বিনামূল্যে সবার জন্য তথ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অনলাইন জ্ঞানভান্ডার হিসেবে ২০০১ সালে উইকিপিডিয়ার যাত্রা শুরু হয় মার্কিন ইন্টারনেট উদ্যোক্তা জিমি ওয়েলসের হাতে। অনলাইনে কেউ যখন কোনো তথ্য ও তত্ত্বের অনুসন্ধান করেন, কোনো কিছু জানতে চান, তখন শুরুতেই যে বিশ্বকোষ আলাদিনের চেরাগের মতো কোনো উত্তর হাজির করে সেটিই উইকিপিডিয়া।

অবশ্য এতে উপস্থাপিত নিবন্ধের তথ্য কোনো কোনো সময় বিভ্রান্তিও সৃষ্টি করে। কারণ উন্মুক্ত তথ্যভান্ডার হওয়ায় অনেকে উইকিপিডিয়ায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্যও যুক্ত করে থাকেন- যা যাচাই-বাছাই ও সম্পাদনার আগেই অনেক অনুসন্ধানকারীর কাছে পৌঁছে যায়।

উইকিপিডিয়ার বাংলা সংস্করণ হিসেবে বাংলা উইকিপিডিয়া ২০০৪ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রথম যাত্রা শুরু করে। এর আগে ২০০৩ সালের ৯ ডিসেম্বর কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির তৎকালীন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী শাহ আসাদুজ্জামান বাংলায় উইকিপিডিয়া তৈরির অনুরোধ করে জিমি ওয়েলসের কাছে প্রথম ই-মেইল করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরুর পর থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত এতে নিবন্ধ যুক্ত হয়েছে এক লাখ চার হাজার ১৪৭টি; যেখানে বাংলা ভাষাভাষী রয়েছেন ২৩ কোটি। নিবন্ধের সংখ্যার হিসাবে উইকিপিডিয়ার ৩০৩টি ভাষার মধ্যে বাংলা উইকিপিডিয়ার অবস্থান ৬৮-তে। ২০২০ সালে সারাবিশ্ব থেকে ২৯ কোটি ৮ লাখ ৩৪ হাজার ৪৯৩ বার এই উন্মুক্ত বিশ্বকোষে অনুসন্ধান করা হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে পড়া হয়েছে সাত লাখ ৯৪ হাজার ৬৩০ বার।

উইকিস্ট্যাটস অনুযায়ী, উইকিপিডিয়ায় ইংরেজি ভাষায় সবচেয়ে বেশি ৬২ লাখ ৫৫ হাজার ৭৬৪টি নিবন্ধ রয়েছে। নিবন্ধের সংখ্যার দিক থেকে উইকিপিডিয়ায় উপমহাদেশীয় ভাষা উর্দু সবার ওপরে- সম্মিলিত তালিকার ৫৪তম স্থানে। উপমহাদেশে হিন্দি রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে এবং সম্মিলিতভাবে ৫৭তম স্থানে। সম্মিলিত তালিকায় ৬১তম স্থানে থাকা তামিলেরও পরে ৬৮তম স্থানে অবস্থান করছে বাংলা ভাষা। অথচ তামিল ভাষাভাষীর সংখ্যা সাড়ে সাত কোটি।

উইকিপিডিয়ায় নিবন্ধের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ফিলিপাইনের সিবুয়ানো ভাষা। এ ভাষার ব্যবহারকারী প্রায় দুই কোটি, নিবন্ধ সংখ্যা ৫৫ লাখ। কিন্তু ভাষাভাষীর দিক থেকে বাংলা পঞ্চম ভাষা হলেও নিবন্ধ ও ব্যবহারকারীর দিক থেকে বাংলা উইকিপিডিয়ার অবস্থান বেশ দূরে।

এ বিষয়ে বাংলা উইকিপিডিয়ার অন্যতম প্রশাসক নাহিদ সুলতান সমকালকে বলেন, 'বাংলা উইকিপিডিয়ার সকল পর্যায়ে জড়িত সবাই স্বেচ্ছাসেবী অবদানকারী। যারা উইকিপিডিয়া সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রচারমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেন, তারাও স্বেচ্ছাসেবী। তাদের নির্দিষ্ট কোনো কাজ দেওয়া হয় না। তাই যে কোনো ভাষার উইকিপিডিয়ার অবস্থান নির্ভর করে সে ভাষার স্বেচ্ছাসেবীরা নিজেরা এই জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ করতে কতটা সময় দিতে পারছেন এবং কতটা আগ্রহী তার ওপর।'

উইকিপিডিয়া ইন্টারনেটভিত্তিক এমন এক তথ্যভান্ডার, যেখানে সবাই লিখতে পারেন, সবাই সম্পাদনাও করতে পারেন। স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতেই বিভিন্ন ভাষার জ্ঞানভান্ডার হয়ে উঠেছে এ মুক্ত বিশ্বকোষ। বাংলা উইকিপিডিয়া যাদের হাত ধরে শুরু থেকেই এগিয়েছে তাদের একজন উইকিপিডিয়ার সাবেক প্রশাসক ও যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব আলাবামা অ্যাট বার্মিংহামের কম্পিউটার বিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক রাগিব হাসান ই-মেইলে সমকালকে বলেন, 'বাংলা আমাদের প্রাণের ভাষা, আর বাংলা উইকিপিডিয়ার কাজটা করতে হবে আমাদেরই। বিদেশ থেকে কেউ এসে উইকিপিডিয়াতে তথ্য যোগ করে দেবে না। বাংলায় জ্ঞানভান্ডার গড়ে তোলার ও সমৃদ্ধ করার কাজটা আমাদের মায়ের ভাষা বাংলার স্বার্থেই করতে হবে।'

প্রায় একই কথা বলেন বাংলা উইকিপিডিয়ার মুক্ত বিশ্বকোষে সবচেয়ে বেশি নিবন্ধ রচয়িতা সুব্রত রায়। তিনি জানান, বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি ও বিকাশের লক্ষ্যেই অবিরত লিখছেন। এ পর্যন্ত পাঁচ হাজার ৯৮টি নিবন্ধ সুব্রত রায় একাই তৈরি করেছেন। তার মতে, 'ভাষার প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্নে সবারই একই অবস্থানে থাকা উচিত। কেবল বাংলাভাষী ব্যবহারকারীর পক্ষেই মনের ভাব পূর্ণাঙ্গভাবে ফুটিয়ে তুলে বাংলা উইকিপিডিয়াকে সমৃদ্ধ করা সম্ভব।'

বাংলা উইকিপিডিয়ায় যারা অবদান রাখতে চান, নতুন করে নিবন্ধন করে নতুন এন্ট্রি করাসহ সম্পাদনা করতে চান তাদের জন্য রয়েছে উন্মুক্ত ও সহযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ। উইকিপিডিয়ার স্বেচ্ছাসেবী দেলোয়ার হোসাইন বলেন, '২০১৬ সালের দিকে আমি এখানে কাজ করতে আগ্রহী হয়ে উঠি। আমি আমার নিজের জেলা চাঁদপুরের নিবন্ধে কিছু তথ্য যুক্ত করেছিলাম। কিন্তু প্রশাসকরা সেগুলো মুছে দেন। একাধিকবার এ রকম হওয়ার পর আমি অনেকটা রেগেই জানতে চাই, তথ্যগুলো মুছে দেওয়া হচ্ছে কেন। একজন প্রশাসক এর উত্তরে খুব বিনয়ের সঙ্গে আমাকে তথ্য যুক্ত করার নিয়মগুলো জানান। এতে আমি অনুপ্রাণিত হই।'

চলতি জানুয়ারির তথ্য অনুসারে, বাংলা উইকিপিডিয়ায় প্রতি মাসে সক্রিয় অবদানকারীর সংখ্যা এক হাজার ১৯৩ জন। প্রশাসনিক বিষয়গুলো দেখার জন্য প্রশাসক রয়েছেন ১১ জন- যারা সাধারণ স্বেচ্ছাসেবী এবং বাংলা উইকিপিডিয়া ব্যবহারকারীদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে কেবল কিছু বাড়তি কারিগরি দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১ সালে উইকিপিডিয়া পরিচালনাকারী অলাভজনক সংস্থা 'উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশন'-এর অনুমোদন নিয়ে 'উইকিমিডিয়া বাংলাদেশ' নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গঠিত হয়। এ সংগঠনই মূলত বাংলা উইকিপিডিয়ার প্রসারে কাজ করছে। পশ্চিমবঙ্গে এ কাজটি করছে 'পশ্চিমবঙ্গ উইকিপিডিয়ানস ইউজার গ্রুপ'।

নাহিদ সুলতান উইকিমিডিয়া বাংলাদেশেরও সাবেক সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, 'স্বেচ্ছাসেবীদের আগ্রহী করতে ২০১৪ থেকে নিয়মিত সারাদেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও প্রশিক্ষণ কর্মশালা করা হচ্ছে। নিবন্ধ সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে।'

রাগিব হাসান জানান, তথ্যের বিশ্বাস যোগ্যতা বজায় রাখতে উইকিপিডিয়া যাচাই যোগ্যতা, নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র ও নিরপেক্ষতার নিয়ম অনুসরণ করে থাকে। যাচাই যোগ্যতার অর্থ হচ্ছে, প্রতিটি তথ্যের বিপরীতে সেটির সত্যতা যাচাইয়ে রেফারেন্স বা তথ্যসূত্র থাকতে হবে। এই সূত্রটি হতে হবে নির্ভরযোগ্য। যে কোনো কিছুকে উপস্থাপন করতে হবে আবেগহীন ও নিরপেক্ষভাবে।

উইকিপিডিয়া বা বাংলা উইকিপিডিয়ার তথ্যের ওপর যাতে নির্ভর করা যায়, সেজন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. নাদির জুনাইদ এসব তথ্যাবলির যথাযথ মূল্যায়নের ওপর জোর দেন। তার ভাষায়, এখানে যে কারও নিবন্ধ এন্ট্রির সুযোগ থাকায় তথ্যগত ভুল থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেখানে বিশেষ করে প্রশাসকদের অবশ্যই নানা উৎস যাচাই করে আর্টিকেল অনুমোদন করা উচিত।

রাগিব হাসান মনে করেন, বাংলা উইকিপিডিয়া বিকাশের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, 'বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ সঙ্গত কারণেই তথ্য চান বাংলা ভাষায়। শহরের বাইরে গ্রামবাংলায় কোটি কোটি মানুষের কাছে দুনিয়ার সব জ্ঞান পৌঁছাতে হলে বাংলাই একমাত্র ভরসা। গত ১৫ বছরে বাংলা উইকি অনেকদূর এসেছে এবং সামনে আরও বহুদূর যাবে।'

বাংলা উইকিপিডিয়ানরা মনে করেন, বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উইকিপিডিয়ায় বাংলায় নিবন্ধ লেখার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব তুলে ধরলে এবং সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি গুরুত্ব পেলে এ কাজে অনেকেই আগ্রহী হবেন। তখন ইন্টারনেটে বাংলায় তথ্য পাওয়াও সহজ হবে।





মন্তব্য করুন