন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র সমকালকে নিশ্চিত করে, শফি শেখই সেই পলাতক ট্রাকচালক। এরই মধ্যে স্বজনরা তার লাশ নিয়ে গ্রামে দাফন করেছেন।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ সমকালকে বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে দেখা যায়, অভিযানে নিহত যুবকই র‌্যাব সদস্যকে ট্রাক চাপা দেয়। তিনি আরও বলেন, মাদক কারবারিদের রুখতে ইদ্রিস যে নজির স্থাপন করেছেন, তার জন্য র‌্যাব গর্বিত। সে মৃত্যুঞ্জয়ী। ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে তার পরিবারকে এরই মধ্যে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। র‌্যাব সদর দপ্তর থেকেও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এটা প্রক্রিয়াধীন।

শাহবাগ থানার কনস্টেবল রমজান আলী সমকালকে বলেন, শফির লাশের সুরতহাল করার সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন। প্রথমে লাশটি অজ্ঞাত অবস্থায় মেডিকেল কলেজ মর্গে ছিল। পরে আঙুলের ছাপ নিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে মিলিয়ে শফির মূল ঠিকানা পাওয়া যায়। এরপর ২৩ ফেব্রুয়ারি তার পরিবারের লোকজন এসে মরদেহ নিয়ে গেছেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শফির লাশ নিতে জামালপুর থেকে ঢাকায় এসেছিলেন তার স্ত্রী কুইন ও ভাগ্নে সম্পর্কীয় মো. রাকিব। রাকিবের নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি সমকালকে বলেন, বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পেয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে শফির লাশ আনতে যান তারা। তার আট মাস বয়সী একটি সন্তান রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, শফি দীর্ঘদিন ধরেই মাদক কারবারে জড়িত ছিল। টার্গেট করে তাকে ধরার অভিযানে নেমেছিল র‌্যাব। সে এতটাই বেপরোয়া ছিল, র‌্যাব সদস্যকে হত্যা করতেও দ্বিধা করেনি। এমনকি কেরানীগঞ্জে যখন র‌্যাব অপারেশন চালায়, তখনও তাদের ওপর হামলা চালিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। ওই অভিযানে শফির তিন সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

জানা গেছে, র‌্যাব সদস্য ইদ্রিস ছিলেন তার মা-বাবার একমাত্র সন্তান। ২০১১ সালে কনস্টেবল পদে পুলিশে চাকরি পান তিনি। ২০১৯ সালে যোগ দেন র‌্যাবে। ছয় বছরের প্রেমের সম্পর্কের পর ২০১৯ সালে বিয়ে করেন তিনি। ইদ্রিসের স্ত্রী শারমিন বলেন, তার স্বামী মা-বাবাসহ পুরো পরিবারকে আগলে রাখতেন। আজ সেই মানুষটা নেই। এই শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়।



মন্তব্য করুন