রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছোটগল্পের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, 'শেষ হয়ে হইল না শেষ।' সাহিত্যের একটা বড় সুবিধা হলো, একই উক্তিকে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করা যায়। এই যেমন, রবিঠাকুরের এই কথাটিকে বইমেলার সঙ্গে মিলিয়েও ভাবা যায়। গতকাল সোমবার ছিল মেলার শেষ দিন। এই বিদায়ের সুর কি পাঠক-বইপোকাদের আক্ষেপ বাড়ায়নি? আবার বই পড়ার যে উন্মাদনা, সেটি কি বইমেলার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যাবে? যাবে না। হয়তো এ বছরের জন্য মেলা গুটিয়ে নিতে হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে শুরু হচ্ছে নতুন বইমেলার অপেক্ষাও।

গতকাল মেলার শেষ দিনে মেলা প্রাঙ্গণে জনসমাগম হয়েছে কম। বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, আগে যেসব পাঠক প্রতিদিন মেলায় এসে বই সংগ্রহ করতেন, তারা এবার নিয়মিত আসছেন না। তাদের অনেকেই তালিকা করে মেলায় এসে বই কিনে নিয়ে গেছেন।

গতকাল বিকেল পর্যন্ত মেলা চললেও অনেক প্রকাশনী তাদের স্টল গুছিয়ে ফেলেছে আগেই। তাদের মতে, সব প্রকাশনী একসঙ্গে মেলা প্রাঙ্গণ ছাড়তে শুরু করলে ভিড় হবে, পরিবহন সংকটও দেখা দেবে। তাই ভিড় ও সংকট এড়াতে তারা আগেই স্টল গুটিয়ে ফেলেছেন।

ত্রয়ী প্রকাশনের কর্ণধার মাধব চন্দ্র দাস মেলার সময় শেষ হওয়ার আগেই রিকশাভ্যানে করে বই নিয়ে যাচ্ছিলেন মেলা থেকে। তিনি সমকালকে বলেন, '১৯৭৮ সাল থেকে মেলায় আছি। এবারের মতো কোনো মেলা দেখিনি। এক মহামারি সবকিছু ওলটপালট করে দিয়েছে। বিক্রি নেই বললেই চলে। তাই ভিড় এড়াতে আগেই বইগুলো গুদামে পাঠিয়ে দিচ্ছি।'

তবে প্রকাশকদের বিক্রি নিয়ে হতাশা দেখে আগাম কিছু বলা উচিত নয় বলেও কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন। তাদের ধারণা, বইমেলা এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই থেমে নেই, এর বিস্তার ঘটেছে অনলাইন জগতেও। অনেক পাঠকই সশরীরে মেলায় না এসে অনলাইনেই বই সংগ্রহ করে নিচ্ছেন। শুধু মেলার সময়েই নয়, পাঠকরা সারাবছরই অনলাইনে বই অর্ডার করছেন বিভিন্ন বই বিপণন সংস্থা থেকে। তাই এ বছরের মহামারিকালীন অবস্থা বইয়ের প্রচলিত বিপণন ব্যবস্থার ধারণাকেও পাল্টে দিতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

এসেছে আড়াই হাজারের বেশি বই :এবার মেলা হবে- এটা নিয়েই ছিল অনিশ্চয়তা। তবুও হয়েছে। থেমে যায়নি সৃজনশীলতার চর্চাও। যেখানে সারা পৃথিবী এক রকম খুঁড়িয়ে চলছে মহামারি করোনার আতঙ্কে, সেখানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা হয়েছে প্রায় এক মাস। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও নতুন বইয়ের ঘ্রাণের মাদকতা থেকে বঞ্চিত হয়নি বইপোকারা।

এ বছরের মেলায় নতুন বই এসেছে দুই হাজার ৬৪০টি। প্রতিবছরের মতো এবারও সবচেয়ে বেশি এসেছে কবিতার বই। পুরো মেলায় শুধু কবিতার বই-ই এসেছে ৮৯৮টি। গত সাত বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো নতুন অভিধান আসেনি মেলায়। তবে পুরোনো অভিধানগুলোই দেদার বিক্রি হয়েছে।

নতুন বইয়ের মধ্যে গল্প ৩৩৯টি, উপন্যাস ৪০৫টি, প্রবন্ধ ১৫৮টি, গবেষণা ৪৭টি, ছড়া ৫২টি, শিশুসাহিত্য ৪১টি, জীবনী ৮৩টি, রচনাবলি ১৬টি, মুক্তিযুদ্ধ ৮২টি, নাটক ১৩টি, বিজ্ঞান ৪২টি, ভ্রমণ ৩৪টি, ইতিহাস ৬০টি, রাজনীতি ১৬টি, চিঃ/স্বাস্থ্য ১২টি, বঙ্গবন্ধু ৫৫টি, রম্য/ধাঁধা ১৪টি, ধর্মীয় ৩৫টি, অনুবাদ ৩০টি, সায়েন্স ফিকশন ২১টি এবং অন্যান্য বই এসেছে ১৮৯টি। অন্য বছরের তুলনায় সংখ্যাটি বেশি না হলেও এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বিভিন্ন প্রকাশনী সংস্থা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে যেভাবে লেখকদের নতুন নতুন বই নিয়ে এসেছে, তাকে অভাবনীয়ই বলতে হবে।

মেলায় হাসান আজিজুল হক, সেলিনা হোসেন, মুহম্মদ জাফর ইকবালসহ দেশের প্রধান প্রধান লেখকদের প্রায় সবারই কোনো না কোনো বই এসেছে। অনেকেই প্রকাশ করেছেন একাধিক বই। মেলায় ঘুরতে এসে পাঠকও ভালো লেখকের বইগুলোই খুঁজে খুঁজে কিনেছেন। দু'হাত ভর্তি ব্যাগ নিয়ে টিএসসির গেটের দিকে মূর্ধন্যর স্টলে আরও কয়েকটি বই দেখছিলেন রহমান মেহেদী। তিনি বললেন, 'এবারের মেলায় অন্যবারের চেয়ে কম বই বেরিয়েছে। তবে ভালো ভালো বইগুলো ঠিকই এসেছে। মেলা ঘুরে আমার অন্তত মনে হয়নি যে, ভালো বইয়ের অভাব আছে। বইকে সংখ্যার দিক থেকে বিবেচনা না করে মানের দিক থেকে মূল্যায়ন করা উচিত।'

ক্ষতির শিকার প্রকাশকরা :এবার মেলায় বিক্রি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন বেশিরভাগ প্রকাশক। সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন প্রকাশকদের একাংশ। বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি গতকাল মেলা প্রাঙ্গণের 'লেখক বলছি' মঞ্চে সংবাদ সম্মেলন করে এমন দাবি জানিয়েছে। তাদের দাবি, এবার মেলায় ৯০ কোটি টাকা লগ্নি করে বই বিক্রি হয়েছে প্রায় তিন কোটি ১২ লাখ টাকা। পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, সবচেয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা (এক ইউনিট স্টল) মেলা উপলক্ষে নূ্যনতম ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলেও উল্লেখ করার মতো কোনো বিক্রিই করতে পারেনি। অন্যান্য বছরের ধারাবাহিকতায় এবার ১০০ কোটি টাকারও বেশি বিক্রির আশা করা হয়েছিল। কিন্তু বিক্রি খুবই হতাশাজনক হওয়ায় সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন তারা।

পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সহসভাপতি শ্যামল পাল সরকারের কাছে বেশ কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরে বলেন, সরকারের কাছে আমাদের প্রস্তাব- প্রকাশকদের ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া, মেলায় অংশ নেওয়া প্রকাশকদের কাছ থেকে ১০০ কোটি টাকার বই কেনা, প্রকাশনা শিল্পের জন্য এক হাজার কোটি টাকার সহজ শর্ত ও স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।

বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ও সময় প্রকাশনের কর্ণধার ফরিদ আহমেদ বলেন, 'অন্য বছরের তুলনায় আমাদের ১৫ শতাংশ বিক্রিও হয়নি। ক্ষতির পরিমাণ বলে লাভ নেই। তবে সরকারের কাছে আমরা কোনো প্রণোদনা বা ক্ষতিপূরণ চাই না। আমরা চাই, সরকারের প্রতি বছরের বই কেনার বাজেট বাড়িয়ে সরাসরি প্রকাশকদের কাছে থেকে বই সংগ্রহ করা হোক। তাহলেই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারব বলে আশা করছি।'

শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ঘোষণা :এ বছরের অমর একুশে বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্টলের নান্দনিক অঙ্গসজ্জায় শ্রেষ্ঠ বিবেচিত তিনটি প্রতিষ্ঠানকে 'শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার' দেওয়া হচ্ছে। মুজিব শতবর্ষকে প্যাভিলিয়নে ডিজাইনে ফুটিয়ে তুলে পুরস্কার জিতে নিয়েছে কথাপ্রকাশ। এ ছাড়া দুই ইউনিট স্টল ক্যাটাগরিতে 'সংবেদ' ও এক ইউনিট স্টল ক্যাটাগরিতে পুরস্কার জিতেছে 'উড়কি'।

নতুন বই :মেলায় নতুন বইয়ের মধ্যে রয়েছে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিমের 'বঙ্গবন্ধু : সংবিধান আইন আদালত ও অন্যান্য' (মাওলা ব্রাদার্স), ওয়াসি আহমেদের 'বরফকল' (কথাপ্রকাশ), আবুল আহসান চৌধুরী সম্পাদিত 'হরিদাসের গুপ্তকথা' (কবি), মাহবুব আজীজের 'নির্বাচিত গল্প' (পাঠক সমাবেশ) ইত্যাদি।

বাংলা একাডেমির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সোমবার মেলার শেষ দিনেও নতুন বই এসেছে ৬৪টি। গল্পের বই এসেছে ছয়টি, প্রবন্ধ আটটি, কবিতা ২৯টি ও নাটক এসেছে একটি। উপন্যাস ও ছড়ার বই এসেছে চারটি করে। জীবনী ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বই এসেছে দুটি করে। অন্যান্য বই এসেছে ছয়টি। এর মধ্যে রয়েছে সদর প্রকাশিত সেলিনা হোসেনের সম্পাদনায় 'বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গল্প', আতিউর রহমানের 'বঙ্গবন্ধু সহজতর পাঠ' এবং আসাদুজ্জামান খান কামালের সম্পাদনায় 'ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো', চন্দ্রাবতী প্রকাশিত মারুফুল ইসলামের 'পুনিয়াউট' ইত্যাদি।

মন্তব্য করুন