বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই বইমেলা হয় প্রকাশক ও বিক্রেতাদের। মেলায় প্রকাশকদের স্টলে আসেন দেশের নানা জায়গার দোকানমালিকরা। বই দেখেশুনে চুক্তি করেন তারা কিংবা বই কিনে নিয়ে যান সরাসরি। তবে শুধু কয়েকটি দেশেই বইমেলা হয় সরাসরি ক্রেতাদের জন্য অর্থাৎ পাঠকদের নিয়ে। আমাদের একুশের বইমেলা এমন হাতেগোনা গুটিকয়েকের অন্যতম।

বর্তমানে করোনাজনিত লকডাউনের কারণে দোকানপাট বন্ধ, রাস্তাঘাটে ভিড় কম। যদিও গণপরিবহন চলাচল অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে আসছে। বইমেলাতেও এর প্রভাব খুব স্পষ্ট। লকডাউনের তৃতীয় দিনে মেলায় অনেক পাঠককেই আসতে ও বই কিনতে দেখা গেছে সময় নিয়ে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এনামুল হক থাকেন বংশালে। পাঠকের অধিকাংশই যেখানে প্যাভিলিয়নমুখী, সেখানে গতকাল তাকে দেখা গেল টিএসসির দিকের স্টলগুলোতে ঘুরতে। বেশ কয়েকটি বইয়ের ব্যাগ হাতে নিয়ে বই দেখছিলেন তিনি দাঁড়িকমা প্রকাশনীর স্টলে। চোখের চশমা নাকের ডগায় চলে আসে বারবার। একবার তর্জনী দিয়ে চশমাটা ঠেলে ঠিক করে নিলেন। কী কী বই কিনলেন- জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিলেন, 'হিমুসমগ্র কিনেছি। আহমদ ছফার প্রবন্ধসমগ্র বইটিও সংগ্রহ করেছি। এখন নতুন লেখকদের বই দেখছি, ভালো বই পেলে কিনব।'

ধানমন্ডি থেকে আসা আনিকা মাহমুদ গরমে ঘেমেনেয়ে একাকার। তার হাতেও বইয়ের ব্যাগ। বললেন, 'মেলায় বিকেলের দিকে আসতে পারলে অনেক ভালো হতো। তবে তখন মেলা বন্ধ থাকায় এই ভরদুপুরে আসতে হয়েছে। এত গরমে শুধু বইপাগলেরাই এখন মেলায় আসছেন।'

গতকাল বুধবার প্রতিদিনের মতো মেলা শুরু হয় দুপুর ১২টায়। শুরুর দিকে তেমন জনসমাগম দেখা না গেলেও বিকেল ৩টার দিকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দর্শনার্থী দেখা গেছে। তবে যারাই মেলায় আসছিলেন, পছন্দের বই সংগ্রহ করা শেষে দ্রুত ছাড়ছিলেন মেলাচত্বর। এই কারণে মেলায় খুব একটা ভিড় হয়নি। যারাই এসেছেন, ধীরেসুস্থে ঘুরে বই কেনার সুযোগ পেয়েছেন। এই অবস্থায় মেলার স্টল-প্যাভিলিয়নগুলোর বিক্রিও বেড়েছে।

ঐতিহ্যের বিক্রয়কর্মী মো. নাসির বলেন, 'মেলায় আমাদের বিক্রি খুব একটা খারাপ হয়নি। বেশ ভালোই বলতে হবে। বিশেষ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আমাদের বইগুলো সংগ্রহ করছে। তাই মেলা নিয়ে আমি এখনও হতাশ নই।' প্যাভিলিয়ন এলাকায় থাকা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও বিক্রিতে সন্তুষ্ট। মানুষ নেই, অথচ বইয়ের বিক্রি ভালো, কথাটা ঠিক পরিস্থিতির সঙ্গে মেলে না। আবার মেলেও। মেলার কয়েকজন প্রকাশক জানালেন, এর কারণ মূলত দুটি। প্রথমত, মেলার পরিধি গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। যে কারণে লোকসমাগম হলেও অনেক বেশি এলাকায় ছড়িয়েছিটিয়ে থাকায় চোখে লাগছে না। দ্বিতীয়ত, কয়েক দিন ধরে মেলায় সাধারণ দর্শনার্থী তেমন বেশি আসছেন না। যারাই আসছেন, সবাই মূলত বই কেনার উদ্দেশ্য নিয়েই মেলায় এসেছেন। এই কারণে বিক্রিও চাঙ্গা হয়েছে।

গতকাল বুধবার মেলার রমনার দিকে গেটের স্টলগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি খোলেনি। 'বিক্রি করে দিনের খরচ উঠছে না' দাবি করে বেশ কয়েকজন প্রকাশক তাদের স্টল বন্ধ রাখছেন। তবে আগামীকাল শুক্রবার বন্ধের দিনকে কেন্দ্র করে স্টল বন্ধ করা প্রকাশকরাও আশাবাদী হয়ে উঠছেন। এসব ছোট প্রকাশনীকে আশার আলো দেখাচ্ছে মেলার গত দু'দিনের পরিস্থিতি। বেশ কয়েকজন প্রকাশকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মেলার পরিস্থিতির আরেকটু উন্নতি হলে তারা স্টল খুলবেন।

ইন্তামিন প্রকাশনীর স্টলও বন্ধ গত দু'দিন ধরে। তবে এই প্রকাশনীর কর্ণধার এ এস এম ইউনুস সমকালকে বলেন, 'আগামী শুক্রবার স্টল খুলে বসবো। এই বইমেলায় আমার প্রকাশনী থেকে অনেক শিশুতোষ বই করা হয়েছে। আশা করছি এই কয়দিনের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে উঠতে পারব।' সেই সঙ্গে স্টল বিন্যাসের পুরোনো অভিযোগও বারবার করেছেন তারা।

প্রকাশকদের দাবি, অনেক ভালো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এই পাশে থাকার পরও দর্শনার্থীরা আসছেন না। কারণ মেলার বড় পরিসর ও প্যাভিলিয়নগুলোর মাঝমাঠে অবস্থান। ভবিষ্যতে প্যাভিলিয়নগুলো চত্বরজুড়ে ছড়িয়ে দিলে পাঠকরা সবদিকেই আসবেন। এদিকে গতকাল মেলার পুরো সময় লিটলম্যাগ চত্বরে খুব বেশি লোকসমাগম দেখা যায়নি। বেশির ভাগ লিটলম্যাগ প্রতিষ্ঠানই বই নিয়ে বসেনি। এই চত্বরের জমজমাট অবস্থার কথা মনে করে আফসোস করতেও দেখা যায় স্টল খুলে বসা কয়েকজন লিটলম্যাগ সম্পাদককে। তবে তারাও আশা করছেন শুক্রবার মেলা জমে উঠবে।

নতুন বই :বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগের তথ্যমতে, গতকাল বুধবার বইমেলার ২১তম দিনে নতুন বই এসেছে ৬৯টি। এর মধ্যে গল্পের বই রয়েছে ৮টি, উপন্যাস ১১টি, কবিতা ২৮টি, ছড়া ৪টি, প্রবন্ধ ও জীবনী ৩টি করে, গবেষণা, মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস ও অন্যান্য ২টি করে, বঙ্গবন্ধু ও ভ্রমণবিষয়ক ১টি করে।

এসব নতুন বইয়ের মধ্যে রয়েছে- সেলিনা হোসেনের 'বধ্যভূমিতে বসন্ত বাতাস' (অন্যপ্রকাশ), হাবীবুল্লাহ সিরাজী সম্পাদিত 'একুশের প্রবন্ধ ২০২০' (বাংলা একাডেমি), আরোমা দত্তের 'আমার দাদু শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও অন্যান্য' (ঐতিহ্য), আনিসুল হক অনূদিত মিলান কুন্ডেরার 'স্লোনেস' (বাতিঘর), নাসির আলী মামুনের 'পূর্ববাংলার ফটোগ্রাফি' (আদর্শ), শাকুর মজিদের 'হুমায়ূননামা ট্রিলজি' (কথাপ্রকাশ), উদয় হাকিমের 'দার্জিলিঙে বৃষ্টি কালিম্পঙে রোদ' (আনন্দ), জান্নাতুল বাকেয়া কেকার 'বঙ্গবন্ধুর ভাবনায় নারী উন্নয়ন ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা' (কাকলী), পলাশ মাহবুবের 'ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ' (পাঞ্জেরী), শিহাব শাহরিয়ারের 'নিঃসঙ্গ নদী ছায়া' (অন্যপ্রকাশ), ড. সুমন কুমার পাণ্ডে সম্পাদিত 'চেতনায় বঙ্গবন্ধু চিরঞ্জীব বঙ্গবন্ধু' (অনিন্দ্য), মাহিন খানের 'প্রতিবাদ' (দাঁড়িকমা), আবদুল মান্নান সরকারের 'জনক' (২য় খণ্ড) ও ড. আহমদ আব্দুল্লাহর 'ঢাকার মুসলিম ঐতিহ্য' (জিনিয়াস), সন্দীপন ধরের 'ভয়' (ক্রিয়েটিভ), বুলবুল চৌধুরীর 'বাছাই কিশোর গল্প' (পুথিনিলয়), শামস রহমানের 'বঙ্গবন্ধু নেতা, নেতৃত্ব ও আজকের বাংলাদেশ' (বইপত্র), মোহাম্মদ তালুতের 'নৈঋত' (পেন্সিল) প্রভৃতি।

বইমেলার ২১ দিনে মোট বই এসেছে দুই হাজার ২৮৬টি।


মন্তব্য করুন