প্রতিবন্ধীরা যে সমাজের বোঝা নয়- সেটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন ঈশ্বরদীর ১৫ প্রতিবন্ধী নারী-পুরুষ। সম্মিলিত উদ্যোগে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, কফি হাউস ও ফাস্টফুড ক্যাফে পরিচালনা করে মানুষের নজর কেড়েছেন তারা। ঈশ্বরদী তথা পুরো দেশে তারা অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

উপজেলার চররূপপুর জিগাতলা এলাকায় প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন ও মানবাধিকার সমিতির কার্যালয়ের পাশে নিজেরাই গড়ে তুলেছেন এই আধুনিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সার্বক্ষণিক কাজ করছেন প্রতিবন্ধীরাই। নিজেরাই ব্যবহার করছেন কম্পিউটার ও অন্যান্য যন্ত্র।

রোববার বিকেলে প্রতিবন্ধীদের পরিচালিত ওই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা গেল, শহরের আধুনিক কফি হাউস, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর কিংবা ফাস্টফুড ক্যাফের যেসব কাজ সুস্থ মানুষ করে থাকেন, তার সবই করছেন প্রতিবন্ধীরা। কেউ কম্পিউটারে পণ্য বিক্রির হিসাব নিয়ে ব্যস্ত, কেউ কফি বানাচ্ছেন। আবার কেউ ট্রে হাতে টেবিলে টেবিলে পৌঁছে দিচ্ছেন কফির পেয়ালা কিংবা ফাস্টফুড ও পানির বোতল। গ্রামের রাস্তার ধারে তিল তিল করে গড়ে তোলা এ প্রতিষ্ঠানে স্থানীয়দের পাশাপাশি আশপাশের গ্রাম থেকেও প্রতিদিন বাইক, প্রাইভেটকার কিংবা অটোবাইকে চড়ে কৌতূহল মেটাতে বা সেবা নিতে আসেন বহু মানুষ।

রূপপুর প্রকল্পে কর্মরত অনেক বিদেশি নাগরিকও এখন বিকেল বা সন্ধ্যায় এই কফি হাউসে বসে কিছুটা সময় প্রতিবন্ধীদের সান্নিধ্যে কাটিয়ে অন্যরকম এক অনুভূতির ছোঁয়া পান। ইউনিয়ন পর্যায়ের একটি গ্রামের মধ্যে দেশি-বিদেশিদের মিশেলে এ এক অভূতপূর্ব দৃশ্য।

কফি হাউসের টেবিলে টেবিলে অর্ডার অনুযায়ী কফি, কেক, ফাস্টফুড, পানির বোতল পৌঁছে দিচ্ছিলেন শারীরিক প্রতিবন্ধী রেহেনা খাতুন। তিনি বলেন, আমার শরীরের যে অবস্থা, তাতে ভিক্ষা ছাড়া আমার চলার উপায় ছিল না। প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন ও মানবাধিকার সমিতির এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কাজ পেয়ে আমি এখন স্বাবলম্বী। কিছুদিন আগেও আমি আমার শারীরিক অক্ষমতার কারণে নিজের মৃত্যু কামনা করতাম। এখন অনেক বছর বাঁচতে ইচ্ছা করে।

প্রতিবন্ধী কাকলী পারভিন চুমকি বলেন, কাজ করে আমার সংসারে এখন সচ্ছলতা এসেছে। মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখেছি। কাজে ব্যস্ত প্রতিবন্ধী আসমা খাতুন, সাহারা বেগমসহ অন্যরা জানান, কারও করুণার পাত্র হয়ে নয়; নিজেদের পায়ে এভাবে দাঁড়াতে চান।

ঈশ্বরদী ইপিজেডে কর্মরত পরশ উদ্দীন বলেন, প্রতিবন্ধী পরিচালিত এ প্রতিষ্ঠানে এসে আমি অভিভূত। রূপপুর প্রকল্পে কর্মরত কাজাখস্তানের এক নাগরিক বলেন, বাংলাদেশের এই কফি হাউজে না এলে বুঝতেই পারতাম না- এ দেশের মানুষ এত সাহসী!

সাহাপুর গ্রামের বাসিন্দা সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান বশির আহমেদ বকুল বলেন, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। ঈশ্বরদীর এই প্রতিবন্ধীরা যা করে দেখিয়েছেন, তা অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে।

প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন ও মানবাধিকার সমিতির সভাপতি সানোয়ার হোসেন নিজে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। এ প্রতিষ্ঠানের সবকিছু তার নখদর্পণে। তিনি বলেন, আমি চোখে কিছুই দেখতে পারি না। কিন্তু মনের আলো দিয়ে এ প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত।

ঈশ্বরদী উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মাসুদ রানা বলেন, প্রতিবন্ধীদের যে কোনো প্রয়োজনে সমাজসেবা অধিদপ্তর সহযোগিতা করে থাকে। ভবিষ্যতে তাদের আরও সহযোগিতা করা হবে।

মন্তব্য করুন