প্ররোচনামূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে ২৪ ঘণ্টা নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে নির্বাচন কমিশন। মুসলিম ভোট ও কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করার অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। গতকাল সোমবার রাতে ভারতের বিদায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার সুনিল অরোরা তার শেষ কার্যদিবসে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। এতে বলা হয়েছে, সোমবার রাত ৮টা থেকে মঙ্গলবার রাত ৮টা পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচার করতে পারবেন না মমতা। বিজেপিকে সুবিধা দিতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের যে অভিযোগ করে আসছিল তৃণমূল কংগ্রেস; তা আরও জোরালো হলো বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রচারে নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে আজ মঙ্গলবার গান্ধী মূর্তির পাদদেশে ধর্নায় বসার ঘোষণা দিয়েছেন মমতা। নির্বাচন কমিশনের নিষেধাজ্ঞা জারির কিছুক্ষণের মধ্যেই টুইটে তিনি বলেছেন, 'নির্বাচন কমিশনের অগণতান্ত্রিক এবং অসাংবিধানিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আমি দুপুর ১২টা থেকে ধর্নায় বসছি।'

মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলেছেন, নির্বাচন কমিশন বিজেপির শাখা সংগঠনে পরিণত হয়েছে। স্বেচ্ছাচারী, হিটলারি কায়দায় ভোট করাতে চাচ্ছে কমিশন। মমতা এর প্রতিবাদ করায় তাকে থামানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। বাংলার মানুষ ভোটের মাধ্যমে এর জবাব দেবে।

এদিকে ক্রমেই সহিংসতা বাড়তে থাকা বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে বিজেপির শীর্ষ দুই নেতা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ একের পর এক জনসভা, রোড শো করে পশ্চিমবঙ্গ কাঁপাচ্ছেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদায়ঘণ্টা বাজাতে তারা মরিয়া হয়ে ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। মমতা একাই তাদের মোকাবিলা করছেন। গতকাল সোমবার পৃথক জনসভায় পরস্পরের বিরুদ্ধে তাদের এই রুদ্রমূর্তি দেখা গেছে।

গতকাল নদিয়ার কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে নির্বাচনী জনসভায় মোদি বলেন, 'সামনে পরাজয় দেখে নতুন রণকৌশল তৈরি করেছেন দিদি (মমতা)। তফসিলি জাতি, উপজাতি ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণিকে ভোট দিতে দিচ্ছেন না। ওই শ্রেণির মানুষের ভোটদান রুখে, নিজের গুন্ডাদের দিয়ে ছাপ্পাভোট দেওয়ানোর ষড়যন্ত্র করছেন। কোচবিহারে যা হয়েছে, তা দিদির এই ছাপ্পাভোট মাস্টারপ্ল্যানের অংশ ছিল।'

এদিনের জনসভায় 'তিন তালাক' নিষিদ্ধ করে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে নারী ভোটারদের বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে বক্তব্য দেন মোদি। তিনি বলেন, দিদি আসলে জানেন- মোদি নারীদের অনেক কিছু দেবেন। ভয়ে তাই নারীদের হাতে হাতা-খুন্তি তুলে নিতে বলেছেন।

আট ধাপের বিধানসভা নির্বাচনে চতুর্থ ধাপে গত শনিবার ৪৪ আসনের মধ্যে কোচবিহারের শীতলখুচিতে ভোট গ্রহণ হয়। সেখানে ১২৬ নম্বর বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলিতে চারজন নিহত ও চারজন গুলিবিদ্ধ হন। গণতন্ত্রের উৎসবে এই রক্তপাত নিয়ে ভারতজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠলেও পুরো ঘটনায় কেন্দ্রীয় বাহিনীকে দায়মুক্ত ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বও কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলি চালানোর যৌক্তিকতায় সমর্থন দিয়েছে। গত দু'দিনে বাংলায় একাধিক জনসভা থেকে মোদি বারবার বলেছেন, কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ঘেরাওয়ের যে নির্দেশ দিদি দিয়েছেন, তার জন্যই শীতলখুচিতে ওই ঘটনা ঘটেছে।

তবে মোদির এ বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে মমতা বলেছেন, 'বিজেপিই কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে শীতলখুচিতে রক্তক্ষয়ী ভোট করেছে।' গতকাল রানাঘাটের জনসভা থেকে মমতা বলেন, 'কেন্দ্রীয় বাহিনীর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলতে তাদের প্ররোচনা দেওয়া হচ্ছে। পুরোটাই অমিত শাহ করেছেন। আমি এখনও বিশ্বাস করি, ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ষড়যন্ত্র করেছেন। প্রধানমন্ত্রীও জানেন। গুলি করে খুন করার পর তিনি দায়মুক্তি দিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর এটি শোভা পায় না।'

এ দিন পাকিস্তান সীমান্তে পুলওয়ামা হামলার ঘটনা নিয়েও মোদি-অমিতকে তোপ দাগেন মমতা। তিনি বলেন, 'পুলওয়ামার ঘটনা আমাদের মনে আছে। যাদের মারতে গিয়েছিলেন, তাদের মারতে না পেরে নিজেদের লোককে মেরে চলে এসেছিলেন।' গতকাল উত্তর ২৪ পরগনার দমদমেও জনসভা করেন মমতা।

এরই মধ্যে চার ধাপের ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। আগামী ১৭ এপ্রিল পঞ্চম ধাপে ছয়টি জেলার ৪৫টি আসনে ভোট গ্রহণ হবে। অষ্টম ধাপের ভোট হবে ২৯ এপ্রিল। ২ মে একযোগে সব আসনের ফল ঘোষণা করা হবে।

মন্তব্য করুন