অকাল এক বৈশাখ চোখ মেলছে এবার। আনন্দের পরিবর্তে বেদনায় ভারাক্রান্ত এ বৈশাখে একা হয়ে পড়েছে বাঙালি। গত বছরের মতো এবারও করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির কারণে পহেলা বৈশাখের দিন থেকেই আসছে কঠোর লকডাউন। আবার নববর্ষের প্রথম দিন থেকেই শুরু হচ্ছে রোজা। সব মিলিয়ে অন্য রকম এক বাংলা নতুন বছর আসছে বাঙালির জীবনে।

তবে মন ভালো করার মতো সংবাদও আছে এই বৈশাখে। বেশ কয়েক বছর ধরেই বাংলা নববর্ষ ঘিরে ইলিশের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এবার যোগ-বিয়োগের খাতা খুলে দেখা যাচ্ছে, ইলিশের উৎপাদন গত ১২ বছরে বেড়েছে প্রায় ৭৯ শতাংশ। বিশ্বের ১১টি দেশের মধ্যে ১০টিতে ইলিশের উৎপাদন কমলেও একমাত্র বাংলাদেশেই বাড়ছে প্রতি বছর। বাড়ছে ওজন এবং আকারও।

সর্বশেষ চলতি এপ্রিল মাসে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৯৮ হাজার টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ ৫০ হাজার টন। এ ছাড়া ২০০৯-১০ অর্থবছরে ৩ লাখ ১৩ হাজার, ২০১০-১১ অর্থবছরে ৩ লাখ ৪০ হাজার, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৫শ, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৩ লাখ ৫১ হাজার, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৩ লাখ ৮৫ হাজার, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৩ লাখ ৮৭ হাজার, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩ লাখ ৯৫ হাজার, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪ লাখ ৯৬ হাজার, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৫ লাখ ১৭ হাজার, ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে ৫ লাখ ৩৩ হাজার টন ইলিশ উৎপাদন হয়েছে। প্রতি বছর ইলিশ উৎপাদনের গড় প্রবৃদ্ধি প্রায় ৭ দশমিক ১১ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে ৬ লাখ টনের ওপরে ইলিশের উৎপাদন হবে বলে আশা করছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

মৎস্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ডফিশের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে মোট ইলিশের ৮৬ শতাংশ এখন বাংলাদেশে উৎপাদিত হচ্ছে। পাঁচ বছর আগে বিশ্বের মোট ইলিশ উৎপাদনের ৬৫ শতাংশ আসত বাংলাদেশ থেকে। প্রতিবেশী ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে ইলিশের উৎপাদন কমেছে। বিশ্বে ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশ প্রথম; দ্বিতীয় স্থানে ভারত। পাঁচ বছর আগে ভারতে বিশ্বের প্রায় ২৫ শতাংশ ইলিশ উৎপাদিত হতো। তবে চলতি বছর তাদের উৎপাদন প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশে নেমেছে। তৃতীয় অবস্থানে থাকা মিয়ানমারে উৎপাদন হয়েছে ৩ শতাংশের মতো। ইরান, ইরাক, কুয়েত ও পাকিস্তানে উৎপাদন হয়েছে বাকি ইলিশ।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, বিশ্বে মোট ইলিশের ৮০ শতাংশের বেশি বাংলাদেশে উৎপাদিত হচ্ছে। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ইলিশের অবদান ১ শতাংশ। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের ইলিশ ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই (জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিকেশন) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রায় ৫ লাখ মানুষ ইলিশ আহরণে সরাসরি নিয়োজিত এবং ২০ থেকে ২৫ লাখ লোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। তাদের সারাবছরের মোট আয়ও বেড়েছে। ইকো ফিশ প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে জেলেদের মাথাপিছু বার্ষিক গড় আয় ৮৪ হাজার ৬৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ২৮ হাজার ৮১৮ টাকা হয়েছে। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ১৫ ভাগ।

ইলিশের উৎপাদন বাড়ার কারণ হিসেবে মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, কয়েক বছর ধরে ইলিশ রক্ষায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, কোস্টগার্ড, পুলিশ ও নৌবাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করেছে। সবার সহায়তায় বিশেষ অভিযানও পরিচালনা করা হয়। এতে জাটকা সংরক্ষণ ও মা ইলিশ রক্ষা পায়। এ কারণেই ইলিশের উৎপাদন বাড়ছে। ইলিশ মাছের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে বেশ কয়েক বছর ধরে এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে। প্রতি বছর নভেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত আট মাস জাটকা (২৫ সেন্টিমিটারের নিচে) ধরা নিষিদ্ধ। এর মধ্যে মার্চ-এপ্রিল দুই মাস জেলেদের ছয়টি অভয়াশ্রম এলাকায় নদীতে নামতে দেওয়া হয় না। এ ছাড়া বর্ষার শেষদিকে প্রজনন মৌসুমে ২২ দিন ইলিশ ধরা বন্ধ থাকে। এ সময় সরকার তালিকাভুক্ত জেলেদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সহায়তা দেয়।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, মা ইলিশ এবং ডিম ছাড়ার পর জাটকা রক্ষা জরুরি। এবার প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরা ও জাটকাবিরোধী অভিযান বেশ কঠোর হওয়ায় আগামীতে ইলিশের উৎপাদন আরও বাড়াবে।

উৎপাদন বাড়ার কারণে ইলিশ রপ্তানিতে নিষধাজ্ঞা তুলে দেওয়া হবে কিনা- এ প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, এখনও গ্রামের অনেক মানুষ ইলিশের স্বাদ নিতে পারে না। তারা পর্যাপ্ত ইলিশ খাওয়ার সুযোগ পাওয়ার পর রপ্তানির কথা ভাবা যেতে পারে বলে মনে করি। পরিস্থিতি এখনকার মতো চললে আগামী দুই বছরের মধ্যে ইলিশের উৎপাদন সাত লাখ টনে পৌঁছবে বলে আশা মন্ত্রীর।

জেলেদের জীবনমান উন্নয়ন এবং উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় 'সাসটেইন্যাবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রজেক্ট ইন বাংলাদেশ' শীর্ষক বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এ ছাড়া ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও এ সম্পদের উন্নয়ন টেকসই করার লক্ষ্যে 'ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যস্থাপনা প্রকল্প' মৎস্য অধিদপ্তর বাস্তবায়ন করছে। মা ইলিশ ও জাটকা রক্ষার্থে জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়াতে ২৪৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্প হাতে নেয় সরকার।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব রওনক মাহমুদ বলেন, সরকারের নানা উদ্যোগে ইলিশের উৎপাদন ঊর্ধ্বমুখী। সামনে ইলিশের উৎপাদন প্রায় ৬ লাখ টন হতে পারে বলে আশা করছি।

চাঁদপুরের মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক মো. আনিছুর রহমান বলেন, ইলিশের উৎপাদন বাড়ার পেছনে ২২ দিনের ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞাটি সবচেয়ে কার্যকরী। এখন প্রচুরসংখ্যক ইলিশ আসছে; আকারেও বেশ বড়।

মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ পর্যবেক্ষণ সেলের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছর আগে দেশের ২৪টি উপজেলায় বহমান নদীতে ইলিশের বিচরণ ছিল। এখন দেশের অন্তত ১২৫টি উপজেলায় বহমান নদীতে ইলিশের বিচরণের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

মন্তব্য করুন