সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে ভোট ডাকাতির অভিযোগ তুলেছে 'গৃহপালিত বিরোধী দলের' তকমা পাওয়া জাতীয় পার্টিও (জাপা)। গতকাল মঙ্গলবার দলের বনানী কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে জাপা মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু এ প্রসঙ্গে বলেন, 'বর্তমান সরকার নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।' জাপা নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগ চায় কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'লাজলজ্জা থাকলে তাদেরই উচিত এ সিদ্ধান্ত নেওয়া।'

পাঁচ ধাপের পৌরসভা নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ তুলে ইতোমধ্যে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে বিএনপি। গতকালের সংবাদ সম্মেলনে একই পথে পা ফেলার ইঙ্গিত দিয়ে জাপা নেতা জিয়াউদ্দিন বাবলু বলেন, বর্তমান সরকারের অধীনে তারা আর কোনো নির্বাচনে অংশ নেবেন কিনা, আগামী প্রেসিডিয়াম সভায় সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

গত তিনটি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করে ভোটে অংশ নিয়েছে জাপা। আগের দুই সরকারে আওয়ামী লীগের শরিকও ছিল এ দল। একাদশ সংসদ নির্বাচনে অভাবনীয় ফল করে বিএনপির প্রায় চার গুণ আসন পেয়ে জাতীয় পার্টি টানা দ্বিতীয়বারের মতো সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসেছে।

২৩০টি পৌরসভার ১৮৫টিতে মেয়র পদে জয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগ। প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৬০ শতাংশ পেয়েছে এ দল। বিএনপি জিতেছে ১১টি আসনে; ভোট পেয়েছে প্রায় ২১ শতাংশ। ২ শতাংশেরও কম ভোট পেয়ে মাত্র একটি পৌরসভায় মেয়র পদে জিতেছেন জাপার লাঙ্গলের প্রার্থী। যদিও দলটির এমপি রয়েছেন এমন এলাকায় পৌরসভার সংখ্যা বিশের বেশি।

সম্প্রতি জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের ঘোষণা দিয়েছেন, তোষামোদির রাজনীতি নয়, রাজনীতির মতো রাজনীতি করা হবে। এ বক্তব্যের এক সপ্তাহের মাথায় দলের মহাসচিব সংবাদ সম্মেলনে ভোট কারচুপির অভিযোগ করলেন সরকারের বিরুদ্ধে।

মহাসচিব বলেছেন, আওয়ামী লীগ দেশকে পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করেছে; মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছে। চলমান স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা জিতেছে; আর হেরেছে ভোটাররা। মানুষ ভোট দিতে না পেরে রাস্তায় কাঁদছে- তা মানা যায় না। মানুষের ভোটাধিকার রক্ষার আন্দোলনে প্রয়োজনে জীবন দেব, কিন্তু মাথা নত করব না।

পৌর নির্বাচনের বড় একটি অংশ ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) হয়েছে। জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, ইভিএমেও শতভাগ ভোট পড়ছে! যা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ইভিএমকে আওয়ামী ইভিএমে পরিণত করা হয়েছে। আওয়ামীতন্ত্র আর গণতন্ত্র একসঙ্গে চলতে পারে না।

জাপা মহাসচিব কৌতুক করে বলেন, ভোটের নামে প্রহসন না করে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের জয়ী ঘোষণা করে গেজেট করে দিলেই হয়। এতে যদি সন্ত্রাস, হানাহানি আর খুনোখুনি বন্ধ হয়! তাতে দেশ নৈরাজ্যকর অবস্থা থেকে মুক্তি পাবে।

গত রোববার নীলফামারীর সৈয়দপুর পৌর নির্বাচনে ভোট শুরুর তিন ঘণ্টার মাথায় বর্জন করেন জাপার মেয়র প্রার্থী সিদ্দিকুল আলম সিদ্দিক। জাপা মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বলেন, সৈয়দপুরে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদাকে অনুরোধ করেছিলেন। তারা সবাই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আশ্বাস দিলেও মাঠের চিত্র ছিল উল্টো।

সংবাদ সম্মেলনে সিদ্দিকুল আলম জানান, প্রথম দুই ঘণ্টা তিনি প্রায় ১০ হাজার ভোট পেয়েছেন। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জাতীয় পার্টি কত ভোট পেত, বোঝাই যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ ভোট ডাকাতি করে নিজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে। জাতীয় পার্টির বিজয় কেড়ে নিয়েছে।

পাশে থাকা জাপা প্রেসিডিয়াম সদস্য শফিকুল ইসলাম সেন্টু বলেন, সৈয়দপুর পৌর নির্বাচন সুষ্ঠু করতে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া সবাইকে অনুরোধ করা হয়েছিল, কিন্তু কাজ হয়নি। এই নির্বাচন 'হ্যাঁ-না' ভোটকেও ছাড়িয়ে গেছে।

সৈয়দপুরের এমপি জাপার ভাইস চেয়ারম্যান আহসান আদেলুর রহমান বলেন, নির্বাচনের আগেই লাঙ্গলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়। এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়।

নীলফামারীর আরেক এমপি মেজর (অব.) রানা মোহাম্মদ সোহেল বলেন, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের তাণ্ডবে সব লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। প্রহসনের নির্বাচন এ দেশের মানুষ মেনে নেবে না।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া, এটিইউ তাজ রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান এইচএম আসিফ শাহরিয়ার প্রমুখ।











মন্তব্য করুন