আপনারা বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ নিশ্চয়ই। কিন্তু আমার মন কেবলই বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় চঞ্চল হয়। এমন দোলাচলে পড়েছিলাম 'দারিচিক' নামে এক সাংসারেক পূজার বেলায়ও। পূজাকে মান্দিদের আচিক ভাষায় 'আমুয়া' বলা হয়। দেবতাকে বলা হয় 'মিদ্দি' এবং দেবদেবীর সাকার প্রতিরূপকে 'সামব্রাশিয়া'। সাধারণত বাঁশ-বেতের মতো বন থেকে সংগৃহীত প্রাকৃতিক সব উপাদান ব্যবহার করা হয় সামব্রাশিয়া তৈরি করতে। প্রকৃতির সঙ্গে আদিবাসীদের সম্পর্ক খুব নিবিড়। মান্দি বা গারো আদিবাসীরাও যথারীতি প্রকৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের জের ধরে একটি প্রকৃতিবাদী, বহু ঈশ্বরবাদী ধর্ম চর্চা করত। সেই ধর্মটির নাম সাংসারেক। ব্রিটিশ আমলে, সম্ভবত ১৯৩৬ সালে প্রথম একজন মান্দি সরকারি চাকুরে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন। মান্দি খ্রিষ্টানদের প্রজন্ম হিসাব করে ধারণা করা যায়, শুরুতে ধর্মান্তরিত হওয়ার প্রবণতা খুব বেশি ছিল না। একেবারে যারা নবীন, তারা তৃতীয় প্রজন্মের খ্রিষ্টান। ফলে অনুমান করা যায়, স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ বছরে বাংলাদেশে সাংসারেক মান্দিদের ধর্মান্তরের ঘটনা ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। ব্যক্তিগতভাবে আমি চিনি মাত্র তিনজনকে, যারা এখনও শতভাগ সাংসারেক রীতি মেনে জীবনযাপন করছেন। তারা হলেন টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার চুনিয়া গ্রামের জনিক নকরেক ও ধরাতি গ্রামের দীনেশ নকরেক। তৃতীয়জন নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরির টুকিয়া রেমা। এ তিনজন সাংসারেক ধর্মের খামাল। যারা পূজা-অর্চনায় পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করেন, আচিক ভাষায় তাদের খামাল বলা হয়। কয়েকজন খামাল ছাড়া আর কেউ সাংসারেক পূজার রীতি জানেন না। কারণ, বাকিরা খ্রিষ্টধর্মের অনুসারী হয়ে গেছেন। প্রায় শতবর্ষ পরে অনুষ্ঠিত দেনব্রেশিয়া পূজার মন্ত্র নিয়ে দীনেশ নকরেক ও জনিক নকরেককে ভালোই বেগ পেতে হয়েছিল। পূর্বপুরুষের পূজা-পার্বণ ভুলতে বসলেও খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী মান্দিদের অনেকেই বলবেন, 'খ্রিষ্টান হয়েছি তো কী হয়েছে, বাপদাদার ধর্ম তো বিক্রি করে দিইনি।'

সাংসারেক ধর্মটা আচারসর্বস্ব নয়। ধর্মটা সংস্কৃতির অংশ ছিল বলেই ধর্মান্তরিত মান্দিরা এখনও বলেন, ধর্ম বিক্রি করিনি। সাংসারেকদের পূজাগুলো মূলত চিকিৎসা, সামাজিক কল্যাণ, মৌসুমি পার্বণ এবং প্রকৃতি সংরক্ষণের তাগিদে করা হয়। গৃহনির্মাণ থেকে গৃহপ্রবেশ সবকিছুর জন্য পূজা করতে হয়। কখনও কোনো একজন দেবতার পূজা এককভাবে হয়, কখনও আবার অনেকের একত্রে। আমার কাছে এ রকম ২৩৪টি পূজার নাম রয়েছে, যার তালিকা জনিক নকরেক খুঁজে খুঁজে করেছিলেন। দিনের পর দিন তার কাছে বসে সেগুলো কীভাবে করা হয়, কেন করা হয়, লিখে রেখেছি।

বাংলাদেশে সাংসারেকরা যতটা ধর্মান্তরিত হয়েছে, ভারতে মান্দিদের মধ্যে ততটা ধর্মান্তরের ঘটনা ঘটেনি। শুধু নতুন ধর্মপ্রীতিই যদি ধর্মান্তরের কারণ হয়, তবে ভারতেও শতকরা নিরানব্বই জন মান্দি খ্রিষ্টান হয়ে যেতে পারত। রাজনৈতিক দুর্বলতা হয়তো ধর্মান্তরে উৎসাহী করে। ধর্মান্তরের সব ইতিহাস দেখলেই বোঝা যাবে, নতুন ধর্মে দীক্ষা নেওয়ার পেছনে আর্থসামাজিক কারণও থাকে। প্রান্তিক জাতির মানুষ টিকে থাকার জন্য ধর্মান্তরকে সহজ করে নিয়েছেন, এমন সম্ভাবনাও বাতিল করা যায় না।

আধুনিকতার একটা প্রবণতা হলো, সে সচরাচর বৈচিত্র্যকে খারিজ করে। সুন্দর বা ঠিককে একটি সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞায় আবদ্ধ করে। এর বাইরের সবকিছুকে অগ্রাহ্য বা অবিশ্বাস করতে তাড়না দেয়। আধুনিক মানুষ নানা রকম লোকবিশ্বাসকে তাই বিশ্বাস করতে নারাজ। তবে সরুপথ নেওয়ার এই তরিকায় নিজে বহুবার ধাক্কা খেয়েছি।

মান্দিদের জীবনযাপনের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাদের সঙ্গে মিশতে শুরু করলাম আমি। জনিক আচ্চু (দাদু) নিজেই এক এনসাইক্লোপিডিয়া। আচ্চুকে বলছিলাম একের পর এক তার জানা পূজাগুলো করতে। ২৩৪টি পূজার সবক'টি করানো যে অসম্ভব, সেটা অনুমান করতে পেরেছিলাম। তবু যত বেশি সম্ভব করিয়ে ফেলার ইচ্ছে ছিল আমার মনে, তাই বাছাই করে একদিন দারিচিক পূজার আয়োজন করলাম আমরা।

সাংসারেক বিশ্বাস অনুযায়ী, গর্ভাবস্থায় গর্ভবতী নারীর পেটে ব্যথা হলে দারিচিক পূজা না করলে সন্তান রাক্ষসে খেয়ে ফেলে। সন্তান ফ্যাকাশে বা সাদাটে হয়ে যেতে পারে। পূজার শুরু হলে আচ্চুকে বললাম, 'আমার ভ্রাতৃবধূর গর্ভে সন্তান আছে। আপনি তার জন্য পূজা করতে পারেন।' ১১৬ বছর বয়সী আচ্চু সন্তানসম্ভবার নাম শুনতে ভুল করলেন বা ভুলে গেলেন। মন্ত্র পড়ার সময়ে তিনি বললেন, 'তিতিলনি ফিসা', মানে 'তিতিলের বাচ্চা'। এই ভুলে আমার কোনো বিকার হয়নি। পূজার রীতিনীতিটা দেখাই ছিল আমার উদ্দেশ্য। পূজা শেষ হলো। ভিডিও করে রাখলাম সবকিছু। বাচ্চা ভালোভাবে জন্মাল। কিন্তু পরের পাঁচ বছর বারবার এই পূজার সময়ের ঘটনা মনে করতে হলো আমাকে। ভাইয়ের মিষ্টি বাচ্চাটা ফুপুর প্রতি খুব নির্ভর করতে শুরু করল। সে ভোরে জেগেই আমার ঘরে আসত। কিছুদিন পর এই নির্ভরতা আসক্তির মতো হয়ে পড়ল, সে আমার সঙ্গে মিশে থাকতে শুরু করে। আমিও ওকে ছাড়া থাকতে পারি না। ঘুমের জন্য নিজের ঘরে ফিরতে চাইলে আধো-উচ্চারণে সে বলত, 'যাও (যেও) না।' কাজের জন্য বাইরে গেলে সবচেয়ে কম সময়ে সেগুলো শেষ করে ফিরতে হয়। বারবার প্রশ্ন করে, 'তোমার পেট থেকে কে বের হলো? আমি তো মাম্মার পেট দিয়ে বের হয়েছি।' তার শিশুমন হয়তো জটিল প্রশ্ন দুটোর এক উত্তর বানাতে না পেরে আকুল হয়। আমিও ঠিক জানি না, আমার জন্য তার আকুলতা না থাকলে বা সে আমার কাছে না থাকলে শরৎচন্দ্রের 'চন্দ্রনাথ' উপন্যাসের দাদুর লাল মন্ত্রী হারানোর মতো দশা আমারও হবে কিনা? এ তো গেল পরিপ্রেক্ষিত। মোদ্দাকথাটা হলো, জনিক আচ্চুর মন্ত্রপাঠের ভুলেই কি শিশুর মা বদলে যেতে পারে? দারিচিক পূজার পর পাঁচ বছর হলো। বহুবার এই প্রশ্ন মনে এসেছে। আর কী-ই বা বলব। লোককথায় শুনতাম, আদিবাসীরা জাদু জানে। পরে তো বহুবার প্রাকৃতজনের সেই জাদুকরি শক্তি দেখেছি আমি।

পরের বছর ভ্রাতৃবধূর গর্ভে আবার সন্তান এলো। এবার তার পেটে প্রচ ব্যথা শুরু হলো। ভয় পেয়ে গেলাম। আচ্চুকে ফোন করে ওই দিনই দারিচিক পূজা করতে বললাম। পূজা করা হলো। পরদিন বাচ্চার মা সুস্থ হয়ে উঠল। এসব হয়তো আমার অদ্ভুত ভাবনা। তবু ভেবেছি, প্রাণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কারণে প্রকৃতি খামাল জনিক নকরেকের প্রার্থনা রেখেছে কিনা। আচ্চুর মন্ত্রপাঠের ভুলে ভাইয়ের মেয়ে আমার সঙ্গে নাড়ির যোগ অনুভব করেছে কিনা। আসলেই মন্ত্রপাঠে ভ্রাতৃবধূর পেটের ব্যথা ভালো হয়েছিল কি? এসবই প্রশ্ন হয়ে এসেছে মনে। নাগরিক মানুষ যা ঝেড়ে ফেলে সহজে, প্রাকৃত মানুষ তা আঁকড়ে রাখে মায়ায়। আমি আর আমার বাঙালি এক ছোট ভাই একবার ছবি তুলছিলাম মধুপুরের বনে। বনের মধ্যে ট্রাইপড (ক্যামেরার তেপায়া) বসানোর মতো সমান জায়গা পাচ্ছিলাম না। আমার ভাইটি বেতগাছ ভেঙে তেপায়া রাখার জায়গা করে দিল। সেদিনের কথা ভাবতে গিয়ে মনে পড়ে না-দেখা খাসি মেয়েটির গল্প। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একদিন বড় ভাই পাভেল পার্থ শুনিয়েছিলেন গল্পটা। খাসি কবিরাজ মেয়েটি ওষুধ বানানোর জন্য গাছের পাতা ছেঁড়ার আগে প্রার্থনা করেছিলেন। ওষুধ বানাবার জন্য দুটো পাতা নিয়ে গাছকে বলেছিলেন, 'তোমার দেহ আমি নিলাম, আমার দেহ তুমি নিও।' গাছ গান শুনে, কথা শুনতে পায় আমরা জানি। প্রাকৃত মানুষের কথা কি দেবতা দারিচিক শুনেছিল সত্যি?



মন্তব্য করুন