রমনার কালীমন্দিরের পাশটা একরকম শান্তই থাকে দিনের বেলা। কয়েকজন ভাসমান চা-সিগারেট বিক্রেতা দোকান খুলে বসেছেন এখানে। লকডাউনের কারণে মেলায় ভিড় কমে যাওয়ায় এদিকটা যেন আরও শান্ত। তাই এখানেই দলবল নিয়ে গানের আড্ডা বসিয়েছেন সংগীতশিল্পী শতাব্দী ভব ও তার সঙ্গীরা।

এরা আগে বসতেন লিটলম্যাগ চত্বরে। সেখানকার স্টলগুলোর মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি ঝাঁপ খুলে বসেছে, ফলে এ চত্বরের প্রাণবন্ত ভাব এখন নেই খুব একটা। তাই দলটা সরে এসেছে এদিকে। গিটার, খমক, মন্দিরা, ডুবকি ইত্যাদি যান্ত্রিক অনুষঙ্গ বাজছে তালে তালে। বাংলা একাডেমির গেটে দায়িত্ব পালন শেষ করে বাসায় যাওয়ার পথে এক পুলিশ সদস্যও যোগ দিয়েছেন তাদের সঙ্গে। ডুবকিটা চেয়ে নিয়ে নিজেই বাজানো শুরু করেছেন। কোরাস গলায় বাউল গানের সুরের আকুলতা ভর করছে অবচেতনে। দূরের কোনো গাছের মগডালে বসে কোকিল একটানা কুহুকুহু ডেকে যাচ্ছে। সেটাকেও মনে হয় গানেরই কোনো অনুষঙ্গ। হেঁটে মহানগর পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্প পার হলে গানের সুর আর কানে আসে না। তবে কুহু ডাক ঠিকই শোনা যায়। নতুন করে যোগ হয় ক্যাম্পের সামনে বানানো ফোয়ারার জলের শব্দ। দুইয়ে মিলে এও তো এক নতুন ছন্দ, নতুন আবহে উপভোগ করা নতুন সুর।

অন্য যে কোনো বছরের চেয়ে এবারের বইমেলা ভিন্ন- এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কোনো ভিড় নেই, হাঁকাহাঁকি-ডাকাডাকি নেই, তবু বইয়ের বিক্রি ভালোই- বলছেন প্রকাশকেরা। মেলায় আসা প্রকৃত পাঠকরাই অনেকটা নিভৃতে মেলা জমিয়ে রেখেছেন- এমন মন্তব্য করেছেন বেশ কয়েকজন প্রকাশক। গতকাল মেলাচত্বর ঘুরে প্রায় অধিকাংশ প্রকাশকের সঙ্গে কথা বলেও এমন আভাসই পাওয়া গেছে। মেলায় আসা দর্শনার্থীদের গন্তব্যও ছিল বিভিন্ন প্রকাশনীর স্টল-প্যাভিলিয়ন।

রাজবাড়ীর মাহবুবুর রহমান খালেদ পারিবারিক কাজে এসেছিলেন ঢাকায়। লকডাউনে আন্তঃজেলা পরিবহন বন্ধ হয়ে গেলে আটকে যান। অবসরের এই সুযোগে মেলায় এসে কিছু বইও কিনে নিচ্ছেন। বললেন, 'আব্বাকে নিয়ে ঢাকায় এসেছিলাম। লকডাউনের কারণে বাড়ি ফেরা হয়নি। ঢাকায় কোথাও ঘুরতেও যাইনি। আজ (বৃহস্পতিবার) ভাবলাম বইমেলা ঘুরে কিছু বই সংগ্রহ করে নিয়ে যাই। সব বই তো আমাদের ওখানকার লাইব্রেরিতে পাওয়া যায় না।'

গতকালের মেলায় সবচেয়ে বড় চমক ছিল বন্ধ থাকা প্রকাশনীর সংখ্যা কমে আসা। সাধারণ পাঠক ও অন্য প্রকাশকরা আশঙ্কা করেছিলেন, দিন যত যাবে, বন্ধ স্টলের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। তবে মেলা ঘুরে দেখা গেছে বেশ কয়েকটি বন্ধ থাকা স্টল খুলেছে। এর বেশিরভাগ স্টলই গোছানোর কাজ করছে, মূলত আজ শুক্রবার ছুটির দিনকে কেন্দ্র করেই সক্রিয় হচ্ছেন তারা। আশা করছেন, আজ পুরোনো রূপে ফিরে আসবে মেলাচত্বর। দেশ পাবলিকেশন্সের কর্ণধার অচিন্ত্য চয়ন সমকালকে বলেন, 'গত ২৬ তারিখে মেলায় প্রচুর পাঠকের সমাগম হয়েছিল। এরপর লকডাউন থাকার পরও অনেক পাঠকই মেলায় আসছেন, বই কিনছেন। আমরা আশা করছি শুক্র ও শনিবার ছুটির দিনে মেলা আবার আগের মতো জমে উঠবে। পাঠকরাই তো মেলার প্রাণ! আমার ধারণা মেলা তার প্রাণ ফিরে পাবে।'

তবে অনেক প্রকাশক দাবি করেছেন, এবারের মেলায় বিক্রি অন্যবারের চেয়ে অনেক কম হচ্ছে। লাভ দূরের কথা, অনেক প্রকাশনী এখনও স্টল বানানোর টাকা পর্যন্ত তুলতে পারেনি। এ অবস্থায় তারা সরকারি প্রণোদনা আশা করছেন। ভাষাপ্রকাশের কর্ণধার ড. মিজান রহমান জানান, সৃজনশীল বই প্রকাশ ও পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা একটি জাতির শিক্ষার মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেয়। আমরা প্রকাশকেরাই মূলত এসব বই প্রকাশ করে থাকি। এবারের মেলায় বিক্রি খুব খারাপ। সরকারি উদ্যোগে প্রকাশকদের কাছে থেকে বই না কিনলে অনেকেই খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। আমরা সরকারের কাছে প্রকাশকদের এই বিশাল ক্ষতির হাত থেকে রক্ষার আবেদন জানাচ্ছি।

বই কেনার জন্য ঋণ দেবে আইপিডিসি ফাইন্যান্স :'নতুন বইয়ের ঘ্রাণে, সুবোধ জানুক প্রাণে'- এই মূলমন্ত্রকে কেন্দ্র করে আইপিডিসি ফাইন্যান্স লিমিটেড প্রবর্তন করেছে দেশের প্রথম ও একমাত্র বই কেনার লোন সেবা 'আইপিডিসি সুবোধ'। বই পড়ার অভ্যাসকে জনপ্রিয় করতে এবং সর্বস্তরে বই পাঠের অভ্যাস ছড়িয়ে দিতে গত বছরের বইমেলায় এই কার্যক্রম শুরু করে তারা। প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, ঋণসেবা 'সুবোধ'-এর মাধ্যমে বইপ্রেমীদের ০% সুদে বই কেনার ঋণ দেওয়া হয়।

নতুন বই :বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগের তথ্যমতে, গতকাল ২২তম দিনে মেলায় নতুন বই এসেছে ৪৭টি। এর মধ্যে রয়েছে- গল্প ৮টি, উপন্যাস ৬টি, প্রবন্ধ ৫টি, কবিতা ১৯টি, ছড়া, জীবনী ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই ২টি করে, গবেষণা, নাটক ও বিবিধ বিষয়ের বই ১টি করে। এ পর্যন্ত মোট বই এসেছে দুই হাজার ৩৩৩টি।

নতুন বইয়ের মধ্যে ময়ূরপঙ্খি এনেছে মঞ্জু সরকারের 'অপুর দাদাগাছ', অনিন্দ্য এনেছে খালেক বিন জয়েনউদদীনের 'বঙ্গবন্ধু ও রাসেলের গল্প', কথাপ্রকাশ এনেছে ঝর্না রহমানের 'জলপরী ও নূহের নৌকা', মাওলা এনেছে মুনতাসীর মামুনের 'মুক্তিযুদ্ধ একাত্তরের সাহিত্য ও পশ্চিমবঙ্গ', অক্ষর এনেছে সুজাতা আজিমের 'চলচ্চিত্রে আমার ৫৫ বছর', বিভাস এনেছে ধ্রুব এষের 'করোনাধারা', খড়িমাটি এনেছে শোয়াইব জিবরানের 'ধুলো ও জলে লেখা জীবন' ও পেন্ডুলাম এনেছে বিমান ধরের 'অনন্তপুর'। এছাড়াও আলোঘর থেকে ফারহানা হাসনা তুলি সম্পাদিত 'পঞ্চাশে বাংলাদেশ', পাঞ্জেরী থেকে আনজীর লিটনের 'স্কুলের ছড়া', শাহজাহান কবির বীরপ্রতীকের 'নৌ-যুদ্ধ একাত্তর', অমরাবতী থেকে ড. হাসান মাহমুদের 'আমার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ভা ার', য়ারোয়া থেকে শ্যামসুন্দর সিকদারের 'আমাদের বঙ্গবন্ধু', বইপুস্তক থেকে বারেক কায়সারের 'রাশিয়ায় বঙ্গবন্ধু' ইত্যাদি বই এসেছে।

সংশোধনী :গতকাল 'তবুও পাঠকের মেলা' শিরোনামে বইমেলা নিয়ে প্রকাশিত রিপোর্টে উদয় হাকিমের 'দার্জিলিঙে বৃষ্টি কালিম্পঙে রোদ' বইটির প্রকাশনার নাম 'আনন্দ' দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বইটি 'অনিন্দ্য প্রকাশ' থেকে বের হয়েছে।


মন্তব্য করুন